TMC Candidate List 2026

নেই তারকা-চমক! বিধানসভার প্রার্থিতালিকায় রাজনীতিকদের নাম বাড়ালেন মমতা-অভিষেক, ‘নতুন’ তৃণমূলের পথে পদক্ষেপ

গত দু’মাস ধরে নানা মহল থেকে নানা তারকার নাম তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা যে কল্পনার বুদবুদ ছিল, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে তৃণমূলের প্রার্থিতালিকা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২৬ ২০:৪৩
No new celebrity faces in TMC candidate list, many political activists get tickets

প্রার্থিতালিকা হাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার কালীঘাটে তৃণমূলের দফতরে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

দেড় দশকেরও বেশি সময় পরে বড় কোনও নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায় রইল না কোনও তথাকথিত ‘তারকা চমক’। বিধানসভা নির্বাচনের জন্য মঙ্গলবার রাজ্যের ২৯১টি কেন্দ্রের (পাহাড়ের তিনটি আসন তৃণমূল ছেড়ে রেখেছে অনীত থাপাদের জন্য) প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই তালিকায় নতুন কোনও তারকার নাম নেই। বরং বারাসত এবং উত্তরপাড়ায় দুই অভিনেতা চিরঞ্জিত চক্রবর্তী এবং কাঞ্চন মল্লিককে টিকিট দেওয়া হয়নি। পাশাপাশিই এমন অনেক নতুন মুখকে প্রার্থী করা হয়েছে, যাঁরা আপাদমস্তক ‘রাজনৈতিক’।

Advertisement

গত দু’মাস ধরে নানা মহল থেকে নানা তারকার (মূলত টলিউড) নাম তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা যে কল্পনার বুদবুদ ছিল, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে মঙ্গলবার তৃণমূলের প্রার্থিতালিকা। ঘটনাপ্রবাহ বলছে, যাঁদের নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ছিল, তাঁদের অনেককেই এ বার ২১ ফেব্রুয়ারি ‘বঙ্গসম্মান’ দেওয়া হয়েছে। তখন থেকেই দলের অন্দরে এই বার্তা পৌঁছে গিয়েছিল যে, খ্যাতনামীরা পুরস্কারে ভূষিত থাকবেন, রাজনীতিকেরা থাকবেন রাজনীতিতে। সেই বিভাজনরেখা তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বাস্তবে অন্যকিছু ঘটেনি।

নতুন কোনও তথাকথিত ‘তারকা’ বা ‘খ্যাতনামী’ যেমন তৃণমূলের প্রার্থী হননি, তেমনই পুরনো মুখেদের কয়েক জনের আসন বদলে দেওয়া হয়েছে। গত বার পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর থেকে জয়ী অভিনেতা সোহম চক্রবর্তীকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে নদিয়ার করিমপুরে। আবার প্রাক্তন ফুটবলার বিদেশ বসুকে প্রার্থী করা হয়েছে হুগলির সপ্তগ্রামে। দলিত সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারী টিকিট পাননি। বাদ পড়েছেন প্রাক্তন ক্রিকেটার তথা মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি। তবে বাকি যে যে ‘তারকা’ ছিলেন, তাঁরা টিকিট পেয়েছেন। তাঁদের পুরনো কেন্দ্রেই প্রার্থী করা হয়েছে অভিনেত্রী লাভলি মৈত্র, সঙ্গীতশিল্পী অদিতি মুন্সিকে। প্রাক্তন ক্রিকেটার শিবশঙ্কর পাল এবং ক্রীড়াবিদ স্বপ্না বর্মণকে প্রার্থী করা হয়েছে। তবে তৃণমূলের অনেকের ব্যাখ্যা, এই দু’জনকে ঠিক ‘তারকা’ হিসাবে প্রার্থী করা হয়নি। তাঁদের মনোনয়নের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে ‘স্থানীয় সমীকরণ’। তুফানগঞ্জের ভূমিপুত্র শিবশঙ্করকে সেখানেই প্রার্থী করা হয়েছে। আবার তাঁর নিজের এলাকা জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জে প্রার্থী করা হয়েছে স্বপ্নাকে।

তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বরাবরই তথাকথিত ‘টলিউড তারকা’-দের প্রার্থী করার বিষয়ে গররাজি থেকেছেন। কারণ, এঁদের মধ্যে সিংহভাগ নিজের কেন্দ্রে সময় দিতে পারেন না। যেমন সময় দিতে পারেন না আইনসভাতেও। লোকসভা ভোটের সময় অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তী এবং নুসরত জাহানের দৃষ্টান্ত সেই বার্তা বহন করেছিল। আবার তাঁরা বাদ পড়লেও নতুন তারকা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়।

বস্তুত, খ্যাতনামীদের মধ্যে কেউ রাজনীতিতেই বেশি সময় অতিবাহিত করলে তাঁদের নিয়ে অভিষেকের সমস্যা নেই। যে কারণে শতাব্দী রায় বা সায়নী ঘোষের টিকিট পেতে অসুবিধা হয়নি। অভিষেক বিশ্বাস করেন, রাজনীতি কোনও মামুলি বিষয় নয়। তারকাদের চাকচিক্যে রাজনীতির মৌলিক বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। আবার তারকা বলেই যে তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখবেন, এই মনোভাবও নেই। যে কারণে, শতাব্দী রাজনীতির প্রতি নিষ্ঠা প্রমাণ করেই লোকসভায় তৃণমূলের উপদলনেত্রী হয়েছেন। অভিষেক এ-ও মনে করেন যে, মানুষের দৈনন্দিন কাজে এক জন রাজনীতিক জনপ্রতিনিধি থাকলে তিনি যে পরিষেবা দেবেন, তারকাদের থেকে সেটা পাওয়া যায় না। আবার এ-ও ঠিক যে, তারকা হওয়া সত্ত্বেও তৃণমূলে অনেকেই মন দিয়ে রাজনীতি করছেন। শতাব্দীর পরে তেমন উদাহরণ জুন মালিয়া। যাঁকে বিধানসভা থেকে তুলে নিয়ে লোকসভায় পাঠানো হয়েছে।

প্রার্থিতালিকায় এই যদি হয় প্রথম বার্তা, তারই সমান্তরাল বার্তা দেওয়া হয়েছে রাজনীতিকদের প্রার্থী করে। রাজ্যসভায় আবার না-পাঠিয়ে বিধানসভায় প্রার্থী করা হয়েছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাঁকে টিকিট দেওয়া হয়েছে উলুবেড়িয়া পূর্ব গ্রামীণ আসনে। উল্লেখযোগ্য ভাবে, সেই আসন থেকে সরিয়ে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে প্রাক্তন ফুটবলার বিদেশকে। নোয়াপাড়ায় প্রার্থী করা হয়েছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে। যিনি দিনভর সংগঠন নিয়েই থাকেন। বারাসতে চিরঞ্জিতের আসনে পাঠানো হয়েছে সব্যসাচী দত্তকে। সব্যসাচীও ‘রাজনীতিক’। তবে তাঁকে বারাসতে পাঠানোর নেপথ্যে ভিন্ন সমীকরণ রয়েছে। সব্যসাচী বিধাননগরের মেয়র ছিলেন। এখন তিনি পুরনিগমের চেয়ারম্যান। তাঁর সঙ্গে বিধাননগরের বিধায়ক তথা মন্ত্রী সুজিত বসুর সম্পর্ক ‘মধুর’। সব্যসাচী এর মধ্যে বিজেপি থেকে তৃণমূলে ফিরেছেন। ফলে সব্যসাচীকে বারাসতে প্রার্থী করে বিধাননগরে একদিকে যেমন সুজিতের জন্য নিরাপদ মাঠ তৈরি করে দেওয়া হল (গত লোকসভা ভোটের নিরিখে সুজিত বিধাননগরে ১১ হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিলেন), আবার অন্য দিকে সব্যসাচীকে পুনর্বাসনও দেওয়া হল।

বীরভূমের জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখকে হাসন থেকে প্রার্থী করা হয়েছে। বীরভূমের প্রার্থিতালিকায় বিরাট বদল হয়নি। তবে কাজলের অন্তর্ভুক্তি এবং সিউড়ির বিদায়ী বিধায়ক বিকাশ রায়চৌধুরীকে টিকিট না-দেওয়া ‘তাৎপর্যপূর্ণ’। জেলার রাজনীতিতে এক দিকে কাজল যেমন অনুব্রত মণ্ডলের বিরোধী বলে পরিচিত, তেমনই বিকাশের পরিচয়, তিনি ‘কেষ্টদার লোক’। বীরভূমের রাজনৈতিক সমীকরণে কাজলের পাল্লা ভারী হল বলেই মনে করা হচ্ছে।

