হয়রান: রানাঘাটে জেলাশাসকের দফতরে ট্রাইবুনালে আবেদনকারীদের ভিড়। ছবি: প্রণব দেবনাথ।
‘ভাই, ভাই, এসআইআর কী বলছে? ঝাড়াই-বাছাই চলছে।’
‘হুলি-গান-ইজ়ম’-এর এই গানের পরেও কেটেছে সময়। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) ‘ঝাড়াই-বাছাই’ পর্ব শেষে নদিয়ায় আটকে গিয়েছেন চার লক্ষ ৮৬ হাজার ভোটার! তার মধ্যে মতুয়া-প্রধান নদিয়ার দক্ষিণাংশের আটটি বিধানসভা কেন্দ্রের মোট এক লক্ষ ১৪ হাজারের নাম বাদ গিয়েছে, যা নদিয়া জেলার মোট নাম বাদ যাওয়া ভোটারের প্রায় ৫৫ শতাংশ! আর শতাংশের বিচারে ‘বিবেচনাধীন’ ভোটার বাদ যাওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্যে প্রথম নদিয়া (৭৮ শতাংশ)! ফলে, জনবিন্যাস এবং পূর্ববর্তী নির্বাচনের ফলের নিক্তিতে বর্তমান পরিস্থিতি আঁচ করার যাবতীয় সূত্র ঘেঁটে গিয়েছে।
নদিয়ায় ২০২১ সালে যে কেন্দ্রে যে দলের ভোট বেশি ছিল, এসআইআরে আপাত ভাবে সেই কেন্দ্রে সেই দলেরই বেশি ভোট কাটা গিয়েছে! দক্ষিণ নদিয়া হিন্দু-প্রধান, মতুয়া ও অন্য উদ্বাস্তুদের সংখ্যা বেশি। সেখানে আটটি বিধানসভা কেন্দ্রের (রানাঘাট-দক্ষিণ, রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম, রানাঘাট উত্তর-পূর্ব, কৃষ্ণগঞ্জ, চাকদহ, হরিণঘাটা, শান্তিপুর ও নবদ্বীপ) মধ্যে গত বার সাতটিতেই (ব্যতিক্রম নবদ্বীপ) জেতে গেরুয়া শিবির। এ বার দক্ষিণ নদিয়ায় বাদ পড়াদের অধিকাংশই মতুয়া ও অন্য উদ্বাস্তু। তবে, অজস্র ছোট-বড় সমীকরণ শিরা-উপশিরা ছড়িয়েছে মহাপ্রভুর জেলার ভোট-রাজনীতির শরীর জুড়ে। তাই শান্তিপুর ও চাকদহের দু’টি জনসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহু মতুয়ার ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য বিজেপি-কে হুঙ্কার দিলেও, ঘাসফুল স্বস্তিতে নেই। পদ্মফুলও নির্দ্বিধায় পাপড়ি মেলতে পারছে না।
নদিয়া দক্ষিণের রানাঘাট উত্তর-পূর্ব কেন্দ্রে ৪২৫৬৭, রানাঘাট দক্ষিণ কেন্দ্রে ৪০২১৮ এবং কৃষ্ণগঞ্জ কেন্দ্রে ১৪৯৬৬ নাম বাদ গিয়েছে। এই তিনটি কেন্দ্রে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মতুয়া ভোটারের বাস। রানাঘাট উত্তর-পূর্বে গত বার বিজেপি জিতেছিল ৩১৭৮২ ভোটে, রানাঘাট দক্ষিণে বিজেপির জয়ের ব্যবধান ছিল ১৬৫১৫ ভোট আর কৃষ্ণগঞ্জে ২১২৭৭ ভোটে গত বার বিজেপি জয় পেয়েছিল। অর্থাৎ, রানাঘাট উত্তর-পূর্ব ও রানাঘাট দক্ষিণে গত বারের জয়ের ব্যবধানের তুলনায় এ বারে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাদ গিয়েছেন।
রানাঘাট উত্তর-পশ্চিমে বাদ গিয়েছে ৩৫৯১২ জনের নাম। গত বার বিজেপি ২৩১২৮ ভোটে জিতেছিল। হরিণঘাটায় বাদ পড়েছেন ২৩৯৯১ জন। গত বার বিজেপি ১৫২০০ ভোটে জেতে। শান্তিপুরে নাম বাদ ৩১৬৮৩ জনের। গত বার বিজেপির জয়ের ব্যবধান ১৫৮৭৮। চাকদহে বাদ ২৯৮৪২ জন। গত বার বিজেপি এখানে ১১৬৮০ ভোটে জয়ী হয়। নবদ্বীপে ২৪০৭৪টি নাম বাদ গিয়েছে। গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূল এখানে ১৮৫৭১ ভোটে জিতেছিল।
এই অবস্থায় ২০২৬-এর ভোটে কোন দল বাড়তি, কোন দল কমতি? হরিণঘাটার বিজেপি প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক, ‘পশ্চিমবঙ্গ উদ্বাস্তু সেল’-এর রাজ্য আহ্বায়ক, মতুয়া সম্প্রদায়ের অসীমকুমার সরকারের জবাব, ‘‘আমার এখানে মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটার বাদ গিয়েছেন প্রায় ১১ হাজার। এর মধ্যে প্রায় আট হাজার ভোট তৃণমূল ছাপ্পা দিত। সেই ভোটটা এসআইআরে বাদ গিয়েছে। তা ছাড়া, প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া এত তীব্র যে, অনেক হিন্দু ভোট যোগ হবে। মতুয়াদের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) অনুযায়ী সার্টিফিকেট দেওয়াও শুরু হয়েছে। এ বারে ভোট দিতে না পারলেও, বিজেপি এলে সিএএ-র মাধ্যমে মতুয়ারা স্থায়ী নাগরিক হবেন। তা বুঝেই মতুয়া ও উদ্বাস্তু সমাজ বিজেপি-কেই ভোট দেবেন।’’
