রূপটানশিল্পী সোমনাথের স্মৃতিতে অনীক। ছবি: সংগৃহীত।
এই ভাবে অনীকদার কথা বলব কখনও ভাবিনি। যখন খবরটা জানতে পারি, তখনও আমি ‘প্রস্থেটিক মেকআপ’-এর কাজই করছি। শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এ-ও সম্ভব! কেশসজ্জাশিল্পী হেনাদি যখন ফোন করল, তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না নিজের কানকে। অনীকদার গড়িয়াহাটের যে ফ্ল্যাট তার নীচেই ছিল অফিস। ওখানেই গিয়েছি বহু বার। দাদার সঙ্গে সিনেমার থেকেও অনেক বেশি বিজ্ঞাপনী ছবিতেই কাজ করেছি।
‘আশ্চর্য প্রদীপ’ ছবির প্রথম পর্যায়ের লুকসেটের সময়েও আমিই কাজ করেছিলাম। তার পর যদিও সেই কাজ হয়নি। পরে ‘অপরাজিত’ ছবির সময়ে একসঙ্গে কাজ করেছিলাম। ওটাই প্রথম সুযোগ অনীকদার সঙ্গে ছবিতে কাজ করার। প্রথম আমাকে ফোন দাদার। সেগুলো যে এই ভাবে স্মৃতি হয়ে যাবে তা এখনও ভাবতে পারছি না।
প্রস্থেটিক রূপটানে ব্যস্ত সোমনাথ কুণ্ডু। ছবি: সংগৃহীত।
আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, “এই ছবিটা তুমি ছাড়া আমি করব না।” সেই সময় অবশ্য সত্যজিৎ হিসাবে ভাবা হয়েছিল অন্য এক অভিনেতাকে। ‘অপরাজিত’ ছবিতে একটা ছোট অংশে প্রথমে অভিনয়ের কথা ছিল জীতুর। দাদা বলেছিলেন, “সত্যজিতের লুক তৈরি করা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব হবে না। তোমার জন্যই এই ছবিটা করছি। তুমি ছাড়া হবে না।” অনীকদার মতো গুণী মানুষের কথা কি কখনও ফেলা যায়? এই ছবিতে কাজ করতে গিয়ে অনীকদার সঙ্গে খুব ঝগড়াও হয়েছে। তাড়াহুড়ো করলে বলতাম, এমন তাড়া দিলে কাজ হবে না।
সত্যজিৎ ‘লুক’-এ জীতু কমল। ছবি: সংগৃহীত।
সেটে সব টেকনিশিয়ানকে স্বাধীনতা দিতেন। ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’-এর সময়ও আমাদের কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে হয়ে ওঠেনি। অনীকদার ইচ্ছা ছিল সলিল চৌধুরীর জীবনীচিত্র তৈরি করার। এ কথা কেউ জানেন না। আমার সঙ্গে এই ছবির বিষয়ে অনেক দূর কথাও হয়ে গিয়েছিল। আমি তো এক অভিনেতার উপরে ‘লুক’ করে দেখিয়েওছিলাম। খুব খুশি হয়েছিলেন।
অনীকদা চেয়েছিলেন অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে সলিল চৌধুরী হিসাবে। গ্রাফিক্স করে আমরা সেটা দেখেও ছিলাম। কিন্তু অনির্বাণ আর অনীকদার মধ্যে যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি। অনেক বার নাকি ফোন করেছিলেন দাদা। কিন্তু অনির্বাণকে পাননি। এখনও মেসেজ-এ আছে সেই সব কথোপকথন। আমাকে বলেছিলেন অন্য কারও কথা ভাবতে। সেই কাজ শেষ অবধি অসমাপ্তই রয়ে গেল বলে আফসোস হচ্ছে।
‘অপরাজিত’ ছবির শুটিংয়ের সময়ে পরিচালক অনীক, প্রযোজক ফিরদৌসুল এবং জীতু। ছবি: সংগৃহীত।
অনীকদার ছবির জন্যই তো জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলাম। খুব কষ্ট হচ্ছে। এই ভাবে এক জন মানুষের চলে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না। আর কখনও দেখা হবে না। শেষ বারের মতো দেখতে যাব। কিন্তু শেষ দেখা হওয়ার সময়টা এই ভাবে আসবে, সত্যিই ভাবনার বাইরে।