মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
‘‘জানেন জয় বাংলা কবে স্লোগান দিই? যখন আপনাদের এক গুন্ডা ২০২১ সালে জিতেছিল। তার পরে সারা এলাকা তছনছ করেছিল। বাড়ি জ্বালিয়েছিল। খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলাম। রাতারাতি সব দখল করেছে। কাঁদছে ব্যারাকপুর, বীজপুর, জগদ্দল, কাঁছরাপাড়া। আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, আমাকে অশ্রাব্য গালাগাল দিচ্ছিল। আমি কিছু বলিনি, শুধু বলি, জয় বাংলা।’’
‘‘ওরা কোভিডের মৃত্যু শংসাপত্রে নিজেদের ছবি লাগায়। ওরা কী না পারে।’’
যুবসাথী, লক্ষ্মীর ভান্ডার-সহ বহু প্রকল্পের কথা তুলে ধরলেন মমতা। জানালেন, আগামী দিনে রাজ্যের সব ঘরে পানীয় জল পৌঁছে দেবেন।
মমতা বলেন, ‘‘স্বামী বিবেকানন্দের বাড়ি আমার সরকার কিনে ওদের হাতে তুলে দিয়েছে। দীঘায় জগন্নাথ মন্দির করে দিয়েছে। বিজেপির বিধর্ম, চাপিয়ে দেওয়া ধর্ম মানব?’’
‘‘ভুলে যান কে প্রার্থী, আমার মুখ মনে রাখবেন। মনে রাখবেন, দিদি বিপদের দিনের সাথী। দিল্লির জমিদার নয়।’’
‘‘চমক, ধমক, লাঞ্ছনা অনেক দেখেছি। কোনও দিন মাথা নত করিনি। আজও করব না। জনগণের আদালতে আগামী দিনে হতে হবে ভোটবন্দি। মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়েছো। টাকা নিয়েছো। সব জায়গায় বলেছো আধার কার্ড দরকার। এখন বলছো ভোটের সময়, আধার কার্ড নেই দরকার। এই হল চরিত্র।’’
‘‘অন্যদের চরিত্র হননের আগে নিজেদের চরিত্র ভাবুন। বাংলাকে অনেক বদলাম করেছেন। একদিন না এক দিন বুঝবে। আমি যখন রেলমন্ত্রী ছিলাম, আমাকে বাংলার রেলমন্ত্রী বলত। আমি পুষ্কর, অজমেঢ়, দিল্লির মেট্রো রেল, মুম্বই রেলবিকাশ কর্পোরেশন করে দেওয়ার পরেও এ সব বলত। এখনও হিংসা করে বাংলাকে।’’
‘‘মানুষ কী খাবে, তুমি ঠিক করবে? আমরা দুর্গা, লক্ষ্মী, কালী পুজো করি। আপনাদের চিঁড়ে-দইয়ের মেলা হয়। ছট পুজোয় ঘাট সাজিয়ে দিই। বড়দিনেও সাজাই।’’
‘‘বাংলাকে টার্গেট করেছে। যাদের নিয়ে এসেছেন, রোজ চমকাচ্ছেন। তারা দুঃখিত। এত কিসের অহঙ্কার? দুরাচারী, স্বৈরাচারী। এদের কোনও ক্ষমা নেই। যদি রক্ষা করতে হয় বাংলা, আগে অন্য কোনও পার্টিকে ভোট দিয়েও থাকলে এ বার আর দেবেন না। অন্য পার্টি জিতবে না। মাঝখান থেকে বিজেপি যাতে জিতে না যায়, তাই করুন। বিজেপি যাতে একটি আসনেও না জেতে, দেখবেন। বাংলার স্বার্থে।’’
