রবিবার রাইপুরের সভায় তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
মমতা বলেন, “মানুষকে যে অপমান করা হয়েছে, মানুষ ভোটের বাক্সে তার বদলা নেবে। এটা আমরা বিশ্বাস করি। যতই করো চক্রান্ত, সবটাই হবে ব্যর্থ। যতই করো হামলা, তৃণমূল জিতবে বাংলা। বিজেপি তুমি হ্যাংলা। তাই মানুষের ভোট বাদ দিয়ে জেতার চেষ্টা করছো।”
মমতা বলেন, “এখন তো গ্যাস দেওয়াও বন্ধ করে দিচ্ছে। ইলেকশনের কয়েক দিন হয়ত দেবে। তার পরে আর দেবে কি না জানি না। মিথ্যা কথা বলে শুধু। কেরোসিনও মাঝে দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এখন আমরা একটু কেরোসিন বাড়িয়েছি।”
বিজেপি-কে বিঁধে মমতা বলেন, “শুধু ভোটের সময়েই গ্যাস। ভোটের সময়েই ক্যাশ। তার পরেই এ পাশ, ও পাশ, ধপাস। এই তো বিজেপির কাজ। করছে লুট আর বলছে ঝুট। আদিবাসীদের উপরে কত অত্যাচার করেছে। কত জন বিএলও মারা গিয়েছে, তার মধ্যে আদিবাসীও আছে, হিন্দুও আছে, মুসলিমও আছে। ২২০ জনের উপর মারা গিয়েছে। তার মধ্যে অর্ধেক হিন্দু, অর্ধেক মুসলমান আছে। যারা ভাগাভাগি করে, মনে রাখবেন, তাদের পিছনে কোনও চক্রান্ত আছে।”
মমতা বলেন, “যে রাজ্যগুলোয় বিজেপি ক্ষমতায় আছে, বলে মাছ, মাংস, ডিম খাওয়া যাবে না। আরে যার যা অধিকার, সে সেটা খাবে! তোমরা কে ভাই! তুমি ঠিক করবে আমি ধামসা, মাদল, বাশি, হারমোনিয়াম, গিটার, একতারা, সেতার বাজাবো কি না! আমি মাছ-মাংস খাব কি না! বাচ্চারা ডিম খাবে কি না! ওগুলোর মধ্যে প্রোটিন আছে। না খেলে তো স্বাস্থ্য ভাল হবে না।”
মমতা বলেন, “ভোটের আগে বিজেপিকে জেতাতে হবে। তাই এসআইআর-এর নামে গণতন্ত্রের উপর অত্যাচার, গণতন্ত্রের সর্বনাশ হচ্ছে। আগে ছিল নোটবন্দি, এখন মানুষকে করছে ভোটবন্দি। এর পরে করবে ঘরবন্দি, তার পরে করবে জেলবন্দি। তার পরে লুটেপুটে খাও আর মানুষকে তাড়াও। সোজা বলুন, আমরা এ সব মানব না।”
মমতা আরও বলেন, “যদি ক্ষমতা থাকত, মানুষকে বলতে আপনি আপনার সরকার ঠিক করুন। মানুষ ভোট দিয়ে ঠিক করত। আপনারা কেন ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিলেন! কারণ, ভাবছেন সামনে থেকে হচ্ছে না। পিছন থেকে খেলছেন, মেঘের আড়াল থেকে। মেঘের আড়াল থেকে খেলতে গেলে, বিদ্যুতের ঝলকানিতে আপনাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। মাথায় রাখবেন। বিনাশকালে বুদ্ধিনাশ। বিজেপি ভ্যানিশ ওয়াশিং মেশিন গণতন্ত্রকে শেষ করছে। সংবিধানকে শেষ করেছে।”
মমতা বলেন, “মনে রাখবেন, এ বারে মানুষকে সবচেয়ে বেশি জ্বালিয়েছে বিজেপি। নোটবন্দিতে আপনারা লাইন দিয়েছেন, সব টাকা জমা নিয়ে নিয়েছে। কালো টাকা কিন্তু ফিরে আসেনি। আপনারা লাইন দিয়েছেন আধার কার্ড করার জন্য। পকেট থেকে ১০০০ টাকা করে দিয়েছেন। চারটে করে ফটো তুলেছেন। এখন বলেছে আধার কার্ড থাকলে ভোট হবে না! তা হলে আধার কার্ড করলেন কেন! টাকা ফেরত দিন। জনগনের টাকার কি কোনও মূল্য নেই!”
