Music forum

বাংলার সঙ্গীতশিল্পীরা তৈরি করেছেন ‘পারফরম্যান্স অফ বেঙ্গল’, কারা আসছেন ছাতার তলায়?

সব শিল্পী যাতে যোগ্যতা অনুসারে কাজ পান, সেই দিকেই নাকি নজর দেবে এই সংগঠন। প্রাধান্য দেওয়া হবে মৌলিক বাংলা গানকে। এ জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিয়েছেন সংগঠনের সদস্যেরা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কারা যোগ্য, কারা এত দিন ডাক পাননি, কারা আসবেন এই সংগঠনের ছাতার তলায়?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ ১০:২৮
শিল্পীদের কী কী আর্জি?

শিল্পীদের কী কী আর্জি? ছবি: সংগৃহীত।

যোগ্যতা সত্ত্বেও সুযোগ পাননি মঞ্চে, ডাক আসেনি সরকারি অনুষ্ঠানে!

Advertisement

গত ১৫ বছরে এমন অভিযোগ তুলেছেন বহু সঙ্গীতশিল্পী। কেউ স্পষ্ট করে বলতে পেরেছেন, কেউ তা-ও পারেননি। এমন শিল্পীদের নিয়েই নাকি এ বার তৈরি হচ্ছে ‘পারফরম্যান্স অফ বেঙ্গল’, মুখপাত্র শিল্পী অনিন্দ্য বসু।

সব শিল্পী যাতে যোগ্যতা অনুসারে কাজ পান, সেই দিকেই নাকি নজর দেবে এই সংগঠন। প্রাধান্য দেওয়া হবে মৌলিক বাংলা গানকে। এ জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিয়েছেন সংগঠনের সদস্যেরা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কারা যোগ্য, কারা এত দিন ডাক পাননি, কারা আসবেন এই সংগঠনের ছাতার তলায়?

গত বুধবার সংগঠনের তরফে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন গায়ক শিলাজিৎ মজুমদার, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, সিধু, পটা, দেব চৌধুরী প্রমুখ। আবার অনুপস্থিতির সংখ্যাটাও বাংলা সঙ্গীত জগতের নিরিখে নেহাত কম নয়। অথচ অনিন্দ্যের দাবি, বাংলা সঙ্গীতজগতের প্রত্যেক শিল্পীর কাছেই পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল এই সংগঠন তৈরির খবর। তাঁর কথায়, “সকলকে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এসেছিলেন। আবার কেউ এসে উঠতে পারেননি। আমরা কেউ রাজনৈতিক ব্যক্তি নই। একটাই ইচ্ছা, আমরা যেন একসঙ্গে গানবাজনা করতে পারি।”

অনিন্দ্য মনে করেন, গত কয়েক বছরে অনেক যোগ্য শিল্পীই পাননি উপযুক্ত মর্যাদা। তবে নির্দিষ্ট কারও প্রতি কোনও অভিযোগ নেই তাঁর। তিনি বলেন, “সকলেই জানেন, গত কয়েক বছরে বহু মানুষ বঞ্চিত হয়েছেন। সকলেই দেখছেন, ‘উইপোকায়’ টাকা খাচ্ছে। এ বার যাতে সবাই সুযোগ পান, সেটা নিশ্চিত করাই আমাদের উদ্দেশ্য।” তাঁর দাবি, শুধু সঙ্গীতশিল্পীরা নন, একই সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র শিল্পীরাও যাতে তাঁদের উপযুক্ত সম্মান ও পরিচিতি পান, সে দিকে নজর রাখবে সংগঠন।

বুধবার সম্মেলনে ছিলেন অভিনেতা ও বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ। তাঁর উপস্থিতিতেই মুখ্যমন্ত্রীকে আর্জি জানান শিল্পীরা। অভিনেতা-বিধায়কের বক্তব্য, “এই সংগঠন কয়েকটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছে। এত দিন কাটমানি তোলা হত, সেই সংস্কৃতির বিলোপ ঘটাতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু শিল্পীকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কণ্ঠশিল্পী থেকে বাদ্যযন্ত্রশিল্পী, নির্দিষ্ট নামের মধ্যেই আবদ্ধ থেকেছে। সেই চক্র যাতে ভাঙে, যোগ্যতা অনুযায়ী যাতে সকলে সুযোগ পান, সে দিকেই লক্ষ্য রাখা হবে।” পাশাপাশি তিনি মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন, মহিলা শিল্পীদের নিরাপত্তার দিকটিও। রুদ্রনীলের কথায়, “মহিলা শিল্পীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। নতুন সরকারের কাছে সংগঠনের প্রত্যাশা, কাজ যেন সকলের মধ্যে সমান ভাবে বণ্টন হয়।”

কিন্তু কী চাইছেন শিল্পীরা?

