জগন্নাথ মন্দিরের ডালা আর্কেডে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে অধিকাংশ স্টলই। ছবি: চন্দন বারিক।
গত অক্ষয় তৃতীয়ায় মন্দির উদ্বোধনের সময়ে রাজনৈতিক চাপান-উতোরের অন্ত ছিল না। বছর ঘুরে বৈশাখে রাজ্যে ভোট পার্বণ। তবে, শাসক বা বিরোধী, কারওপ্রচারেই কার্যত নেই দিঘার জগন্নাথ মন্দির।
পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগর বিধানসভা কেন্দ্রের অধীন দিঘা। মন্দির উদ্বোধনের সময়ে জেলা তো বটেই, কলকাতাতেও মন্দিরের ছবি, মুখ্যমন্ত্রীর ছবি-সহ হোর্ডিং, ব্যানার ছড়িয়েছিল। রেশন দোকান থেকে বিলি হয়েছিল জগন্নাথের প্রসাদ, পুরীর আদলে গড়া মন্দিরের ছবি। সরকারি সেই আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিজেপি।
এখন বিধানসভা ভোটের মুখে তৃণমূল-বিজেপির দেওয়াল লিখন, পোস্টার, ফেস্টুনে সর্বত্র ছয়লাপ। কিন্তু, কোথাওই জগন্নাথ মন্দিরের উল্লেখ নেই। জেলায় এসে প্রধানমন্ত্রী জগন্নাথ মন্দিরের কথাতোলেননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘‘জগন্নাথ মন্দির বানিয়ে আমি ধন্য’’— এর বেশি কিছু বলেননি। বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীও নিজের জেলার এই মন্দির নিয়ে এখন চুপ। এমনকি, জেলার দুই ফুলের প্রার্থীরা কালী, বাসন্তী, শিব মন্দির থেকে হরিমঞ্চে নিয়মিত প্রচার সারলেও ভোট-পর্বে দিঘার মন্দিরে যাননি।
কেন? জানা যাচ্ছে, সরকারি সম্পত্তি বলেই ভোটের প্রচারে মন্দির নিয়ে উচ্চবাচ্য করছে না কোনও পক্ষ। পাছে আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধির গেরোয় পড়তে হয়! দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের দায়িত্বপ্রাপ্ত, ইসকনের কলকাতার ভাইস প্রেসিডেন্ট তথা মুখপাত্র রাধারমণ দাস বলেন, ‘‘ভোটের নিয়মকানুন আছে। তাই প্রার্থীরা কেউ এখন আসছেন না। তবে নিয়মিত প্রচুর ভক্ত সমাগম হচ্ছে। পর্যটকেরাও আসছেন।’’
তৃণমূলের তমলুক জেলার সভাপতি সুজিতকুমার রায় মানছেন, ‘‘আদর্শ আচরণবিধির জন্যই প্রচারে মন্দিরের ছবি দেওয়া যাচ্ছে না। তবে মন্দির ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়। আমরাও দলীয় উদ্যোগে জগন্নাথ দর্শনের ব্যবস্থা করেছি। আলাদা করে প্রচারের প্রয়োজন নেই।’’ রামনগরের বিদায়ী বিধায়ক, প্রাক্তন মন্ত্রী তথা এ বারও তৃণমূলের প্রার্থী অখিল গিরি বলছেন, ‘‘স্থানীয় সভায় প্রয়োজন মতো মন্দিরের কথা বলছি।’’
কিন্তু বিজেপি চুপ কেন? রামনগরের পদ্মপ্রার্থী চন্দ্রশেখর মণ্ডলের জবাব, ‘‘ধর্মীয় ভাবাবেগের বিষয়। তাই দেখে-বুঝে নিতে হচ্ছে।’’ একই সঙ্গে তাঁর দাবি, ‘‘তৃণমূলের মন্দির নিয়ে বলার মুখ নেই। সরকারি টাকায় মন্দির করা যায় না। ঐতিহাসিক এবং শাস্ত্রীয় স্বীকৃতি ছাড়া কোনও মন্দির ধাম হয়ে যায় না। আর এই মন্দির ঘিরে এলাকার অর্থনীতিও নতুন করে চাঙ্গা হয়নি।’’
সর্বশেষ অভিযোগটি এলাকাবাসীর। মন্দির তৈরির জন্য যে দোকানিদের সরতে হয়েছে, তাঁদের বেশির ভাগই পুনর্বাসন পাননি। মন্দির প্রাঙ্গণের উল্টো দিকে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের ধাঁচে ডালা আর্কেড হয়েছে বটে, কিন্তু সেখানে রয়েছে সাকুল্যে দু’-তিনটি দোকান। বাকি সব স্টল বন্ধ। কর্কট রোগে আক্রান্ত দোকানি আলপনা প্রধান বললেন, ‘‘১২ বছর ধরে চায়ের দোকান চালিয়েছি। এখনও স্টল পাইনি।’’
মন্দিরে নিয়মিত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্যানুষ্ঠানেও স্থানীয় শিল্পীরা বিশেষ সুযোগ পাচ্ছেন না বলে দাবি। রামনগরের ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী কল্যাণ দাস দীর্ঘ ১৫ বছর নাচের দলের সঙ্গে যুক্ত। কলকাতা-সহ রাজ্যের নানা প্রান্তে অনুষ্ঠান করেছেন। তবে ঘরের কাছে জগন্নাথ মন্দিরে ডাক পাননি। কল্যাণ বললেন, ‘‘বিষয়টি প্রচারের আড়ালে রয়েছে।’’
ইসকনের তরফে রাধারমণের বক্তব্য, ‘‘রাজ্যের নানা প্রান্তের শিল্পীরা আবেদন করেন। তবে, স্থানীয়দের অগ্রাধিকার নেই। আর স্টলের বিষয়টি জেলা প্রশাসন দেখছে।’’ দিঘার ক্ষুদিরাম মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক চৈতন্য করণ বলেন, ‘‘কিছু দোকানিকে দিঘা হেলিপ্যাড ময়দানের কাছে পাঠানো হয়েছে। আরও ১২২টি স্টল ভোট মিটলেই বিলির ব্যবস্থা হবে।’’