মিঠুনের জন্মদিনে কলম ধরলেন দেবশ্রী। ছবি: সংগৃহীত।
মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে আলাপ আমার ১৩ বছর বয়সে। তখন আমি বাচ্চা মেয়ে আর মিঠুনদা ‘মৃগয়া’ করে ফেলেছেন। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন অভিনেতা। তবে স্টুডিয়োপাড়ায় যাতায়াত থাকার কারণে তত দিনে জেনে গিয়েছিলাম মিঠুন চক্রবর্তী কে? ‘নদী থেকে সাগরে’ বলে একটি ছবিতে মিঠুনের বিপরীতে আমাকে কাস্ট করা হল। সেই ছবির সেটে আলাপ। সত্যি বলতে, আমি একটু উত্তেজিত ছিলাম। কারণ মিঠুনদার মতো অমন সুপুরুষ, সুন্দর চেহারার এক নায়ক আমার বিপরীতে! বেশ উত্তেজনা ছিল। আমরা দু’জন ছাড়াও ছিলেন সন্ধ্যা রায় ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এটা কিন্তু বলা যেতেই পারে, মিঠুনদার প্রথম বাংলা ছবি কিন্তু আমার সঙ্গে। এই ছবির সেটে ফ্রক পরে যেতাম। সিনেমায় প্রেমের একটা দৃশ্যে আমাকে শাড়ি পরানো হয়। অভ্যাস তো ছিল না শাড়ি পরার, শটের মাঝেই হঠাৎ শাড়িটা গেল খুলে। তখন আমার মায়ের উদ্দেশে মিঠুনদার চিৎকার, ‘‘মাসিমা, শিগগির এসো! তোমার মেয়েকে দেখো, শাড়ি খুলে দাঁড়িয়ে আছে।’’ সেই থেকে মিঠুনদার সঙ্গে সম্পর্ক। শুধু ওঁর সঙ্গে নয়, গোটা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। এই হচ্ছে মিঠুনদা। সর্বক্ষণ দুষ্টুমি।
মিঠুনদার সঙ্গে যে ক’টা ছবি করেছিলাম সবই হিট। উনি সেটে থাকা মানেই আর কাউকে কিছু চিন্তা করতে হবে না। সবাইকে মাতিয়ে রাখেন। হুল্লোড়ে মানুষ, আবার যেমন দুষ্টু তেমনই বুদ্ধি। অসম্ভব মেধাবী অভিনেতা। ওঁর সঙ্গে আমার সারাক্ষণ ঝগড়া হত। সারা ক্ষণ যা খুশি তা-ই বলতাম। সে সব আর এখানে বললাম না। ভীষণ পিছনে লাগত, আমাকে রাগাতে ভালবাসতেন। আমি রেগে গেলেই ওঁর উপরে যে ভাবে অগ্নিবর্ষণ করতাম, সেটায় খুব মজা পেতেন।
মিঠুনদার দুষ্টুমির চোটে কিন্তু এক বার আমি মরতে বসেছিলাম। রামোজি ফিল্ম সিটিতে ‘এমএলএ ফাটাকেষ্ট’ ছবির শুটিং হচ্ছে। সেই সময়ে আমার গায়ে সাপ ছেড়ে দেন। কী সাংঘাতিক লোক! আসল সাপ নয় ওটা। কিন্তু কোথা থেকে যেন সেই ‘সাপ’ কিনে এনে আমার কাঁধে রেখে দিয়েছিলেন। আচমকা সেটা দেখেই আমার তো অবস্থা খারাপ! হৃৎস্পন্দন প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়! তার পর সারা রামোজি ফিল্ম সিটি আমার চিৎকার শুনেছে। আমিও তো কম নই! মিঠুনদাকে এমন এমন সব কথা শুনিয়েছি। কিন্তু উনি সে সব কখনও গায়ে মাখেননি। শুধু আমি না, পদ্মিনী কোল্হাপুরেও নাকি এমন করেছিলেন! তাঁরও অবস্থা এমনই হয়েছিল। রামোজি ফিল্ম সিটির ঘটনার পরে আমার দিদি কৃষ্ণাকে (রানি মুখোপাধ্যায়ের মা) মিঠুনদা রসিয়ে রসিয়ে বলেছিলেন, ‘‘তোর বোনকে যা রাগিয়েছি না!’’
