West Bengal Elections 2026

বিডিও অফিসে তাণ্ডবের সেই মনিরুল অভিমানে

তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় আর জায়গা হয়নি মনিরুলের। সেই জায়গায় শমসেরগঞ্জের আমিরুলকে নিয়ে আসা হয়েছে। তার জেরে ক্ষুব্ধ মনিরুল নির্দল হিসেবে দাঁড়াবেন বলেও ভেবেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সভা করতে এসে কার্যত হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরে তিনি নিরস্ত হয়েছেন।

বিপ্রর্ষি চট্টোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:২৮
মনিরুল ইসলাম।

মনিরুল ইসলাম। — ফাইল চিত্র।

প্রায় ৬৭% সংখ্যালঘু ভোট। বিজেপির কাছে কার্যত দুঃস্বপ্নের মতো। তবু ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ফরাক্কা নামের চাঁদ ধরেছিল বিজেপি! সেই অসম্ভব সমীকরণ সম্ভব হয়েছিল ভোট কাটাকাটির অঙ্কে। সাত বছর পরে ‘মোচড়ে’ ভরা ফরাক্কায় যেন উঁকি দিচ্ছে সেই সম্ভাবনাই।

ফরাক্কার বিদায়ী বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেসের মনিরুল ইসলাম। কেন্দ্রের সংশোধিত ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদ ঘিরে শমসেরগঞ্জের হিংসার ঘটনায় বিতর্ক হয়েছিল তাঁর নাম নিয়ে। তবে সেই ঘটনায় অনেক বেশি আলোচনায় ছিলেন সেখানকার বিদায়ী বিধায়ক আমিরুল ইসলাম। তার পরে এসআইআর-এর সময় বিডিও দফতরে তাণ্ডবের ঘটনায় বিতর্কে জড়িয়েছিলেন মনিরুল। তাঁর নামে এফআইআর-ও হয়েছিল। তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় আর জায়গা হয়নি মনিরুলের। সেই জায়গায় শমসেরগঞ্জের আমিরুলকে নিয়ে আসা হয়েছে। তার জেরে ক্ষুব্ধ মনিরুল নির্দল হিসেবে দাঁড়াবেন বলেও ভেবেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুর্শিদাবাদে সভা করতে এসে কার্যত হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরে তিনি নিরস্ত হয়েছেন। কিন্তু নেপথ্যে কী চলছে?

ধুলিয়ানের ডাকবাংলো মোড় থেকে এগিয়ে রতনপুরে পেল্লাই বাড়ি। কালো রঙের এসইউভি পাহারা দিচ্ছে খাঁ খাঁ বাড়িটাকে। এক তলায় মনিরুলের অফিস ঘরের সামনে চৌকি পেতে বসে দু’জন। মধ্যাহ্ন ভোজনের পরে সামান্য বিশ্রাম সেরে ঘরে ঢুকলেন মনিরুল। দল প্রার্থী করল না কেন, প্রশ্ন করায় কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘‘সেটা তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলতে পারবেন। কেন বিধায়ককে টিকিট না-দিয়ে শমসেরগঞ্জ থেকে প্রার্থী আনতে হল!’’ দলের উপরে অভিমান? তাঁর সাফ কথা, ‘‘অভিমান ছিল। কিন্তু মমতাদি, অভিষেক দু’জনেই ফোন করেছিলেন। বলেছেন, সরকারে এলে অন্য কোনও বড় পদ দেবেন। আপাতত অভিমান নেই।’’

কিন্তু এটা যে শুধুই মুখের কথা, বোঝা গেল কিছু ক্ষণ পরে। নির্দল হিসেবে তিনি কি মনোনয়ন দিয়েছিলেন? উত্তরে বললেন, ‘‘কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু ওরা এখানে আগে থেকেই মহতাব শেখকে প্রার্থী করবে বলে ঠিক করে রেখেছিল। কিন্তু ওর নামটা ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছিল। তাই আমি মনোনয়ন জমা দিয়ে রেখেছিলাম বিকল্প হিসেবে। শেষ মুহূর্তে হাইকোর্ট থেকে ওর নামটা ফিরে আসে।’’ তার পরে আপনি মনোনয়ন তুলে নিলেন মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি পেয়েই? মনিরুল হেঁয়ালির হাসি দিয়ে বললেন, ‘‘মনোনয়ন দিতে গেলে বিদায়ী বিধায়কদের বিধায়ক আবাসের ‘ডিউ সার্টিফিকেট’ দিতে হয়। আর জ়িরো ব্যালেন্স অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। এই দু’টোই আমার ছিল না। আমার মনোনয়ন এমনিই বাতিল হয়ে যেত।’’ ভবিষ্যতে কোন পথে যাবেন? মনিরুলের জবাব, ‘‘এখনও দলে (তৃণমূল) আছি। তবে দল কোনও কাজ দেয়নি। যিনি প্রার্থী হয়েছেন, তাঁর এতটাই ঔদ্ধত্য যে, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি!’’