‘‘আপনার সন্তান, শিক্ষা, ইতিহাস, খাবার, সংস্কৃতি, অধিকার যদি বাঁচাতে হয়, আপনাদের দরকার তৃণমূল সরকার। যে যতই নাটক, ছলনা করুক, একটা কথা বলবেন, ভোটে কেউ প্রার্থী হলে তাঁর নিজের কথা বলার অধিকার রয়েছে। কিন্তু ভোট রাজনীতির অঙ্গ। এক রাজনীতির লোক অন্য রাজনীতিক লোককে বলতেই পারে। কিন্তু আমি কাউকে কটূক্তি করব না। আপনারাও সৌজন্যের সীমারেখা রাখবেন।’’
মনে করা হচ্ছে, নাম না নিলেও পানিহাটির বিজেপি প্রার্থী আরজি করের নির্যাতিতার মাকে এই কথা বলেছেন মমতা। অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছেন পানিহাটির বিজেপি প্রার্থী। সেই নিয়ে কমিশনকে নালিশ জানিয়েছেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, পানিহাটির বিজেপি প্রার্থীর মন্তব্য কেবল নিন্দনীয়ই নয়, তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্যও ক্ষতিকর। মনে করা হচ্ছে, সেই প্রসঙ্গ তুলেই বৃহস্পতিবার পানিহাটিতে মুখ খুলেছেন মমতা।
‘‘এখন বিজেপি কুৎসা করছে। পরিকল্পনা করছে। নিজের ভোট নিজে দেবেন। ইভিএম খারাপ হলে তাতে ভোট দেবেন না। অনেক অপেক্ষা করেছেন লাইনে, এক দিন একটু অপেক্ষা করবেন। ভিভিপ্যাট ছাড়া ভোট দেবেন না। নতুন যন্ত্র এলে এজেন্টকে দেখতে হবে, তাঁর ভোট তাঁর দলেই পড়ছে কি না! এঁদের বিশ্বাস করি না।’’
‘‘যারা দাঙ্গা করে ক্ষমতায় আসে,তারা সব পারে।’’
‘‘কোথাও শুনি, এ সব বাঙালি, অবাঙালি করে। আপনারা যখন বাংলায় থাকেন, খান, রুজি, রোজগার করেন, শান্তিতে থাকুন। আমরা বিজেপি নই। ওরা ওড়িশায় বাঙালিকে অত্যাচার করে। মধ্যপ্রদেশে করে। আমরা কিন্তু (অবাঙালিদের উপর অত্যাচার) করি না । বিজেপির কথা শুনবেন না। এখানে শান্তিতে থাকুন।’’
‘‘বাড়িতে গিয়ে ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট চাইলে দেবেন না। বলবে, টাকা পাঠাব। যা আছে সব নিয়ে নেবে।’’
‘‘সিপিএম আমলে খড়দহ এসেছিলাম। অসীম দাশগুপ্ত ছিলেন বিধায়ক। উপনির্বাচন হয়েছিল। আমি দেখেছিলাম, সিপিএমের লোকজন ভোটারদের আটকে রেখেছিল। আমি সারা রাত ছিলাম। এখন বিজেপির তাই পরিকল্পনা। নাম বাদ দেওয়ার পরে আরও কী করতে পারে, তা দেখছে।’’
‘‘চার-পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশ এবং ভারত সরকারের বৈঠক ছিল। আমায় ডেকেছিল। সেখানে ১০-১২ জন ছিলেন। সেখানে ওঁরা দাঁড়িয়ে বলছেন। স্পষ্ট টেলিপ্রম্পটার দেখে বলছেন। এখানে এসেও সে ভাবে বাংলা বলে।’’
‘‘এখানে এসে বলে সুনার বাংলা তৈরি করবে। সুনার দেশ কি হয়েছে? নোটবন্দি করে লোকের টাকা কেড়েছ। গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। কালো টাকা কি ফেরত আনতে পেরেছেন?’’
‘‘ছদ্মবেশী মুখোশ! বিজেপির জুমলা সরকার। কে কী খাবে, পরবে, তোমার ঠিক করবে!’’