মমতা বলেন, “আপনারা বলুন কোথায় বাকি আছে কোন কাজটা? মা সারদার জন্মভিটে জয়রামবাটি-কামারপুকুরের উন্নয়নের জন্য আমরা ১০ কোটি টাকা দিয়েছি। এটা মাথায় রাখবেন। ডেভেলপমেন্ট বোর্ড করে দিয়েছি মহারাজদের আন্ডারে।”
মমতা বলেন, “যারা আমাদের শুধু গালাগালি দেয়, তাদের কি বোঝার ক্ষমতা আছে? এখন তো আমরা বলেছি, যে বৃদ্ধ বাবা-মায়েদের দেখার কেউ থাকবে না, আমরা তাঁদেরও দেখাশোনা করব। অনেক পরিবারে ছেলেমেয়ে বিদেশে চলে যায়। বাবা-মাকে দেখার কেউ থাকে না। আর কিছু বদমাশ লোক এসে তাঁদের বাড়িঘর দখল করে নেয়। আমরা তা হতে দেব না। আমরা প্রবীণদেরও যত্ন নেব।”
মমতা বলেন, “অনেকের অ্যাক্সিডেন্টে হাত-পা কেটে যায়। তখন তাঁদের সারাজীবন কাঠের পা, কাঠের হাত নিয়ে চলতে হয়। যে পারে না, তাঁদের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হয়। আমরা পিজি-তে একটা ‘বোন ব্যাঙ্ক’ তৈরি করছি। ওখানে আমরা হাড়গুলো জমা করব। যদি কারও পায়ে, হাতে সমস্যা হয়, সেই হাড় দিয়ে আমরা সেট করে দেব।”
মমতা বলেন, “বেলপাহাড়িতে আমি একবার লুকিয়ে স্কুটারে করে গিয়েছিলাম গ্রামে। গিয়ে দেখেছিলাম, আদিবাসী ভাইবোনেরা কালো কালো কী যেন রান্না করছে কাঠ জ্বেলে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী। বলল, আমরা সপ্তাহ দু’দিন ভাত খেতে পাই। পাঁচ দিন পাই না। আমি বললাম ওটা কী ফোটাচ্ছ? বলল, ওটা তো পিঁপড়ে। যে পিঁপড়ে আমরা গাছ থেকে তুলে আনি, গাছের শিকড় দিয়ে ওটা ফোটাই। ওটা খেয়ে থাকি। আমি ক্ষমতায় এসে সিদ্ধান্ত নিই, আগে খাদ্য তুলে দিতে হবে মানুষের হাতে। প্রথমে আদিবাসী ভাইবোনেরা পেত। এখন সবাই পায়। প্রায় ৯৫ শতাংশ লোক বিনাপয়সায় রেশন পায় রাজ্যে। বিশ্বসেরা খাদ্যসাথী প্রোগ্রাম।”
মমতা বলেন, “যুবসাথী ভিক্ষা বা ভাতা নয়। যে বিজেপি মিথ্যা কথা বলে বেড়াচ্ছে, ভাঁওতা। আমি ওদের বলি, ওরে শোন, তোরা তো কোনওদিন সংসার চালাসনি। গ্রামে জন্মাসনি, পা-ও রাখিস না। অনেক গরিব ছেলেমেয়েরা আছে, যারা স্কলারশিপ পেলেও হাতখরচা নেই। কেউ মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে যাচ্ছে, তার হাতখরচা নেই। এটা তাদের পকেটমানির জন্য দেওয়া হচ্ছে। যাতে তারা নিজেদের খরচ নিজেরা চালিয়ে নিতে পারে।”
মমতা বলেন, “বিধবা ভাতা আমরা আরও বাড়াব। আমাদের আগামী সরকার এলে সকলের কাঁচা বাড়িকে পাকা বাড়ি করে দেব। আমি কথা দিলে কথা রাখি, মাথায় রাখবেন। সকলের বাড়িতে পানীয় জলের কল পৌঁছে যাবে।”
মমতা বলেন, “আগের বার বলেছিলাম লক্ষ্মীর ভান্ডার করব। করেছিলাম? এখন তা বেড়ে ১৫০০ টাকা হয়ে গিয়েছে। এসসি, এসটি-রা পান ১৭০০ টাকা করে। যদি এটা পাঁচ বছরে হিসাব করেন, তা হলে এটা কত হাজার টাকায় দাঁড়ায়? আর বিজেপি ভোটের আগে বলে— আমরা আপনাদের অনেক টাকা দেব। বিহারে কী করেছিল জানেন? ভোট নেওয়ার ছলনায় মেয়েদের অ্যাকাউন্টে ৮০০০ টাকা দিল। যেই জিতে গেল, বুলডোজ়ার চালিয়ে দিল। বলল, টাকা ফেরত দাও। আমাদের টাকা কিন্তু ফেরত দিতে হয় না। ওটা আপনার টাকা। আপনার অধিকার। যখন নোটবন্দি হয়েছিল, তখন এটা আমার প্রথম মনে হয়েছিল। মেয়েরা কিছু পয়সা জমিয়ে রাখে ভবিষ্যতে পরিবারের কাজে লাগবে বলে। কিন্তু যখন নোটবন্দি হয়, আপনাদের সব পুরনো টাকা ব্যাঙ্কে জমা দিতে হয়েছিল। সেই দিন আমার মনে হয়েছিল, সরকারি প্রকল্প করো লক্ষ্মীর ভান্ডার। যাতে মেয়েদের লক্ষ্মীর ভান্ডার মেয়েদের অধিকার দেয়। যত দিন বাঁচবেন, তত দিন পাবেন। এটা আপনার কর্তব্য যে আপনার অধিকারকে রক্ষা করা। আমরা কেউ নই। আমরা নিমিত্ত মাত্র। ”