মুর্শিদাবাদ জেলায় হলেও ফরাক্কা বিধানসভা আসনটি মালদহ দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে। লোকসভায় ২০১৯ সালে কংগ্রেসের সদ্যপ্রয়াত আবু হাসেম (ডালু) খান চৌধুরী জিতেছিলেন। সারা রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট না-হলেও বহরমপুর এবং মালদহ দক্ষিণ আসনে প্রার্থী দেয়নি সিপিএম। বিধানসভা-ভিত্তিক ফলাফলে দেখা গিয়েছিল, তৃণমূল এবং কংগ্রেসের আড়াআড়ি ভোট বিভাজনে এগিয়ে গিয়েছে বিজেপি। পরে ২০২১ সালে অবশ্য ৫৪%-এরও বেশি ভোট পেয়ে মনিরুল এই বিধানসভায় জেতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ইশা খান চৌধুরী প্রার্থী যখন, তৃণমূলের ভোট নেমে আসে ২০%-এর কাছে। সিপিএমের সঙ্গে জোট করে এক লাফে ১৯ থেকে ৪৮% ভোট পায় কংগ্রেস। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজেপির ভোটও বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ৪% বেড়ে দাঁড়ায় ২৬%-এ। এ বার একলা লড়াইয়ে সিপিএমও। ভোট ভাগাভাগির অঙ্ক শেষ পর্যন্ত অঘটন ঘটায় কি না, সেই নিয়ে চর্চা রয়েছে এলাকায়।

এলাকা জুড়ে দাপট বিড়ি শিল্পের। সেই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেকেই বলছেন, বিড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, তৃণমূলের আমিরুলই এগিয়ে। তবে দোকানি থেকে সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছেন, এগিয়ে রয়েছে কংগ্রেস। হাইওয়েতে ওঠার আগে বসতি এলাকায় রাস্তার এক দিকে ফরাক্কা এবং অন্য দিকে শমসেরগঞ্জ কেন্দ্র। পুরসভা ধুলিয়ান। সেই রাস্তার মোড়ে পানের দোকানে আলোচনায় সারমর্ম, এই দু’টো আসনেই কংগ্রেসের পাল্লা ভারী। এগিয়ে থাকবে ধুলিয়ান পুর-এলাকা থেকেও।

এই বিধানসভা কেন্দ্রে ‘বিবেচনাধীন’ তালিকা থেকে বাদ হয়ে গিয়েছেন ৩৮ হাজার ভোটার। বাদ গিয়েছিলেন কংগ্রেস প্রার্থী মহতাবও। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে ট্রাইবুনালের সিদ্ধান্তে ফিরে এসেছেন। তিনি মেনে নিচ্ছেন, এই জটিলতায় অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে। তবে তার পরেও আত্মবিশ্বাসী। মহতাবের কথায়, ‘‘ফরাক্কার ভূমিপুত্র আমি। মানুষ আমার কথা বিশ্বাস করেন।’’

তবে আমিরুলের পাল্টা দাবি, ‘‘প্রত্যেক নির্বাচনের বিষয় আলাদা হয়। এই নির্বাচন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী রাখার নির্বাচন। এ বার মানুষ অন্য কোথাও ভোট দেবেন না।’’ মনিরুল-প্রশ্নে তাঁর মন্তব্য, ‘‘কেউ কেউ নিজেকে অনেক কিছু ভাবতে পারেন! আমাদের এক জনই নেত্রী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ছবিতেই ভোট হত, তাঁর ছবিতেই ভোট হবে।’’

আরও পড়ুন