‘এমএলএ ফাটাকেষ্ট’ ছবির দৃশ্য।
মিঠুনদা যখন মুম্বই থেকে আসতেন, বিমানবন্দর থেকে সোজা চলে আসতেন আমাদের বাড়ি। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করতেন। কত আড্ডা হত। মিঠুনদার তিন বোন। তাঁদের সঙ্গেও খুব ভাব ছিল আমার। আমাদের সম্পর্কটা এতটাই পারিবারিক ছিল যে, আমরা একই গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নিই। আমরা সেই অর্থে ‘গুরুভাই’। আসলে আমাদের স্নেহের সম্পর্ক। এই তো, ‘শাস্ত্রী’ ছবির সময় আমি ইলিশ মাছ, পাবদা মাছ রেঁধে নিয়ে গিয়েছিলাম ওঁর জন্য। মিঠুনদা নিজেও দারুণ রান্না করতে পারেন। যদিও মাংস রাঁধতেন বেশির ভাগ সময়। সেটা আমি খাই না, তাই চেখে দেখা হয়নি।
চার ছেলেমেয়ের সঙ্গে মিঠুন।
আমি মানুষটার উপর রাগ দেখাতে পারি। তাঁকে বকতে পারি, আমার সেই জায়গা আছে। ‘শাস্ত্রী’ ছবির সময় উনি অসুস্থ হতেই হাসপাতালে যাই। ছেলে মিমো মুম্বই থেকে আসে। যদিও ছেলের কোনও কথা কানে তোলেন না। আমি ধমক দিয়ে বলেছিলাম, এই সময়ে যেন হোটেলে না থাকেন। কথা শুনেছিলেন। মিমো বলেছিল, ‘‘আমাদের কথা তো শোনে না, আপনি বলুন।’’ যা-ই হোক, আমার কথা ফেলতে পারেননি। যদিও বাবা হিসাবে মিঠুনদা দারুণ। ওঁর ছেলেমেয়েরা ‘মিঠুন’ বলেই সম্বোধন করে। আসলে মানুষটার তো সত্যিই বয়স বাড়ে না। উনি চিরযুবক।
তবে একটা কথা খালি মনে হয়, যে কষ্ট করে মানুষটা মুম্বই ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জায়গা করেছেন সেটা মুখের কথা নয়। মুম্বই ইন্ডাস্ট্রিতে পয়লা নম্বর নায়ক, তাও আবার বাঙালি। কম বড় কথা নয়। শুধু কি মুম্বই? ওঁর পরিচিতি আন্তর্জাতিক স্তরে। একটা সময় মিঠুনদার মা একটা বছর মৌনব্রত নিয়েছিলেন ছেলের জন্য। ছেলে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া অবধি সেই ব্রত ভাঙেননি।
কিন্তু এমন একটা মানুষকেই যখন কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ব্রাত্য রাখা হয়, তখন আহত হই, প্রতিবাদ করি। এতগুলো বছর ধরে মুম্বই থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তারকা আসতেন ওই উৎসবে। কিন্তু মিঠুন চক্রবর্তীকে কেন ডাকা হত না? উনি যে দলেই থাকুন না কেন, আখেরে তো বাংলার ছেলে! উনি আমাদের রাজ্যকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এর প্রতিবাদ করায় কটূক্তি সহ্য করতে হয়েছে আমাকে। আমাদের সময় আর কোন অভিনেতা ছিলেন যিনি মুম্বই গিয়ে এমন সাফল্য পেয়েছেন? কিন্তু তাও তিনি চলচ্চিত্র উৎসবে ছিলেন ব্রাত্য। রাজ্য সরকার সম্মান দেয়নি। কিন্তু বাংলার বাইরে ‘পদ্মভূষণ’ থেকে ‘দাদাসাহেব ফালকে’— সবই পেয়েছেন। যদিও মিঠুনদাকে এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে বলতেন, ‘‘ছাড় তো! এ সব ছোটখাটো বিষয় মাথায় নিস না।’’
রাষ্ট্রপতি দৌপ্রদী মুর্মুর হাত থেকে পদ্মশ্রী গ্রহণ মিঠুনের।
উনি মানুষটাই এ রকম প্রাণশক্তিতে ভরপুর। তাই আমি চাই না, ওঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের এতটুকু বদল ঘটুক। উনি যেমন মানুষ, তেমনই থাকুন।