Suman Mukhopadhyay on Election Memory

ভোটের দিনটা কখনওই আমাদের পরিবারের কাছে আনন্দের নয়, ছিল গুরুগম্ভীর একটা বিষয়

এক ভোট নিয়ে আসে আরও বহু ভোটের স্মৃতি। সে সব সময়, সে সময়ের রাজনীতি কেমন ছিল? পুরনো সে সব ভোটের কথা ফিরে এল তারকার কলমে।

Advertisement
সুমন মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩৪
ভোটের স্মৃতি ফিরে এল তারকার কলমে।

ভোটের স্মৃতি ফিরে এল তারকার কলমে। ছবি: সংগৃহীত।

নাটক, মঞ্চ ঘিরেই কেটেছে আমার ছোটবেলা। তাই ভোটের স্মৃতি বললেও মনে পড়ে যায় নাটক সংক্রান্ত নানা ঘটনার কথা। তখন তো প্রচুর প্রচারধর্মী রাজনৈতিক নাটক লেখা হত। এখন যদিও আমি একপেশে প্রচারমুখী নাটকের ঘোরতর বিরোধী।

Advertisement

নির্বাচনের আগে আমাদের দল ‘চেতনা’ প্রচুর প্রচারধর্মী রাজনৈতিক নাটকই করত। বামপন্থী দলের প্রচার করার জন্যই বিশেষ কিছু নাটক লেখা হত। নির্বাচনের আগেই তা শুরু হত। বামফ্রন্টকে ভোট দিন— এই বার্তাকে কেন্দ্র করে চিত্রনাট্য লেখা হত। শহরের যেখানে যেখানে রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি হত, বা যেখানে রাজনৈতিক নেতারা বক্তৃতা দিতেন, তার আগে সাংস্কৃতিক কর্মীরা গিয়ে সেখানে গান, আবৃত্তি করতেন। কেউ কেউ আবার মঞ্চে অভিনয়ও করতেন। বক্তৃতামঞ্চে তখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের একটা বড় ভূমিকা ছিল।

এগুলোকে আমরা বলতাম ‘পোস্টার প্লে’। শুধু ‘চেতনা’ নয়, অনেক নাটকের দলই রাজনৈতিক মঞ্চে নাটক উপস্থাপন করত। উৎপল দত্ত ‘পিএলটি’ থেকে করতেন। জোছন দস্তিদারের তখন ‘চার্বাক’। তাঁরা করতেন। এ রকম ‘পোস্টার প্লে’ হত। নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও মহড়া দিয়ে নাটক তৈরি করতাম। রাজনৈতিক দলগুলোই বলে দিত যে, কবে কোথায় মঞ্চস্থ হবে নাটক। ঘুরে ঘুরে আমরা ‘পোস্টার প্লে’ করতাম। তখন বহু বড় মানুষকে কাছ থেকে দেখেছি। সলিল চৌধুরীকে দেখেছি গান গাইছেন, কবিতা পড়ছেন। উৎপল দত্ত মঞ্চে বক্তৃতা দিচ্ছেন। তাঁর দল থিয়েটার করছে। এই স্মৃতিগুলো এখনও মনে রয়ে গিয়েছে আমার।

‘নির্বাচনের আগে আমাদের দল প্রচুর প্রচারধর্মী রাজনৈতিক নাটকই করত।’

‘নির্বাচনের আগে আমাদের দল প্রচুর প্রচারধর্মী রাজনৈতিক নাটকই করত।’

একটা দারুণ অভিজ্ঞতার কথা বলতে ইচ্ছা করছে। তখন ক্ষমতায় বামফ্রন্ট সরকার। কিন্তু তখনও মুখ্যমন্ত্রী পদ পাননি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তখন তিনি তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের মন্ত্রী। এমনই এক প্রচারমূলক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন তিনি। সেখানেই আমাদের নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার কথা। এ বার বুদ্ধবাবুও নানা জায়গায় বক্তৃতা দিতে দিতে আসছেন, ফলে আমাদের অনুষ্ঠানে পৌঁছোতে দেরি হচ্ছে। আমাদের নাটকের দল অপেক্ষা করছে। এ দিকে উনি না এলে কিছু শুরু হবে না। অপেক্ষা করতে করতে, একটা সময়ে বুদ্ধবাবু এলেন। তত ক্ষণে আমরা প্রায় অধীর হয়ে উঠেছি। উনিও ব্যস্ত মানুষ। একের পর এক বৈঠক সেরে আসছেন।

এখনও মনে আছে, মঞ্চে এমন স্বল্পদৈর্ঘ্যের রাজনৈতিক বক্তৃতা আগে কখনও শুনিনি। সভামঞ্চে উঠে উনি বলেছিলেন, “আমি দুঃখিত। আমার দেরি হয়ে গেল আসতে। কিন্তু, আমার বলার তেমন কিছু নেই। কারণ, বক্তৃতায় যা বলব, পরের যে নাটকটা মঞ্চস্থ হবে, সেখানেই সবটা বলা আছে। অতএব আপনারা নাটকটা দেখুন।” এ কথা বলেই মঞ্চ থেকে নেমে যান বুদ্ধবাবু। খুব অবিশ্বাস্য লেগেছিল আমার। রাজনৈতিক নেতা, তিনি এসে এক বাক্যে বক্তৃতা সেরে নাটক দেখতে বলে গেলেন! এই অভিজ্ঞতা সত্যিই ভোলার নয়। এটা সত্যিই বিশেষ দৃষ্টান্ত। এর উল্টো ঘটনাও ঘটেছে। অনেক সময় অনেক জায়গায় নাটকের সময় কমিয়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে আমাদের।

‘শিল্পী হিসাবে আমি রাজনৈতিক দলের কাছাকাছি কোনও দিনই থাকতে চাইনি।’

‘শিল্পী হিসাবে আমি রাজনৈতিক দলের কাছাকাছি কোনও দিনই থাকতে চাইনি।’

তবে আমি যখন নিজে দলের দায়িত্ব পেলাম, তখন এই একপেশে প্রচারধর্মী নাটক করা বন্ধ করে দিই। শিল্পী হিসাবে আমি রাজনৈতিক দলের কাছাকাছি কোনও দিনই থাকতে চাইনি। তবে নির্বাচন আমাদের কাছে কোনও দিনই আনন্দের ছিল না। খুব গুরুগম্ভীর বিষয় ছিল পুরো প্রক্রিয়াটাই। প্রথম যখন ভোটাধিকার পাই, তখন দেখি ছাপ্পা ভোট হচ্ছে। বুথ থেকে পাঠানো হচ্ছে লোককে, অন্য বুথে ভোট দিয়ে আসার জন্য— এ সবও দেখেছি।

ভোট চিরকালই আমাদের কাছে গুরুগম্ভীর একটা দিন ছিল। কোনও দিনই মনে হয়নি যে, এটা ছুটির বা আরামের দিন হতে পারে। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন নিয়ে যে হিংসা, হানাহানি শুরু হল— তখন আরও বেশি করে আমার পরিবারের কাছে উদ্বেগের হয়ে ওঠে ভোটের দিনগুলো।

(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)

Advertisement
আরও পড়ুন