Kaushik Sen Interview

সরকার বদলেছে বলেই যে ম্যাজিকের মতো বাংলা সিনেমা-নাটকের উন্নতি হবে, সেটা ভাবার কারণ নেই: কৌশিক

তাঁর নাটক থেকে এ সময়ের রাজনৈতিক পরিবেশ— সব কিছু নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর মুখোমুখি অভিনেতা-নাট্যকর্মী কৌশিক সেন।

Advertisement
চন্দন মণ্ডল
শেষ আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ ০৯:০৩
‘স্বপ্নসন্ধানী’র ‘ম্যাকবেথ ২.০’ নাটকের একটি দৃশ্য।

‘স্বপ্নসন্ধানী’র ‘ম্যাকবেথ ২.০’ নাটকের একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত।

অভিনয় তাঁর পেশা। থিয়েটার তাঁর ভালবাসা। দু’দশক আগে বাম সরকারের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন। তৃণমূল আমলে সরকারের নানা পদক্ষেপের প্রতিবাদে সরব হতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। রাজ্যের সদ্য পালাবদল কোনও ‘জাদুকাঠি’ নয় বলেও মনে করেন তিনি। বরং এ বার আরও সংশয়ী তিনি। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, আমাদের প্রত্যেকের ভিতরেই এক জন ‘ম্যাকবেথ’ বাস করে, যা দলীয় রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। তিনি কৌশিক সেন। তাঁর চলতি নাটক থেকে রাজনৈতিক পরিবেশ— সব কিছু নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর মুখোমুখি অভিনেতা-নাট্যকর্মী।

Advertisement

প্রশ্ন: আপনার নতুন নাটক ‘ম্যাকবেথ ২.০’। এখন ‘ম্যাকবেথ’ বেছে নিলেন কেন?

কৌশিক সেন: আসলে ‘ম্যাকবেথ’ একটা অসুখের মতো। এটা একটা রোগ। এর আগে, ২০১২ সালে একটা ‘ম্যাকবেথ’ করেছিলাম। সেই সময়টা একটা টালমাটাল অবস্থা ছিল। একটা নতুন শাসকদল সদ্য এসেছে রাজ্যে। দেখছিলাম, কী ভাবে একটা রাজনৈতিক ‘পালাবদল’ও ঘটে যাচ্ছিল। আমরা নাটকটিতে দেখিয়েছিলাম, ম্যাকবেথ (রাজা ডানকানের অন্যতম সেনাপ্রধান ও রাজার হত্যাকারী) নিহত হওয়ার পরে মৃত রাজার পুত্র ম্যালকম যখন রাজসিংহাসনে বসেন, তখন সেই সিংহাসনের দু’পাশে এসে বসে সেই পোষা খুনিরা, যারা এতদিন ম্যাকবেথের হয়ে কাজ করত! ১৪ বছর আগের সেই ম্যাকবেথ-এ এমনই দৃশ্য আমরা রেখেছিলাম। কারণ, তখন সিপিএম গিয়ে তৃণমূল এসেছে, আর আমরা দেখছিলাম সিপিএমের আশ্রিত যত দুর্বৃত্ত, সমাজবিরোধী ছিল, তারা কী ভাবে জামা বদলাচ্ছিল। এখন যে ‘ম্যাকবেথ’টা করেছি, এটার প্রাসঙ্গিকতার ক্ষেত্র শুধু এই সময়ের পশ্চিমবঙ্গ নয়। গোটা দেশ, গোটা পৃথিবীটাই এই নাটকের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। নতুন ম্যাকবেথটা ছোট। এটা শুধুই ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথকে ভর করে। দুই চরিত্রে আমি আর আমার স্ত্রী রেশমি সেন রয়েছি। সঙ্গে তিন ডাকিনী আর ছোট দু’-তিনটে চরিত্র রেখেছি। আর কিছু শিশুকে দেখিয়েছি। আসলে আমরা দেখাতে চেয়েছি, সবটাই ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথের মাথার ভিতরে ঘটছে। কারণ, ফ্যাসিবাদ সবার আগে দখল নেয় মাথাটার। এটা সেই আক্রান্ত রোগগ্রস্ত দুই মাথার গল্প।

স্বপ্নসন্ধানী’র ‘ম্যাকবেথ ২.০’ নাটকের একটি দৃশ্য।

স্বপ্নসন্ধানী’র ‘ম্যাকবেথ ২.০’ নাটকের একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: চারশো বছরের পুরনো নাটকের আখ্যান বিষয়বস্তু হিসেবে এই সময়টায় কতখানি প্রাসঙ্গিক বলে আপনার মনে হয়?

