TMC Candidate List 2026

তালিকায় ‘তারকা’ মাত্র ৪ জন! তৃণমূলের হয়ে ভোটের ময়দানে চিকিৎসক-ধর্মগুরু, ‘পৃথিবীর কনিষ্ঠতম হেডমাস্টার’ও প্রার্থী

তৃণমূলের প্রার্থীদের মধ্যে পেশাগত বিন্যাস করলে দেখা যাচ্ছে ১১ জন আইনজীবী, ১০ জন চিকিৎসক, ৬৪ জন ব্যবসায়ী রয়েছেন। প্রার্থীদের মধ্যে ২৮ জন যুক্ত শিক্ষাজগতের সঙ্গে। রয়েছেন এক ক্রিকেটার এবং দুই সঙ্গীতশিল্পী।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৮ মার্চ ২০২৬ ১৬:৪৩
People from various professions have got place in TMC candidate list

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থিতালিকা হাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার কালীঘাটের বাসভবনে। ছবি: সংগৃহীত।

আসন্ন বিধানসভা ভোটে শাসক তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায় ‘চমক’ কী? ‘চমক’ এই যে, তাতে কোনও ‘চমক’ নেই। আবার ‘চমক’ আছেও বটে।

Advertisement

মঙ্গলবার দলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যৌথ ভাবে প্রার্থিতালিকা ঘোষণা করেছিলেন। গত ২৪ ঘণ্টা ধরেই সেই তালিকা নিয়ে দলের ভিতরে-বাইরে নানা কাটাছেঁড়া, বিচার-বিশ্লেষণ চলেছে। ২৪ ঘণ্টা পরে মোটামুটি সকলেই একমত যে, তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায় আপাতদৃষ্টিতে কোনও ‘চমক’ নেই বলে মনে হচ্ছে বটে। কিন্তু ‘চমক’ রয়েছে। তবে সে চমক ‘অন্যরকম’।

সে ‘চমক’ হল সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের লোকজনকে তুলে এনে ভোটে দাঁড় করানো। যাকে ‘ভবিষ্যতের রাজনীতিক’ তৈরির প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। লক্ষণীয়, মমতা-অভিষেকের ঘোষিত প্রার্থিতালিকায় ১০৩টি নতুন মুখ ঠাঁই পেয়েছে। তৃণমূলের ইতিহাসে যা বেনজির (ঘটনাচক্রে, ২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটে বামফ্রন্ট তাদের প্রার্থিতালিকায় মোট ৯৪টি নতুন মুখ এনেছিল। সে বার বামফ্রন্টের ফলাফল অতীতের সমস্ত সাফল্যকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। মোট ২৩৫টি আসন পেয়েছিল বামেরা)! পাশাপাশিই, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সকলেই একবাক্যে প্রার্থিতালিকার যে বিষয়টির কথা উল্লেখ করছেন, তা হল তালিকায় টলিউডের প্রতিনিধি মাত্রই চার জন। যাঁদের ‘তারকা’ বলে চিহ্নিত করা যায়। তৃণমূলের ইতিহাস বলে, ভোটে তাদের ‘তারকা’ দাঁড় করানোর প্রবণতা দীর্ঘ দিনের। যে নামগুলিকে এত দিন ‘চমক’ বলে অভিহিত করা হত। এই প্রথম তার ব্যতিক্রম ঘটল। বস্তুত, নতুন ‘তারকা’ দাঁড় করানো তো দূরস্থান, বরং গত বারের দুই জয়ী ‘তারকা’ এ বার টিকিট পাননি। অর্থাৎ, সে অর্থে ‘চমক’ নেই। কিন্তু ব্যাপক অর্থে সেটিই ‘চমক’!

বস্তুত, গত লোকসভা ভোটের প্রার্থিতালিকায় ‘ভিন্নধারা’ তৈরির প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। ২০২৪ সালের সেই প্রবণতাই ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে আরও গতি পেয়েছে। দু’বছর আগের লোকসভা ভোটে সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে প্রার্থী করা হয়েছিল। সেই তালিকায় ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক থেকে চিকিৎসক, হতদরিদ্র পরিবারের ছাপোষা সদস্যা থেকে দিনরাত রাজনীতি করা সংগঠক। মঙ্গলবার তৃণমূল যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানেও দেখা যাচ্ছে লোকসভার পথই আরও বিশদে অনুসৃত হয়েছে। লোকসভায় তবু রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ‘তারকা’ টিকিট পেয়েছিলেন। বিধানসভায় তা-ও রাখেনি তৃণমূল। ২৯১ জনের (পাহাড়ের তিনটি আসন তৃণমূল ছেড়ে দিয়েছে অনীত থাপাদের জন্য) মধ্যে তথাকথিত ‘তারকা’ মাত্র চার জন! সেই চার জনের মধ্যে তিন জন গত বিধানসভা ভোটে জিতেছিলেন। তাঁরা হলেন পরিচালক রাজ চক্রবর্তী, অভিনেত্রী লাভলি মৈত্র এবং অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী। রাজ, লাভলি নিজেদের পুরনো কেন্দ্রেই টিকিট পেয়েছেন। কিন্তু সোহমকে পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর থেকে নদিয়ার করিমপুরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। চতুর্থ ‘তারকা’ হলেন সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি বরাহনগরে জিতেছিলেন উপনির্বাচনে।

