বিরবাহা হাঁসদা। —ফাইল চিত্র।
অনুন্নয়ন, মাওবাদী-পর্ব এখন অতীত। শান্তি আর উন্নয়নের পালের হাওয়াতেই ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে জঙ্গলমহলের জেলা ঝাড়গ্রামের চার বিধানসভা কেন্দ্র— ঝাড়গ্রাম, বিনপুর, নয়াগ্রাম এবং গোপীবল্লভপুরে জেতে তৃণমূল। গত লোকসভা ভোটেও সব ক’টিতেই এগিয়ে ছিল ঘাসফুল। তবে, এ বার শাসক শিবিরের চিন্তা বাড়িয়েছে দলীয় কোন্দল আর নানা বিষয়ে জনতার অসন্তোষের আঁচ। সেখানে এক দিকে যেমন শহরে নাগরিক পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে, অন্য দিকে তেমনই আছে জঙ্গল লাগোয়া জনপদে হাতির হানার না-মেটা সমস্যা। প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার আশঙ্কা আঁচ করে এ বার ঠাঁইনাড়া করে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে রাজ্যের বিদায়ী বনমন্ত্রী বিরবাহা হাঁসদাকে।
ঝাড়গ্রাম শহরের বেনাগেড়িয়ার বাসিন্দা ছায়া মাহাতোর ক্ষোভ, “শহরের রাস্তাঘাট আর নিকাশি দিন-দিন খারাপ হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে যায়।” ঝাড়গ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রেরই বিস্তীর্ণ এলাকায় রয়েছে হাতির উপদ্রব। হাতির হানায় ক্ষতিগ্রস্তেরা যে ক্ষতিপূরণ পান, তা যথেষ্ট নয় বলেই দাবি। পুকুরিয়া গ্রামের বিমলা মাহাতোর কথায়, “যখন-তখন এলাকায় হাতি ঢুকছে। ফসল নষ্ট করছে, মানুষ মারছে। বন দফতর বা প্রশাসনের তরফে স্থায়ী সমাধান চোখে পড়ল না।”
ঝাড়গ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকেই গত বার জিতেছিলেন বিরবাহা। কিন্তু গত লোকসভা ভোটে শুধু ঝাড়গ্রাম পুরসভার ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যেই ১১টিতে এগিয়ে ছিল বিজেপি। শহুরে মধ্যবিত্তের ক্ষোভ সামলাতে এবং তাঁকে ঘিরে দলের গোষ্ঠী-দ্বন্দ্বে দাঁড়ি টানতেই বিরবাহাকে বিনপুরে পাঠানো হয়েছে। ঝাড়গ্রামে তৃণমূলের নতুন প্রার্থী সাধু রামচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন আইন আধিকারিক মঙ্গল সরেন। বিপরীতে বিজেপির প্রার্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ঘনিষ্ঠ লক্ষ্মীকান্ত সাউ। ২০১৯-এ লোকসভা ভোটের মুখে আসানসোল স্টেশনে নগদ এক কোটি টাকা-সহ রেল পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন লক্ষ্মীকান্ত। তৃণমূল সে কথা তুলছে প্রচারে। বিজেপির দাবি, ওই টাকা ছিল সংগঠনের। পরে আইনি প্রক্রিয়ায় তা ফেরতও মিলেছে। আর লক্ষ্মীকান্ত বলছেন, ‘‘শহরের বেহাল নিকাশি, রাস্তাঘাট আর নাগরিক পরিষেবার অভাব থেকে মানুষের নজর ঘোরাতে তৃণমূল পুরনো ঘটনাকে নতুন করে সামনে আনছে।’’
নতুন আসনে বিদায়ী মন্ত্রীর পরিচিতির ভরসা প্রয়াত বাবা। — নিজস্ব চিত্র।
যে লালগড়ে এক সময়ে রাজনীতির লড়াইয়ে অহরহ রক্ত ঝরত, সেখানে এখন আলোচনার কেন্দ্রে আলুচাষিদের হাহাকার। ব্যাপক ফলনেও হিমঘরে জায়গা না পাওয়ায় ক্ষতি করেই আলু বিক্রিতে বাধ্য হয়েছেন চাষিরা। নেতাই গ্রামের আলুচাষি কবীন্দ্র পাল বলছেন, “জলের দরে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে।’’ এলাকায় কয়েক হাজার চাষির মধ্যে হিমঘরে আলু রাখার সরকারি ‘টোকেন’ পেয়েছেন হাতেগোনা কয়েক জন। তাতে ক্ষোভ বেড়েছে। রয়েছে হাতির উৎপাত। লালগড়, মানিকপাড়া বা সাপধরার গ্রামগুলিতে প্রতি রাতে দাঁতালের আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকেন বাসিন্দারা। তাঁদের প্রশ্ন, ‘‘এই ভয়ে বাঁচার ছবিটা কি পাল্টাবে না?’’