মমতা বলেন, “জঙ্গলমহলে একসময়ে সারেঙ্গা, বিনপুর, সাঁকরাইল, নয়াগ্রাম থেকে শুরু করে ঝিলিমিলি, বেলপাহাড়ি, মুকুটমণিপুর, রানিবাঁধ, খাতরা হয়ে সব বন্দুকের নল ঘুরে বেড়াত। ক্ষমতায় এসে প্রথম আমরা যেটা করেছিলাম— জঙ্গলমহলের মাটিতে রক্ত নয়, শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম আমরা। তাই আজ আপনারা মনের শান্তিতে বাড়িতে ঘুমোতে পারেন।”
মমতা বলেন, “আমাদের আমলে বালুচরি শাড়ি জিআই ট্যাগ পেল। আমি একদিন বালুচরি শাড়ি হাতে নিলাম। দেখলাম খড়খড়ে। আমি তখন তাঁতিদের বললাম, এটাকে হালকা করো। এখনকার মহিলারা একটু হালকা হালকা, একটু নরম জিনিস পরতে ভালবাসেন। এখন দেখবেন বালুচরিটা নরম হয়ে গিয়েছে অনেক। ছেলেদের পাঞ্জাবিও পাওয়া যায়। বিশ্ববাংলার দোকানে বালুচরি শাড়ি আমরা সারা পৃথিবীর যেখানেই যাই, সঙ্গে করে নিয়ে যাই। বাঁকুড়ার ডোকরার কাজ— মা দুর্গা, ঘোড়া, আদিবাসী নৃত্যের কাজগুলি আমরা সঙ্গে করে নিয়ে যাই।”
মমতা বলেন, “বাঁকুড়ার রাস্তাঘাট আগে কী অবস্থায় ছিল, অনেক রাস্তাঘাট আমরা তৈরি করেছি। অনেক ব্রিজও তৈরি করেছি। অনেক জলপ্রকল্প তৈরি করেছি। অনেক অনুর্বর জমিকে উর্বর করেছি। আগামী দিনে আরও কাজ আমরা করব।”
মমতা বলেন, “প্রত্যেক বার মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের রেজ়াল্ট বেরোলেই আমি দেখি বাঁকুড়ার ছেলেমেয়েরা সকলের আগে। কল্পনা করতে পারবেন না। কলকাতায় যত ডাক্তার আছেন, বেশির ভাগের বাঁকুড়ায় একটা না একটা ঘর আছে। বাঁকুড়া জেলা শিক্ষা, সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। মা সারদার জন্মস্থান জয়রামবাটি। বিষ্ণুপুরের সঙ্গীত ঘরানা রয়েছে। মুকুটমণিপুর ডেভেলপমেন্ট বোর্ড, জয়রামবাটি কামারপুকুর ডেভেলমেন্ট বোর্ড আমাদের সরকার তৈরি করেছে।”
রাইপুরের সভামঞ্চে পৌঁছোলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঞ্চে রয়েছেন এই বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূলপ্রার্থী ঠাকুরমনি সোরেনও। সব ধর্ম, বর্ণ, সব সম্প্রদায়কে আমি শুভকামনা জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করেন তিনি।
মানবাজারের জনসভা শেষ করে বাঁকুড়ার রাইপুরে সভা করবেন মমতা। রবিবার দুপুরে রাইপুরের সবুজ সংঘ ক্লাবের মাঠে সভা রয়েছে তাঁর। রাইপুরের তৃণমূল প্রার্থী ঠাকুরমনি সোরেনের হয়ে প্রচারসভায় কী বার্তা দেবেন দলনেত্রী, তা নিয়ে কৌতূহলী দলীয় কর্মী-সমর্থকেরা।
জেলায় জেলায় ঘুরে দলীয় প্রার্থীদের হয়ে ভোটের প্রচার করছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার দুই জেলার দুই বিধানসভা কেন্দ্রে তাঁর প্রচার কর্মসূচি রয়েছে। প্রথমটি পুরুলিয়ার মানবাজারে। দ্বিতীয়টি বাঁকুড়ার রাইপুরে।