ওই সাংবাদিক সম্মেলনে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, সকলেই যে গত দে়ড় দশকে উপেক্ষিত ছিলেন, তা অবশ্য নয়। যেমন গত কয়েক বছরে বহু সরকারি অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছে রাঘব বা সিধুকেও। তবে শিলাজিৎকে গত কয়েক বছরে দেখা যায়নি সরকারি মঞ্চে।

গত কয়েক বছরে নিয়মিত সরকারি অনুষ্ঠানে গেয়েছেন, নিজেই জানালেন রাঘব চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু তাঁর দাবি, পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পী এবং বাদ্যযন্ত্র শিল্পীদের মধ্যে কোনও বৈচিত্র্য লক্ষ করেননি। নির্দিষ্ট ১০-১২ জনকেই বার বার সরকারি মঞ্চের অনুষ্ঠানে দেখেছেন। তাই তাঁর প্রত্যাশা, আগামী দিনে যোগ্যতার বিচারে সকলকে সুযোগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি উঠে এসেছে উপযুক্ত পারিশ্রমিকের প্রসঙ্গও। তাঁর কথায়, “আমরা ডাক পেতাম। তবে দেখতাম, আমাদের সমসাময়িক অনেকেই ডাক পাচ্ছেন না। পরের প্রজন্মের নির্দিষ্ট কিছু শিল্পীই নিয়মিত আসছেন। তার বাইরে যেন আর কারও প্রবেশাধিকার নেই। আমাদেরও ন্যূনতম সাম্মানিক দেওয়া হত।”

রাঘবই জানিয়েছেন, গুণী বাদ্যযন্ত্র শিল্পীরা যোগ্য সম্মান পাননি। তাঁর নিজের গিটারের গুরুকে কোনও দিন কোনও সঙ্গীতমেলার সরকারি মঞ্চে দেখেননি বলে দাবি। অথচ, যাঁরা শাসকের সুনজরে ছিলেন তাঁরা নিয়মিত অনুষ্ঠান করতেন। রাঘব বলেন, “আমরা চাই, অডিশনের মাধ্যমে প্রতিভাধরেদের বেছে নেওয়া হোক। আর মৌলিক বাংলা গানের সঠিক প্রচার হোক।” এ প্রসঙ্গেই উঠে এসেছে এফএম চ্যানেলগুলির কথা। রাঘব চান, এফএম চ্যানেলগুলিতে বেশি করে মৌলিক বাংলা গান বাজানো হোক। এ আর্জিও জানানো হয়েছে।

প্রায় একই সুরে রূপঙ্কর বাগচী জানিয়েছেন, মহারাষ্ট্র বা দক্ষিণের রাজ্যে আঞ্চলিক ভাষার গান বাজানো বাধ্যতামূলক। বুধবারের সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত না থাকলেও ডাক পেয়েছিলেন। বাংলা গান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মৌলিক গানের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের দারুন অভাব। সে ক্ষেত্রে শিল্পীদেরই ভাবতে হয় কী ভাবে একটা রেকর্ড করবেন। ফলে বাংলা গানে বিনিয়োগের দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।” বাংলা সঙ্গীতজগতে এমন বহু শিল্পী রয়েছেন যাঁদের প্রতিভা রয়েছে, নেই আর্থিক সঙ্গতি, তাঁদের কথা ভেবেই সংগঠনের উদ্যোগ বলে তিনি মনে করেন। অনুষ্ঠানস্থল নিয়ে ভাবনাচিন্তার বিষয়েও রূপঙ্কর গুরুত্ব দিতে চান। শুধু সঙ্গীত বা বাদ্যযন্ত্রের শিল্পীরা নন, রূপঙ্কর তুলে ধরেছেন সুরকার-গীতিকারদের কথা। যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ এবং প্রাপ্য পারিশ্রমিক না পাওয়া গেলে শিল্প বা শিল্পীর পক্ষে বেঁচে থাকাই দুষ্কর, মনে করেন রূপঙ্কর।

শিলাজিৎ জানিয়েছেন, অনিন্দ্যের থেকে পেয়েছিলেন আমন্ত্রণ পেয়েই তিনি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “শুধু কণ্ঠশিল্পী বা জনপ্রিয় মুখ নয়, বাদ্যযন্ত্র শিল্পীদের কথা ভেবেই এই সংগঠন তৈরি করা হয়েছে। রুদ্রনীলের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমি মূল আর্জিগুলি জানি। তবে এই নিয়ে আরও বিশদ আলোচনা হবে। অনিন্দ্যেরই ভাবনা এটা। আরও আলোচনা হলে এই প্রয়াস সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হবে।”

নব গঠিত এই সংগঠনের বিষয়ে প্রায় কিছুই জানেন না অনুপম রায়। মূলত প্লেব্যাকে তাঁর খ্যাতি হলেও, বেশ কয়েকটি মৌলিক গান জনপ্রিয়তা দিয়েছে অনুপমকে। সংগঠনের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন প্রবীণ শিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তীও।

বিশেষত মৌলিক সঙ্গীতের উপর জোর দেওয়া হলেও, লোকসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত-সহ অন্য ঘরানার সঙ্গীতের বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদেরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। মঞ্চ-নির্ভর জীবিকা যাঁদের তাঁদের প্রত্যেকের মূল্যের কথা ভাবছে এই সংগঠন।

Advertisement
আরও পড়ুন