হরিণঘাটায় বর্ষীয়ান গায়ক-রাজনীতিক অসীমের বিরুদ্ধে তৃণমূলের প্রার্থী তরুণ চিকিৎসক রাজীব বিশ্বাস। তবে, তিনি ভূমিপুত্র নন এবং তাঁর নাগরিকত্ব ও পিতৃপরিচয়ের কাগজ ভুয়ো বলে দাবি করে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ ঠুকেছেন অসীম। যদিও অসীমের যাবতীয় দাবি ও অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করে রাজীব বলছেন, ‘‘নদিয়ায় এসআইআর বুমেরাং হবে বিজেপির কাছে। মতুয়াদের একটি ভোটও বিজেপি পাবে না।’’
পায়রাডাঙার প্রীতিনগর এলাকার নমঃশূদ্র পাড়া, পাশের মতুয়া পাড়া হোক কিংবা নবদ্বীপের বামুনপুকুরের মুসলিম পল্লি— এসআইআরের প্রভাব নিয়ে মানুষ দ্বিধাবিভক্ত। প্রীতিনগরের মতুয়া কুমোরপাড়ায় নাম বাদ যাওয়া উদ্বিগ্ন ভোটারদের যেমন তৃণমূলের কর্মীরা তাতাচ্ছেন, ‘‘আরও দাও মোদীকে ভোট। যদি এ দেশে থাকতে চাও, এ বার দিদিকে ভোট দাও।’’ আবার সেই পাড়ারই মতুয়াদের অন্য অংশ নিশ্চিন্ত গলায় বলছেন, ‘‘এ বারে বাদ পড়লেও আমরা সবাই সিএএ-তে আবেদন করেছি। অনেকে ইতিমধ্যে সার্টিফিকেট পেয়েছেন। বিজেপি ছাড়া, আর কেউ আমাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা ভেবেছে? এ বার বিজেপি গত বারের থেকেও বেশি ভোট পাবে।’’
নবদ্বীপের মুসলিম পল্লিতে এসআইআর-আতঙ্ক স্পষ্ট। বামুনপুকুর-২ পঞ্চায়েতের চারটি বুথে ১৩৫০ জন ভোটারের মধ্যে ২৫৬ জনের নাম বাদ। এলাকার পারফিনা বিবি, আসমিয়া বিবি, আব্দুল রাজ্জাক মোল্লা, আব্দুল করিম শেখদের কথায়, ‘‘মমতা কত জোর গলায় বললেন, এসআইআর হতে দেবেন না। কিন্তু কী করলেন? সব সময়ে ওঁর পাশে থেকেও আমরা জলে পড়লাম। বিজেপি আমাদের চায় না। বামফ্রন্টের তেমন শক্তি নেই। কাকে ভোট দেব বলুন তো!’’
বিভ্রান্তির জায়গা আরও অনেক রয়েছে। বিজেপি ও তৃণমূলের অন্দরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, মুকুটমণি অধিকারীর বার বার দল বদল এবং এ বার টিকিট না পাওয়া, কৃষ্ণগঞ্জে গত বারের হারা প্রার্থী সমীর পোদ্দারকে তৃণমূলের টিকিট দেওয়া, চাকদহে পুরসভার দুর্নীতির জেরে তৃণমূলের বোর্ড ভেঙে যাওয়া, রানাঘাটে ভোটের মুখে প্রাথমিক শিক্ষক তথা ভোটকর্মী সৈকত চট্টোপাধ্যায়কে মারধর, মমতার ঘোষিত ১১০০ কোটি টাকার সেতু শান্তিপুরে না হওয়া এবং নবদ্বীপে তৃণমূল প্রার্থী তথা দীর্ঘদিনের বিধায়ক, বর্ষীয়ান পুণ্ডরীকাক্ষ সাহার অসুস্থতা। নদিয়ার দক্ষিণের এই একমাত্র ‘তৃণমূল গড়’-এ পুণ্ডরীকাক্ষের প্রতিনিধি হিসাবে প্রচারে নামানো হয়েছে নবদ্বীপের পুরপ্রধান বিমানকৃষ্ণ সাহাকে। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ থাকায় এলাকার লোকজন বিষয়টিকে মোটেই ভাল চোখে দেখছেন না।
তুলনায় চাপমুক্ত হয়ে ভোটে লড়ছে বাম ও কংগ্রেস। সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অলকেশ দাস, জেলা কংগ্রেস সভাপতি নিত্যগোপাল মণ্ডলদের বক্তব্যের নির্যাস— যে পরিমাণ লোক নদিয়ায় এসআইআরে বাদ গিয়েছে, তা প্রায় দুটো বিধানসভা কেটে বেরিয়ে যাওয়ার মতো। বিজেপি বা তৃণমূল, কেউই জোর গলায় বলতে পারবে না যে, তারা জিতছে।
তবে ‘ইলেকশন’-এর ব্যাপারে কোনও ‘টম, ডিক, হ্যারি’র কথা জনগণ শোনেনি, শুনবেও না। ভোট-বাক্সে জনতার কোন ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটবে, তা আঁচ করতে পারছে না মোদী-পক্ষ বা মমতা-শিবির।