BJP Brigade Rally

‘টেগোর’ থেকে ‘ঠাকুর’ হলেন রবীন্দ্রনাথ! মঞ্চ থেকে মোদীর ভাষণে পদ্মের ব্রিগেড দেখল হিন্দুত্ব ও বাঙালিয়ানার মিশেল

‘জয় শ্রীরাম’-এর পাশাপাশি বক্তাদের মুখে শোনা গেল ‘জয় মা কালী’, ‘জয় মা দুর্গা’। বক্তৃতায় মোদী সরাসরি অভিযোগ করলেন, তৃণমূলের জমানায় পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার কারণেই বাঙালি হিন্দুরা বিপন্ন!

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২৬ ১৯:৫৯
The topic of Bengali Hindus came up in the speeches of the speakers at the BJP brigade rally

জনসভার মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সহ অন্যান্য বিজেপি নেতারা। শনিবার ব্রিগেডে। ছবি: পিটিআই।

হিন্দুত্ব তাদের ধমনীতে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের আগে শনিবার বিজেপির ব্রিগেড সমাবেশের মঞ্চের প্রেক্ষাপট থেকে নেতাদের বক্তৃতায় হিন্দুত্বের সঙ্গে সমপরিমাণে মিশে রইল বাঙালিয়ানাও। বাঙালি হিন্দু এবং হিন্দু বাঙালির অক্ষেই আবর্তিত হল পদ্মশিবিরের জনসভা। যা ধরা পড়ল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতাতেও।

Advertisement

২০২১ সালের বিধানসভা ভোট এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির বিরুদ্ধে বাঙালি অস্মিতাকেই হাতিয়ার করে প্রচারের নীলনকশা সাজিয়েছিল তৃণমূল। জোড়াফুল শিবির এই ভাষ্য তৈরি করতে চেয়েছিল যে, বাঙালি উত্তরমেরুতে থাকলে বিজেপি দক্ষিণমেরুর দল। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেও সেই বাংলা এবং বাঙালির সরণিতেই হাঁটছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই নিরিখে বিজেপির ব্রিগেডে হিন্দুত্বের সঙ্গে বাঙালিয়ানার মিশেল এবং হিন্দু বাঙালি বা বাঙালি হিন্দুর কথা তুলে ধরা ‘তাৎপর্যপূর্ণ’।

এত দিন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের পদবি বলার সময়ে ‘টেগোর’ উচ্চারণ করতেন মোদী। কিন্তু রবিবার সেই মোদীই বললেন ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। মঞ্চে মোদীকে রজনীগন্ধার মালা পরিয়ে বরণ করলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। যে রজনীগন্ধা ফুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে বাঙালি অনুষঙ্গ। মোদীর হাতে শিল্পী সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের আঁকা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতিও তুলে দেন শমীক। ঘটনাচক্রে, সংসদে মোদীর ‘বঙ্কিমদা’ মন্তব্য নিয়েই সাহিত্যসম্রাটের অপমানের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছিল তৃণমূল। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী মোদীর হাতে তুলে দিলেন দুর্গাঠাকুরের মূর্তি। বিশাল মঞ্চের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিকৃতি। মঞ্চের এক পাশে বাঁকুড়ার ঐতিহ্য টেরাকোটা এবং অন্য দিকে চা বাগানের সংস্কৃতি।

The topic of Bengali Hindus came up in the speeches of the speakers at the BJP brigade rally

শিল্পী সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের আঁকা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি নরেন্দ্র মোদীর (ডান দিকে) হাতে তুলে দিচ্ছেন শমীক ভট্টাচার্য (বাঁ দিকে)। ছবি: পিটিআই।