কৌশিক: পুরোটাই প্রাসঙ্গিক। পশ্চিমবঙ্গে যে একটা বদল আসতে পারে, তার খানিকটা আন্দাজ করেই কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের অনেক আগে, গত বছর ডিসেম্বরে এ নাটকটা মঞ্চস্থ করেছি। এ বার আমরা জোর দিয়েছি ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথ— এই দুটো চরিত্রের উপরেই। আমরা এ নিয়ে পর পর দুটো শেক্সপিয়র করছি— হ্যামলেট এবং এই ম্যাকবেথ। হ্যামলেটের সমস্যা হচ্ছে— ‘টু বি অর নট টু বি’। মানে, প্রতিবাদ করব, না করব না। ম্যাকবেথের সঙ্কটটা অন্য। সে ভাবতে চায় না। যখনই ভাবতে চেয়েছে, তখনই তিন ডাকিনী, আবার কখনও স্ত্রী লেডি ম্যাকবেথ পরামর্শ দিয়েছে, ‘ভেবো না। আগে কাজ করো, পরে ভাববে’। আসলে ম্যাকবেথ বার বার এটাই বলতে চেয়েছে যে, ‘আমি পাপটা করতে চাইনি। তুমি ও তোমরা আমাকে দিয়ে পাপটা করিয়ে নিয়েছ’। এটা কি সত্যি? নাকি রাজা হওয়ার লোভটা ম্যাকবেথের মধ্যে একশো শতাংশ ছিল? এটাই মনে হয় আজকের দিনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এই যে এখন পালাবদলের পরে তৃণমূলের বদলে যাওয়া নেতারা, তৃণমূলের পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা সংস্কৃতিপ্রেমী লোকজন বলছেন, সবটাই নাকি তাঁদের দিয়ে করিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এটা কি সত্যি? সবটাই স্বরূপ বিশ্বাস, ইন্দ্রনীল সেনরা করেছে, এটা তো হতে পারে না! স্বরূপেরা তো বেড়ে ওঠে সমাজেরই পৃষ্ঠপোষকতায় এবং একটা প্রতিবাদহীনতায়।

প্রশ্ন: বাংলা নাটকে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের পরিসর কি কমছে?

কৌশিক: রাজনৈতিক বক্তব্য অনেকেরই নাটকে থাকে। কিন্তু কেউ একটা নাটক বা সিনেমা বানালেই তো হয় না! সংশ্লিষ্ট মানুষটি তার ব্যক্তিগত জীবন কী ভাবে যাপন করছে, সেটাও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। যথেষ্ট রাজনৈতিক নাটক করছি না, সেটা কিন্তু সত্যি নয়। আসলে তো করছি। কিন্তু কোথাও আমাদের যাপনের মধ্যে দিয়ে একটা সুবিধাবাদ বেরিয়ে আসছে। সেইটা কোথাও গিয়ে আমাদের কাজটাকে লঘু করে দিচ্ছে।

‘হ্যামলেট’ নাটকের একটি দৃশ্যে কৌশিক ও রেশমি সেন।

‘হ্যামলেট’ নাটকের একটি দৃশ্যে কৌশিক ও রেশমি সেন। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা নিয়ে কী বলবেন?

কৌশিক: আমি যদি ভাল মানের কাজ করতে না পারি, এবং তার দায়টা যদি চাপাই রাজনীতির উপরে, তা হলে সেটাও তো মিথ্যাচার! আগে স্বীকার করতে হবে যে, আমরা ভাল কাজ করতে পারছি না। পরিসংখ্যান দিয়ে তো বুঝতে হবে, গত ১০ বছরে ক’টা বাংলা ছবি প্রকৃতপক্ষে ব্যবসা করেছে। ‘সাকসেস পার্টি’-র ছবি দেখিয়ে তো সাকসেস বোঝানো যায় না! পারস্পরিক পিঠ চাপড়ালে কাজটা হবে না। একটা সিনেমার যে অসীম ক্ষমতা আছে, সেটা আমাদের বাংলা ইন্ডাস্ট্রি ব্যবহার করছে না। তার কারণ, শুধুই রাজনৈতিক চাপ, এটা আমি মানতে রাজি নই। এটার পিছনে আমাদের কোথাও চর্চার অভাব, সিরিয়াসনেসের অভাব, আমাদের উৎকর্ষের অভাব। এইটা যদি আমরা স্বীকার করে নিতে পারি, তবেই বাংলা ছবির উন্নতি হবে।

প্রশ্ন: নাট্যজগতের অবস্থা সেখানে কেমন?