‘‘ডেরেক আমায় বলেছিল। ওর মা ওকে বলে, মোদীজি এত ভাল ইংরেজি বলেন! ও মাকে বলেছিল, বোঝো না চালাকি! টেলিপ্রম্পটার দিয়ে বলেন।’’
‘‘আজ নাকি আমোদী-প্রমোদী বলেছেন, বাংলায় মাছ উৎপাদন হয় না। বিহারে হয়। তুমি তো বিহারে মাছ খেতেই দাও না। এখানে তো সব খায়। আগে হায়দরাবাদ থেকে মাছ আসত। এখন আর লাগে না। পার্টি কানে কানে যা বলছে, তাই বলছো! উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানে মাছ খেতে দাও না। দোকানও বন্ধ। এখানে বলো, বিহারে এত মাছ হয়।’’
‘‘তুমি মাংসও পাঠাও বিদেশে। গোমাংস পাঠাও ওমানে। সৌদ আরবের গলায় যখন কোলাকুলি করো, ভাবো, ও হিন্দু না মুসলমান। দেশের বাইরে এক নীতি, ভিতরে এক নীতি!’’
‘‘এর পরের পরিকল্পনা হল এনআরসি। অসমে এনআরসি করে ১৯ লক্ষ লোকের নাম বাদ দিয়েছে। ১৩ লক্ষ হিন্দুও ছিল।’’
‘‘অনেক মতুয়া, তফসিলি, সংখ্যালঘুর নাম বাদ দিয়েছে। হিন্দুদের নাম কম বাদ দেয়নি। গাইঘাটা, বনগাঁ গিয়ে দেখে আসুন।’’
‘‘১০০ দিনের টাকা বন্ধ। গ্রামীণ আবাসনের টাকা বন্ধ। রাস্তা-সহ সব টাকা বন্ধ। দক্ষিণেশ্বর-নোয়াপাডা় কে করেছিল? স্কাইওয়াক করে করেছিল? আমি করেছিলাম। এই কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে! কলকাতা থেকে তাড়াতাড়ি যাচ্ছেন বড়মার মন্দির থেকে সব জায়গায়।’’
‘‘ভোটবাবুরা আসছে। এত নাম কেটে লজ্জা নেই? ৯০ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী? পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ২০২৫ সালে আপনারা বলেছিলেন, সারা দেশে মাত্র ২,০০০ কিছু অনুপ্রবেশকারী। আপনারা অনুপ্রবেশকারী? আজ যারা এখানে জন্মাল, তারা অনুপ্রবেশকারী? লাইনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করতে হবে যে নাগরিক!’’
‘‘যে সিপিএম এত অত্যাচার করেছে, একটা সিবিআই, ইডি ওদের বিরুদ্ধে হয়েছে? এসআইআরে যখন তৃণমূল লড়াই করে, তখন তোমাদের দেখা নেই। তখন তৃণমূলের বিএলএ-রা করবে। ঝড়, জল, উৎসবে নেই, চড়াই-উতরাইয়ে নেই। শুধু ভোটের সময়ে রয়েছে। বসন্তের কোকিল! ভোট শেষ ওরাও নিঃশেষ!’’