রাজনীতিকদের মধ্যে আরও কয়েক জন উল্লেখযোগ্য ভাবে টিকিট পেয়েছেন। ২০১৬ সালে বাঁকুড়ার তালড্যাংরা থেকে জিতেছিলেন সমীর (বুয়া) চক্রবর্তী। তিনি ঘটনাচক্রে বিধাননগরের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তীর স্বামী। পুরোদস্তুর রাজনীতিক। সুবক্তা বলে পরিচিত। কিন্তু খানিকটা ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে সমীর ২০২১ সালে ভোটে দাঁড়াতে চাননি। এমন একটি আসন চেয়েছিলেন, যাতে কলকাতা থেকে এক দিনে যাতায়াত করা যায়। গত ভোটে তাঁর জন্য তেমন আসন খুঁজে না-পাওয়া গেল‌েও এ বার তাঁকে হুগলির পাণ্ডুয়ায় প্রার্থী করা হয়েছে। সল্টলেক থেকে পান্ডুয়ার দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটার। কলকাতার তৃণমূল কাউন্সিলর তথা বাম আমলের পূর্তমন্ত্রী প্রয়াত ক্ষিতি গোস্বামীর জ্যেষ্ঠ কন্যা বসুন্ধরা গোস্বামীকে পূর্বস্থলী উত্তরে প্রার্থী করা হয়েছে। তিনিও পুরোদস্তুর রাজনীতিক। কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলরও বটে।

২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে শতাব্দী ও অধুনাপ্রয়াত তাপস পালকে প্রার্থী করে তৃণমূলে ‘তারকা সংস্কৃতি’ শুরু করেছিলেন স্বয়ং মমতা। ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘিতে তদানীন্তন মন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দেবশ্রী রায়কে প্রার্থী করে চমক দিয়েছিলেন তৃণমূলনেত্রী। ‘পরিবর্তনের হাওয়ায়’ কান্তিকে হারিয়েও দিয়েছিলেন দেবশ্রী। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দেব, সন্ধ্যা রায়, মুনমুন সেনকে প্রার্থী করেছিলেন মমতা। তিন জনেই জিতেছিলেন। গায়ক ইন্দ্রনীল সেন হেরে গিয়েছিলেন বহরমপুরে অধীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে। পরে ২০১৬ সালে তাঁকে চন্দননগর বিধানসভায় প্রার্থী করা হয়। জিতে পর পর দু’বার তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। এ বারও তিনি সেখানেই প্রার্থী। ২০১৬ সালেই প্রথম বার সোহম তৃণমূল প্রার্থী হিসাবে লড়েছিলেন বাঁকুড়া থেকে। কিন্তু তাঁকে সে বার হারতে হয়েছিল। আবার প্রাক্তন ক্রিকেটার লক্ষ্মীরতন শুক্ল জিতে মন্ত্রী হয়েছিলেন সে বারই। প্রাক্তন ফুটবলার রহিম নবি প্রার্থী হয়েছিলেন পাণ্ডুয়ায়। কিন্তু তিনি হেরে যান। ২০১৯ সালের লোকসভায় তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায় ‘চমক’ ছিলেন বসিরহাটে নুসরত এবং যাদবপুরে মিমি। ২০২১ সালের বিধানসভায় জুন, কৌশানী মুখোপাধ্যায়, লাভলি, কাঞ্চন, অদিতিদের প্রার্থী করেছিল তৃণমূল।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের পর থেকেই তৃণমূলের সংগঠনের বিষয়টি মূলত দেখেন অভিষেক। সাংগঠনিক স্তরে তিনি নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার বিষয়ে আগ্রহী। কখনও তা পেরেছেন, কখনও তাঁকে থমকে যেতে হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে থেকেই অভিষেক ‘নতুন তৃণমূল’-এর কথা বলছেন। দেড় দশকের বেশি সময় পরে ‘তারকা চমক’ ছাড়া প্রার্থিতালিকা এবং রাজনীতির নতুন মুখে জোর দেওয়াকে সার্বিক ভাবে ‘নতুন’ তৃণমূলের পথে পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন ‌অনেকে।

Advertisement
আরও পড়ুন