কৌশিক: সেই তুলনায় আমি বলতে পারি, এখানে সিনেমার তুলনায় থিয়েটার অনেক ভাল জায়গায় আছে। তার কারণ, সিনেমা অনেকটা পুঁজিনির্ভর। লাভ-লোকসানের অঙ্ক কষতে হয়। উল্টো দিকে, থিয়েটারে পুঁজি অতটা প্রভাব ফেলে না। তবু বলি, ২০১৪ সাল থেকে আমাদের নাট্যদল ‘স্বপ্নসন্ধানী’র কেন্দ্রীয় অনুদান বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং আমরা রাজ্য সরকারের কাছ থেকেও কোনও দিন কোনও আর্থিক সহায়তা নিইনি। তাতে আমাদের থিয়েটার করে যেতে কিন্তু কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। ফলে সিনেমার তুলনায় আমরা থিয়েটারে বেশি করে রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে আসতে পারছি, কোনও বাধ্যবাধকতা ছাড়াই।

প্রশ্ন: বাংলায় এখন মৌলিক রাজনৈতিক নাটক লেখা কম হচ্ছে না কি?

কৌশিক: কম তো হয়েছেই। তবে পুরোটা ঠিক নয়। এটাও বলি যে, রাজনৈতিক নাটক লিখলেই তো হবে না, তার ভিতরে কোথাও সেই গুণমানটা থাকতে হবে। উৎপল দত্তের কথাই যদি ধরি, তিনি প্রচুর নাটক লিখেছেন, পরবর্তীকালে ব্রাত্য বসুও এ ধরনের অনেক নাটক লিখেছেন। সেগুলো যদি ইতিহাসগত বা তথ্যগত ভাবে বিচার করা যায়, তা হলে তার মধ্যে অনেক অসত্য খুঁজে পাওয়া যাবে। অনেক ভুল তথ্য আছে। কিন্তু উৎপল দত্ত সেই মিথ্যাগুলোকে, সেই ভুল তথ্যগুলোর সাহায্যে মানুষকে গুলিয়ে দিয়ে এমন একটা ইলিউশনের জায়গায় নিয়ে যেতে পারতেন যে, সেটা ভাবাই যায় না। পরে ব্রাত্যের নাটকেও এমন বিতর্কিত কিছু কিছু অংশ আছে যেটা সত্যি নয়। তবে ব্রাত্যের সঙ্গে আমার যতই রাজনৈতিক অমিল থাকুক, ওর রাজনৈতিক মতবাদ নিয়ে আমার যথেষ্ট খারাপ লাগা থাকুক, আমার মনে হয়েছে, এতগুলো বছর ও নিজেকে নষ্ট করল। কিন্তু তৎসত্ত্বেও আমি বলব, ব্রাত্য আমাদের সময়ের সবচাইতে শক্তিমান নাট্যকার। আর লেখার জন্যও তো একটা লোক লাগে। সমসাময়িক নাট্যকারেরা সেই রকম শক্তিশালী নাটক লিখতে পারছেন না বলেই হয়তো আমরা গ্রিক নাটক, কখনও বের্টোল্ট ব্রেশট, ক্লাউস মান করছি। কখনও শেক্সপিয়র, শেকভ বা ইবসেনে ফিরে যাচ্ছি। বাংলায় হয়তো সত্যিই সে রকম নাটক লেখা হচ্ছে না। এমনও বলতে পারি যে, আমরা নির্দেশকেরা হয়তো তেমন নাটক খোঁজার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করছি না।

ব্রাত্য আমাদের সময়ের সবচাইতে শক্তিমান নাট্যকার: কৌশিক

ব্রাত্য আমাদের সময়ের সবচাইতে শক্তিমান নাট্যকার: কৌশিক ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: রাজনৈতিক নাটক লিখলে বিতর্ক তৈরি হতে পারে, সেই ভয়ও কি একটা কারণ?