‘‘কমিশনকে ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা জানাই। ওদের নাম উচ্চারণ করি না। বিজেপির কাছে পৌঁছে দিন সব। দেবদীপ কাজ করত সংবাদমাধ্যমে। ও জানে সব। যত বিজেপি সার্ভে করবে, দেখাতে বাধ্য হয়। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলি, শুভ নববর্ষ। ওরা বলেছিল, তৃণমূলকে আলটিমেটাম। কমিশনের হ্যান্ডল থেকে টুইট করা হয়। অনেক নমস্কার। তার কারণ, তৃণমূল একমাত্র লড়তে পারে বিজেপির বিরুদ্ধে।’’
‘‘আমার যখন চার বছর বয়স, আমি মুদির দোকানে গেছি। এক জন বিড়ি ছুড়ে দেয়। একটা ছেলের গেঞ্জি পুড়ে গেছিল। পাড়ায় সভা ডাকা হয়। সেখানে জিজ্ঞেস করে, কে করেছে। আমি বলে দিই। বাবা বলেছিল, কেন বললি। আমি বলেছিলাম, সত্যি বলবই। এটা ব্যর্থতা বা স্বার্থকতা হতে পারে।’’
‘‘ওহে মোটাভাই, সাথে ইডি, সিবিআই। দিল্লিতে থেকে এল গাই, সাথে ইডি, সিবিআই। হুমকি দিচ্ছেন সকলকে। ধমক দিচ্ছেন। ওঁর কাজ ফোন করে ধমকানো। কেউ কেউ কিছু পাওয়ার জন্য মাথা নত করে। আমাকে কব্জা করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে, পারেনি। পারবেও না।’’
‘‘আমাকে ধমকালে আমি চমকাই। আমি মানুষের ভরসা। আমার নিজের বলে কিছু নেই। চাই ও না। বাবা ছোট বেলায় মারা গিয়েছেন। মা জিজ্ঞেস করেছিল বাবাকে, যা রেখেছো, সব বিলিয়ে দিচ্ছো, ছেলেমেয়েদের কী হবে? বাবা বলেন, ওরা মানুষ হবে।’’
‘‘বাবার একটা কথা মানতে পারি না, অপ্রিয় সত্য কথা বলবে না! আমি বলে ফেলি। এটা অপরাধ। অপ্রিয় হলেও যেটা সত্য, বলতে কাঁপব কেন।’’
‘‘যখন বন্যা হয়, একটা টাকা দেয় না। কেউ মারা যায়, টাকা দেয় না। বাংলায় কথা বললে অত্যাচার করে। বিহারে অত্যাচার হয়। ইউপি, রাজস্থানে হয়। দিল্লির জমিদারেরা জবাব দেবেন? কেন বাংলায় কথা বললে বিদেশি, অনুপ্রবেশকারী বলবেন?’’
‘‘সীমান্ত আটকানোর দায়িত্ব কার? আমোদী-প্রমোদীরা বলছেন, এটা না কি অনুপ্রবেশের কারখানা। আমি বলব বহিরাগতদের কারখানা! বহিরাগতদের কোনও ঠাঁই নাই।’’
‘‘আমি ভাগাভাগিতে বিশ্বাস করি না। কেউ কেউ বাঙালি-অবাঙালি করার চেষ্টা করছেন। কত লোককে দাঁড় করিয়েছেন কোনও কোনও আসনে। তাঁদের জমানত জব্দ করতে হবে।’’
‘‘বাইরে থেকে লোক আসছে। মিছিল করার লোক নেই বিজেপির। এজেন্সিকে দিয়ে হোর্ডিং লাগাচ্ছে। গরিব মানুষকে ৫০০ টাকা পকেটে গুঁজে দিয়ে বলছে, মিছিলে আসবে।’’
‘‘গত বার শুনেছি, এক জন চুল কাটে। তাঁর সেলুন বন্ধ। এক জন চুল কাটতে গিয়ে শোনেন, তিনি বলেন, রোজ বিজেপির মিছিলে যাই, ৫০০ টাকা পাই।’’
‘‘তৃণমূল করলে সবুজ ধ্বংস করা যাবে না। কেউ যদি ভাবেন, নবান্নে বসে রয়েছি বলে, পানিহাটি, কামারহাটি, উত্তর দিনাজপুর খোঁজ রাখি না, ভুল করবেন। আমি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে খোঁজ রাখি। যাঁরা লোভ করে তাঁদের জন্য তৃণমূল নয়। যাঁরা জবরদস্তি করবে, তাঁদের জন্য তৃণমূল নয়। এটা বিজেপি নয়। আমি মনে করি কর্মীরা আমার সম্পদ।’’
‘‘আজও নিজেকে কর্মী বলে পরিচয় দিই। আমার ধর্ম একটাই, মানবিকতা। আমার ধর্ম রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ, বাংলার মাটি, বাংলার জল।’’
‘‘প্রথমেই একটা কথা বলি, কাউন্সিলর, প্রার্থীদের। এখানে নির্মলদা বিধায়ক ছিলেন। তাঁকেই প্রার্থী করতে চেয়েছিলাম। তিনি ঠিক করেছেন, পারছেন না। পুত্রকে দিয়েছেন।’’