তৃণমূলের প্রার্থীদের মধ্যে পেশাগত বিন্যাস করলে দেখা যাচ্ছে ১১ জন আইনজীবী, ১০ জন চিকিৎসক, ৬৪ জন ব্যবসায়ী এবং ২৮ জন যুক্ত শিক্ষাজগতের সঙ্গে। গত পাঁচ বছরে তৃণমূলকে সরকারকে যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়েছে, তা হল শিক্ষা। নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে জেলে যেতে হয়েছিল। প্রত্যাশিত ভাবেই পার্থ এ বার টিকিট পাননি। তবে প্রার্থিতালিকায় ১০ শতাংশে শিক্ষাক্ষেত্রের ব্যক্তিদের বেছে নেওয়া হয়েছে। আরজি কর-কাণ্ডের পরে রাজ্যের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য প্রশাসন নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল মমতার সরকারকে। টানা তিন মাস অভূতপূর্ব নাগরিক আন্দোলনের সাক্ষী ছিল পশ্চিমবাংলা। সেই পর্বে চিকিৎসকদের সঙ্গে শাসকদলের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, প্রার্থিতালিকায় ১০ জন চিকিৎসক রয়েছেন। পাশাপাশিই, আরজি করের ঘটনার সময় যাঁদের ভূমিকা ‘প্রশ্নাতীত’ ছিল না, সেই দুই চিকিৎসকের মধ্যে একজন, সুদীপ্ত রায়কে টিকিট দেওয়া হয়নি। অন্যজন, নির্মল মাজিকে পাঠানো হয়েছে তুলনামূলক ‘কঠিন’ আসনে।

‘পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ হেডমাস্টার’ বলে পরিচিত বেলডাঙার শিক্ষক বাবর আলিকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। যিনি তাঁর কাজের জন্য একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। বাবরের যখন ১০ বছর বয়স, তখন সে দেখত, নিজে স্কুলে গেলেও তার বয়সি অনেকে স্কুলে যেতে পারে না। সেই থেকে বাবর সমবয়সি বা তার চেয়ে বয়সে ছোটদের নিজের বাড়ির উঠোনে ডেকে পড়ানো শুরু করেছিল। বাড়ির উঠোনের সেই পড়া-পড়া খেলার ‘আনন্দ শিক্ষা নিকেতন’ এখন আস্ত একটি স্কুলে পরিণত হয়েছে। এখন বাবরের বয়স ৩২। তাঁকে মুর্শিদাবাদের জলঙ্গিতে প্রার্থী করেছে তৃণমূল।

গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরেই তৃণমূলের জনসমর্থনে অন্যতম পুঁজি সংখ্যালঘু ভোট। কিন্তু তাতে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন ধরনের বদলও ঘটেছে। গত বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে ফুরফুরা শরিফের দুই পিরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি এবং নওশাদ সিদ্দিকির পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল নতুন দল আইএসএফ। নওশাদ ভাঙড় থেকে জিতে বিধায়কও হয়েছিলেন। এ বার সমীকরণে আরও কিছু বদল ঘটেছে। তৃণমূল ছেড়ে মুর্শিদাবাদের হুমায়ুন কবীর নতুন দল তৈরি করে ভোটে লড়ছেন। সেই আবহে ফুরফুরারই আর এক পিরজাদা কাশেম সিদ্দিকিকে উত্তর ২৪ পরগনার আমডাঙায় প্রার্থী করেছে তৃণমূল। ঘটনাচক্রে, গত বছর রমজান মাসের সময় থেকেই কাশেম তৃণমূলের কাছাকাছি এসেছিলেন। বেশ কিছু ঘটনায় এ-ও স্পষ্ট হচ্ছিল যে, ফুরফুরা থেকে ‘নতুন মুখ’ তুলে আনার চেষ্টা করছেন মমতা। এ বছর রমজান মাসে সেটাই স্পষ্ট হয়ে গেল।

লোকসভা ভোটে আরামবাগ আসনে মিতালী বাগকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। নিম্নবিত্ত পরিবারের আইসিডিএস কর্মী মিতালী জিতে সংসদে গিয়েছেন। প্রায় একই ধাঁচে আরামবাগ বিধানসভায় তৃণমূল প্রার্থী করেছে মিতা বাগকে। যিনি ব্লকের মহিলা তৃণমূলের সভানেত্রী। একই সঙ্গে পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ। কিন্তু দলীয় পদ বা পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ হওয়ার পরেও তাঁর জীবনযাপনে কোনও বদল ঘটেনি। মিতার স্বামী এখনও রিকশা চালিয়ে উপার্জন করেন। মিতাকে প্রার্থী করে দলের একাংশকে ‘বার্তা’ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়াও তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায় রয়েছেন পাঁচ জন গৃহবধূ।

ক্রীড়াক্ষেত্র থেকে এ বার তৃণমূল নতুন প্রার্থী করেছে প্রাক্তন ক্রিকেটার শিবশঙ্কর পাল এবং প্রাক্তন অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মণকে। কিন্তু সেই দুই মনোয়নের সঙ্গে যতটা না খেলার যোগ, তার চেয়ে অনেক বেশি যোগ স্থানীয় সমীকরণের। দুই সঙ্গীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেন এবং অদিতি মুন্সি এ বারেও টিকিট পেয়েছেন। টিকিট পেয়েছেন এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টও।

Advertisement
আরও পড়ুন