কৌশিক: হ্যাঁ হ্যাঁ! কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো অনেকেই সে কারণে এড়িয়ে গিয়েছেন। এতে কোনও সন্দেহ নেই। এই যে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে মাওবাদকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। এটার পরেই আমার মনে হচ্ছিল যে, এটা তো মহাশ্বেতা দেবীর জন্মশতবর্ষ। তাই ওঁর ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসটার একটা নাট্যরূপ দিয়েছি। এটা হয়তো আমি এ বছরের শেষে মঞ্চস্থ করব। আজ যখন ভারতের কোনও রাজ্যে আর বামপন্থীরা নেই এবং সেই সুযোগে ‘বামপন্থার কোনও মূল্য নেই, বামপন্থা আসলে জ়িরো’— এ রকম একটা প্রচার তো অনেক দিন আগে থেকেই শুরু হয়েছে। সে জন্য অবশ্য আমাদের বর্তমান সিপিএমও অনেকটা দায়ী, কোনও সন্দেহ নেই তাতে। তাই কোথাও সেই সময়টাকে ঘুরে দেখার একটা দায় আমাদের থেকে যায়।

প্রশ্ন: ‘ভয় আউট ভরসা ইন’— এমনই স্লোগান সামনে রেখে ক্ষমতায় এসেছে এই শাসক দল। তা হলে কি এ বার নির্ভয়ে রাজনৈতিক নাটক করার স্বাধীনতা পাবেন নাট্যকর্মীরা?

কৌশিক: সেটা কি কখনও হয়! এটা তো সোনার পাথরবাটির মতো কথা! যে দলটা ক্ষমতায় এল, সেটা তো নতুন কোনও দল নয়। টিভির খবরে দেখছিলাম, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর মতো কিছু নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা সরকারি জমি থেকে কোটি কোটি টাকার মাটি চুরি করেছেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে! এই খবর হয়তো সত্যি। কিন্তু এটা বলছে কারা? বলছে বিজেপি। তাদের এখন বলার অধিকার নিশ্চয় আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষকেও মাথায় রাখতে হবে, এই বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারই নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ বিক্রি করে দিচ্ছে আদানিদের কাছে। তৃণমূলের বিদায় খুবই শুভ ঘটনা, কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু যাঁরা এলেন তাঁরা আসা মানেই যে রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এ রকমটা ভাবার কোনও কারণ নেই।

প্রশ্ন: তা হলে দেশের রাজনীতি নিয়ে কৌশিক সেন আশাবাদী নন?

কৌশিক: আশাবাদী হওয়ার কোনও কারণ নেই। বরং আশাবাদী না হওয়াটাই সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক অবস্থান। মানে এটাকে নেতিবাচক ভাবনা হিসেবে চিহ্নিত করতে আমি রাজি নই। বরং যাঁরা অকারণে আশাবাদের কথা ব্যক্ত করেন, আমি তাঁদের একটু সন্দেহের চোখেই দেখি। তার কারণ, কোথাও ওই ব্যক্তি তাঁর দায়টা ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন।

প্রশ্ন: বছর কুড়ি আগে জনবিরোধী পদক্ষেপের অভিযোগে রাজ্যের বাম সরকারের বিরোধিতায় পথে নেমেছিলেন। আজও কি আপনি তেমনই প্রতিবাদী?

কৌশিক: ২০০৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তা যা করেছি, আমার ক্ষমতামতো রাস্তায় নেমেছি, সেটা বাম সরকারের বিরুদ্ধে হোক বা তৃণমূল বা বিজেপির বিরুদ্ধে হোক, আমি কোনওটাই অস্বীকার করছি না। এবং কোনওটা নিয়েই আমার কোনও অনুশোচনা নেই। যদি আজ পিছন ফিরে তাকাই, এক বারও বলব না যে আমি ওটায় ভুল করেছিলাম। আপনি সহমত না-ই হতে পারেন। কিন্তু আমি যা যা করেছি বা বলেছি, তার সব দায় আমার নিজের। এটা আমি কখনওই অস্বীকার করছি না।

প্রশ্ন: বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে ‘নিষেধাজ্ঞা সংস্কৃতি’ ওঠার পরে স্বস্তির দিন কি ফিরছে বলে আপনার মনে হয়?

