ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর নিয়ে এখনও পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট যা যা নির্দেশ দিয়েছে, তাকে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল নিজেদের ‘জয়’ হিসাবেই তুলে ধরছে। গোড়া থেকে তৃণমূলের তোলা দাবি মেলালে দেখা যাবে, অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলিতে মান্যতা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার শীর্ষ আদালতে এসআইআর মামলার শুনানির পরে তৃণমূল মনে করছে, আদালতে বারো আনা লড়াই সাঙ্গ হয়ে গিয়েছে। এ বার ভোটের পালা। তবে আদালতের সেই লড়াইকে ষোল আনা সম্পন্ন করতেও প্রস্তুতি রাখছে তৃণমূল।
রাজ্যের ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রয়েছে। যা খতিয়ে দেখছেন সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত বিচারবিভাগের আধিকারিকেরা। চূড়ান্ত তালিকার আংশিক প্রকাশের পরে ধাপে ধাপে আরও তালিকা প্রকাশের কথা। তবে এই ৬০ লক্ষের মধ্যে থেকে যাঁরা বাদ পড়বেন, তাঁদের আবেদন জানানোর জন্য বিকল্প পথও খুলে দিয়েছে আদালত। যাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়নি। আমাদের লড়াইয়ের কারণেই দরজাটা এখনও খোলা রয়েছে।’’
কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে একটি ট্রাইবুনাল গঠন করার। আপাতত তৃণমূল তাকিয়ে রয়েছে পরের ধাপের তালিকা প্রকাশ এবং ট্রাইবুনাল গঠনের দিকে। সুপ্রিম কোর্টে মঙ্গলবার যে মামলা ছিল, তার নির্দেশনামা বুধবার প্রকাশিত হয়েছে। বিকাল পর্যন্ত কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিজের এজলাসে মামলার শুনানিতে ব্যস্ত ছিলেন। তার পরে তিনি নির্দেশনামা দেখে ট্রাইবুনাল গঠনের দিকে এগোবেন। সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দু’এক দিন লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আপাতত তৃণমূল এই দু’টি বিষয়ের উপরেই নজর রাখছে। সঙ্গে রাখছে প্রস্তুতিও।
তৃণমূলের প্রথম সারির নেতাদের অনেকের ধারণা, ‘বিবেচনাধীন’ ৬০ লক্ষের মধ্যে অন্তত ৪০ লক্ষ নাম মূল তালিকায় উঠবেই। কয়েক লক্ষ নাম ন্যায্য কারণেই বাদ যাবে। কিন্তু শাসকদলের অনুমান, এমন কয়েক লক্ষ থাকবেন, যাঁদের নাম ন্যায্য নথি থাকা সত্ত্বেও বাদ পড়বে। যে হেতু এই ট্রাইবুনালে নির্বাচন কমিশনের কোনও ভূমিকা নেই, তাই তৃণমূল মনে করছে, ন্যায্য নথি থাকা সত্ত্বেও নাম বাদ পড়লে ট্রাইবুনালে গিয়ে বিহিত মিলবে। দলের দক্ষিণবঙ্গের একটি জেলার সভাপতির কথায়, ‘‘পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের সৌজন্যে দলের হাতে বুথভিত্তিক তথ্য-পরিসংখ্যান রয়েছে। কাদের নাম বাদ যেতে পারে, বাদ পড়া কাদের কাছে বৈধ নথি রয়েছে, তা আমাদের নখদর্পণে। ফলে আমাদের কোনও সমস্যা হবে না।’’
গত সাড়ে চার মাসের এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ধাপে নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষ পর্বে তেমন কোনও বৈঠক করবেন কিনা, তা বুধবার বিকাল পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি। অভিষেকের ‘ঘনিষ্ঠ’ তৃণমূলের এক নেতার বক্তব্য, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরে দল এখন হাই কোর্টের দিকে তাকিয়ে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলেই অভিষেক পরবর্তী পদক্ষেপের ব্যাপারে দলকে বার্তা দিতে পারেন।’’
সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশকে সব চেয়ে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে মনে করছেন অনেকে। দেশের শীর্ষ আদালত বলেছে, দরকারে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত নাম তোলা যাবে। যে নির্দেশের মধ্যে ‘রুপোলি রেখা’ দেখছেন শাসকদলের অনেক প্রাজ্ঞ নেতা। এসআইআর পর্বে তৃণমূলের মধ্যে নানা হিসাবও রয়েছে। শাসকদলের অনেকের বক্তব্য, বেশ কিছু আসনে ভোটারদের সমীকরণ দেখে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। যা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের হিসাব বদলে দিতে পারে। বেশ কিছু মিশ্র জনবসতির কেন্দ্রে সংখ্যালঘুদের নাম বাদের বিষয়ও তৃণমূলের আলোচনার মধ্যে রয়েছে। তবে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত নাম তোলার নির্দেশকে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলেই মনে করছেন অনেকে।
এসআইআর প্রক্রিয়ার গোড়া থেকে তৃণমূলের বুথস্তরের সংগঠনই সব চেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল মাঠে ময়দানে। শেষ পর্বেও সেই সংগঠনকে কাজে লাগাতে চাইছে তৃণমূল। অনেকের বক্তব্য, তৃণমূলের কাছে এখন সংখ্যা যত না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ‘ধারণা’ নির্মাণ। যদি বৈধ নথি থাকা কয়েক হাজার বাদ পড়া ভোটারকেও তৃণমূল লড়াই করে ভোটার তালিকায় জায়গা করে দিতে পারে, তা হলে জনমানসে বিজেপি-বিরোধী ভাষ্য বা ধারণা নির্মাণের ক্ষেত্রেও তারা এগিয়ে থাকতে পারে বলে দলের অনেকের বক্তব্য।