‘জয় শ্রীরাম’-এর পাশাপাশি ব্রিগেডের বক্তাদের মুখে শোনা গেল ‘জয় মা কালী’, ‘জয় মা দুর্গা’। বক্তৃতায় মোদী সরাসরি অভিযোগ করলেন, তৃণমূলের জমানায় পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার কারণেই বাঙালি হিন্দুরা বিপন্ন! তাঁর কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস দ্রুত বদলে দেওয়া হচ্ছে। সেই কারণেই বাঙালি হিন্দুর সংখ্যা কমছে।’’ অর্থাৎ শুধু হিন্দু নয়, বাঙালি হিন্দু। এখানেই শেষ নয়। এর সঙ্গেই মোদী জুড়ে দিলেন স্বাধীনতার সময়ে দেশভাগ এবং তার পরবর্তী সময়ে পশ্চিমব‌াংলার পরিস্থিতির কথা। মোদী বললেন, ‘‘স্বাধীনতার পরে বিভাজন, হিংসার আগুন, অনুপ্রবেশ দেখেছে পশ্চিমবাংলার মানুষ। তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। আর যখন হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তখন তৃণমূল তার বিরোধিতা করছে।’’ অনেকের বক্তব্য, এই কথার মধ্য দিয়ে মোদী আসলে উদ্বাস্তু অধ্যুষিত এলাকার মানুষ এবং সমাজের মতুয়া অংশকে ছুঁতে চেয়েছেন। যেখানে জুড়ে রয়েছে হিন্দু-বাঙালিদের বিষয়।

শুধু মোদী কেন? অগ্নিমিত্রা পাল থেকে শুভেন্দু— প্রায় সকলের কথাতেই বারংবার ধরা পড়েছে হিন্দুত্বের সঙ্গে বাঙালিয়ানার মিশেল। মমতার সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যের পাল্টা হিসাবে অগ্নিমিত্রা ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী আপনি কি ১৯৪৬ সালের ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে ফিরিয়ে আনতে চান? তা হলে চলুন আমরা সবাই গোপাল পাঁঠা হই!’’ এমনকি, বছর দু’য়েক আগে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়া তাপস রায়ের বক্তৃতাতেও ছিল হিন্দু বাঙালিদের কথা।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ‘ধর্মীয় মেরুকরণ’ চলছে। প্রাথমিক ভাবে তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে বামেদের যে ভোট বিজেপিতে গিয়েছিল, ক্রমে তাকে বিজেপি হিন্দু ভোটে পরিণত করতে পেরেছে বলে অভিমত অনেকের। কিন্তু তার পর থেকে যে দু’টি বড় নির্বাচন হয়েছে, সেখানে তৃণমূল বাঙালি গরিমাকেই তুলে ধরেছিল। সে দিক থেকে বিজেপি ছিল তাদের চিরাচরিত হিন্দুত্বের লাইনেই। কিন্তু ২০২৬ সালের আগে সেই অভিমুখে মোচড় ঘটে গেল ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে। সভার আগে-পরে সেই বাঙালিয়ানার রেশ ধরেই দূর দূর থেকে আসা কর্মী-সমর্থকেরা পেটপুজো সারলেন ডিম-ভাত অথবা মুরগির ঝোল-ভাত দিয়ে। তথাকথিত ‘নিরামিষ’ ভোজনের উত্তর ভারতীয় হিন্দুত্ব সেখানেও ঠাঁই পায়নি।

শনিবার ব্রিগেডে বিজেপির সভায় আরও একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো ছিল। তা হল, গ্রামের বাঙালির সমাগম। গত লোকসভা ভোটে বিজেপি-কে পিছনে ফেলে তৃণমূল আসনসংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, পদ্মশিবির শহরাঞ্চলে এগিয়ে ছিল। যদিও গ্রামাঞ্চলের সমর্থন দিয়ে তা ম্লান করে দিয়েছিল রাজ্যের শাসকদল। কিন্তু শনিবার বিজেপির সংগঠিত ব্রিগেডে সেই গ্রামাঞ্চল থেকে আগত মুখের ভিড় ছিল নজরে পড়ার মতো।

তবে গ্রামের জমায়েত ব্রিগেডে নজর কাড়লেও ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন হবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। অনেক সময়েই ব্রিগেডের ভিড় দিয়ে ভোট মাপা যায় না। সিপিএমের আমলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে ব্রিগেড সমাবেশে যা ভিড় হয়েছিল, সেই ভিড় ভোটবাক্সে গেলে রাজ্যে আরও আগে ক্ষমতার পালাবদল হয়ে যেতে পারত। ব্রিগেডে ভিড় করেছিল সিপিএমও। কিন্তু তার পরেও ভোটে তাদের খাতা খোলেনি। তবে শনিবারের ব্রিগেডে বিজেপি এটা বোঝাতে পেরেছে যে, তারা কট্টর হিন্দুত্বের লাইন ছেড়ে নরম বাঙালি হিন্দুয়ানির লাইন নিচ্ছে। তাতে যদি বাঙালি ভোটারদের মন পাওয়া যায়।

Advertisement
আরও পড়ুন