কৌশিক: আমরা আশা করতে পারি। এটুকুই। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি। আমার ছেলে ঋদ্ধিকেও ব্যান করা হয়েছিল। দিনটা মনে থাকবে। বিকেলে আমি জিতের সঙ্গে একটা ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তার আগে বলি, এ বছর জানুয়ারি থেকে ‘শ্রীরামপুর ডায়েরিজ়’ বলে তাঁর একটা ছবির শুটিং শুরুর কথা ছিল, যেটায় ঋদ্ধি, সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় করার কথা ছিল। ওই ছবিটির পরিচালক সুমন ঘোষ আমাকে ফোনে জানান, ফেডারেশন সম্ভবত ঋদ্ধিকে ব্যান করেছে। শুনে আমার মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়ল! আমি শুটিংস্থল থেকেই স্বরূপ বিশ্বাসকে ফোন করি, অন্তত ৬ থেকে ৭ বার। তিনি খুব ঠান্ডা ভাবে আমাকে হুমকির সুরে শোনালেন, ঋদ্ধির ফেসবুকে ঠিক কোনগুলো তৃণমূল-বিরোধী এবং ফেডারেশন-বিরোধী পোস্ট। বললেন, ঋদ্ধির ওই পোস্টগুলোর জন্য ফেডারেশনের মর্যাদাহানি হয়েছে। সে জন্য ঋদ্ধিকে কাজ করতে দেওয়া যাবে না, যতক্ষণ না সে ক্ষমা চাইছে। বাড়ি গিয়ে আমি ও রেশমি এক প্রকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, আমরা দু’জনে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেব। কিন্তু ঋদ্ধি বেঁকে বসল। বলল, এটা করলে আমাদের সঙ্গে ও আর সম্পর্ক রাখবে না। ঋদ্ধি আমাদের সেই অগৌরব থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ও বিভিন্ন কাজ করেছে। আমার কথা হল, কোনও ভাবে কারও ব্যক্তিসত্তা নষ্ট করা যায় না, যদি না তাঁর ভিতরেই কোনও গন্ডগোল থাকে। আমি আর্টিস্ট ফোরামে দীর্ঘদিন ছিলাম, সেই বাম থেকে তৃণমূল আমল পর্যন্ত। এগ্‌জ়িকিউটিভ কমিটির সদস্য হিসেবেও থেকেছি। অনেক ভাল কাজ করেছে ফোরাম। কিন্তু প্রথম থেকে একেবারে রাহুল অরুণোদয়ের মৃত্যুর ঘটনা-পরবর্তী সময় পর্যন্ত দেখেছি, বরাবর এই এগ্‌জ়িকিউটিভ কমিটিতে এমন তিন-চার জন ব্যক্তি থেকেছেন, যাঁরা ফোরামের ভিতরের মিটিংয়ের খবর নিয়মিত প্রযোজকদের কাছে দিয়ে দিতেন। এই সে দিনও হয়েছে। এটা বাম আমলেও হত। তখন তো কোনও স্বরূপ বিশ্বাস ছিল না! আজ বিজেপি আসার ফলেই যে বাংলা সিনেমার, নাটকের উন্নতি হবে ম্যাজিকের মতো, সেটা ভাবার কারণ নেই।

আমাদের চলচ্চিত্র বা নাট্যচর্চার ভিতরে একটা আত্মবিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে, মনে করেন কৌশিক।

আমাদের চলচ্চিত্র বা নাট্যচর্চার ভিতরে একটা আত্মবিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে, মনে করেন কৌশিক। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: জেলার নাট্যদলগুলোর ভূমিকা তো উপেক্ষিত, এমনই অভিযোগ ওঠে। তাদের সামনের সারিতে আনার ক্ষেত্রে কী করা উচিত?

কৌশিক: বরাবর তারা অবহেলিত। বাম আমলে এবং তৃণমূল আমলেও জেলার নাট্যদলগুলোকে খুব স্বল্প পরিমাণ হলেও একটা আর্থিক অনুদানের চেষ্টা করেছে সরকার। কিন্তু সেটা প্রয়োজনের তুলনায় কম। তবু বলব, আমরা জেলায় থিয়েটার করতে গেলে সেখানে দর্শকের খুব ভাল সাড়া পাই। ওই ভাল দর্শক তৈরি করার কৃতিত্ব কিন্তু জেলার দলগুলোরই। তাই নিশ্চয় চাইব, এই সরকার জেলার নাট্যচর্চার উন্নতিতে নজর দিক।

Advertisement
আরও পড়ুন