বিরবাহা এ বার যেখানে প্রার্থী হয়েছেন, সেই বিনপুর বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যেই পড়ে নিসর্গে ঘেরা বেলপাহাড়ি। সেখানে পর্যটনের প্রসার হয়েছে। হয়েছে অনেক হোম-স্টে। সেখানে স্থানীয়েরা কাজ পেয়েছেন। তবু তার সুফলের ভাগ এলাকাবাসীর তুলনায় বহিরাগত বিনিয়োগকারীদের ঘরেই বেশি ঢুকছে বলে ক্ষোভও রয়েছে। তাই এলাকার যুবকেরা অনেকেই কাজে যাচ্ছেন ভিন্ রাজ্যে। বেলপাহাড়ির বাঁকশোল গ্রামের কার্তিক হাঁসদার কথায়, “এলাকায় স্থায়ী কাজের সুযোগ নেই। ছেলেমেয়েরা বাধ্য হয়ে বাইরে যাচ্ছে।”
বিজেপি প্রার্থী, চিকিৎসক প্রণত টুডুর প্রচারে থাকছে পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যা। সিপিএম প্রার্থী রবীন্দ্রনাথ সর্দারও মূলবাসীদের বঞ্চনাকেই অস্ত্র করছেন। বিরবাহার ব্যানার-পোস্টারে থাকছে তাঁর বাবা, প্রয়াত ঝাড়খণ্ডী নেতা নরেন হাঁসদার ছবি। বিদায়ী মন্ত্রী বলছেন, “এই মাটির সঙ্গে আমাদের পরিবারের গভীর সম্পর্ক। বাবার আদর্শ নিয়েই মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। জঙ্গলমহলে যে বিপুল উন্নয়ন হয়েছে, তা মানুষের জীবনে প্রতিফলিত।”
জেলার যে কেন্দ্রে কুর্মি ভোট বড় ‘নির্ণায়ক’ হতে পারে, সেই গোপীবল্লভপুরে লড়াই মূলত তৃণমূলের অজিত মাহাতো ও কুর্মি নেতা থেকে বর্তমানে বিজেপি প্রার্থী রাজেশ মাহাতোর। কুর্মিদের জনজাতি তালিকাভুক্তির দাবিই এখানে ঘুরছে। কুড়মালিকে দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া কিংবা কুর্মি উন্নয়ন পর্ষদের মতো বিষয়গুলি তৃণমূল প্রচারে আনলেও কুর্মিদের বড় অংশের ক্ষোভ, এখনও তাদের জাতিসত্তার দাবি পূরণে সাংস্কৃতিক গবেষণা কেন্দ্রের রিপোর্ট রাজ্যের তরফে কেন্দ্রে পাঠানোয় গড়িমসি রয়েছে। রাজেশও প্রচারে তা-ই বলছেন। আর কুর্মিরা? ঘৃতখাম গ্রামের নকুল মাহাতোর কথায়, “কুর্মিদের দাবি সে ভাবে পূরণ হয়নি। অনেক অভিমান রয়েছে।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কুড়মালিকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে নকুলরা বলছেন, “না আঁচালে বিশ্বাস নেই।”
নয়াগ্রামে লড়াই দুই শিক্ষকের। তৃণমূলের দুলাল মুর্মু এবং বিজেপির অমিয় কিস্কু। জেলা তৃণমূলের সভাপতি দুলাল রাজনীতিতে দড় হলেও, তাঁর অস্বস্তি একদা ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে দূরত্ব। বিশেষ করে, নয়াগ্রামের দাপুটে নেতা উজ্জ্বল দত্তের সঙ্গে তাঁর পুরনো বিবাদ ‘কাঁটা’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এলাকায় সুবর্ণরেখার বালি খাদান নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ আর কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযানকে বিজেপি প্রচারে হাতিয়ার করেছে। আর সুবর্ণরেখার ভাঙনে পতিনা, বড়খাঁকড়ি বা মলমের মতো পঞ্চায়েতের বহু বিঘা চাষজমি তলিয়ে যাওয়ায় প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগের কথা বলছেন সিপিএম প্রার্থী, প্রাক্তন সাংসদ পুলিনবিহারী বাস্কে। দুলালের অবশ্য দাবি, ‘‘জেলা জুড়ে উন্নয়নের ভিত্তিতে মানুষ পাশে থাকবেন।’’
ঝাড়গ্রামে সিপিএমের অর্জুন মাহাতো, গোপীবল্লভপুরের সিপিআই প্রার্থী বিকাশ ষড়ঙ্গীরাও প্রচারে ব্যস্ত। কংগ্রেস চারটি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। বর্ষীয়ান প্রদেশ কংগ্রেস নেতা সুব্রত ভট্টাচার্যের মতে, ‘‘মানুষ তৃণমূল ও বিজেপির বিকল্প খুঁজছে। সেই শূন্যস্থান পূরণে আমরা ময়দানে আছি।’’