নন্দনে ছবিমুক্তি উপলক্ষে রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং রুদ্রনীল ঘোষ। নিজস্ব চিত্র।
নিজের শহরে তিন বার মুক্তি পেল জয়ব্রত দাসের ‘দি অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’। একই সঙ্গে মুক্তি পেয়েছে সমর্পণ সেনগুপ্তের ছবি ‘প্রত্যাবর্তন’। এই ছবি দু’টির হাত ধরে নন্দনে বহু বছর পরে ফিরলেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ। ওঁরা পদ্ম শিবিরের, এই ‘দোষ’-এ আগের রাজ্য সরকার তাঁদের অভিনয়দুনিয়া এবং নন্দন আঙিনা থেকে ব্রাত্য করেছিল।
নন্দন ১ কানায় কানায় পূর্ণ। দর্শকের শুভেচ্ছা বন্যায় ভাসতে ভাসতে মঞ্চে টিম ‘ফাইন আর্টস’ এবং ‘প্রত্যাবর্তন’। তাঁদের এ দিনের ‘ট্যাগ লাইন’, ‘ফাইন আর্টসের নান্দনিক প্রত্যাবর্তন’। এমন আবহে রূপাকে পাশে নিয়ে রুদ্রের বার্তা, “ইন্ডাস্ট্রিতে অবশ্যই ভাল ছবি তৈরি হবে। তবে ক্রমাগত কঠিন ছবি তৈরি হলে কিন্তু টলিউডের বিপদ। ওই ধারার ছবিতে ইন্ডাস্ট্রি বাঁচবে না। আগে তো খেয়েপরে বাঁচতে হবে!” একই সঙ্গে তিনি এ-ও জানান, শহরে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমতে কমতে ৭৫০ থেকে ১২০-তে দাঁড়িয়েছে। বাংলা ছবিকে বাঁচাতে গেলে হলের সংখ্যাও বাড়াতে হবে।
নন্দনে টিম ‘দি অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’। নিজস্ব ছবি।
গত বছর পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, বাংলা ছবির উন্নতির স্বার্থে ১০০টি ছোট প্রেক্ষাগৃহ বানাবেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ‘মাইক্রো ফরম্যাট’-এ এক একটি প্রেক্ষাগৃহে ৪০-৫০ জন দর্শকের বসার জায়গা থাকবে। এই প্রেক্ষাগৃহ তৈরি হবে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে, যাতে সব ছবি সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। বিজেপি সরকার কি এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত করতে এগিয়ে আসবে? বিজেপি বিধায়ক এবং অভিনেতাকে প্রশ্ন করেছিল আনন্দবাজার ডট কম। রুদ্রের কথায়, “এই ভাবনা একা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নয়। এই ভাবনা ইন্ডাস্ট্রির ছোট-বড় সকলের। বুম্বাদা প্রকাশ্যে বলেছেন। তাই হয়তো সে কথা বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। এই ভাবনা আমাদের সবার। দেখছি, কী ভাবে সেই ভাবনা বা স্বপ্ন বাস্তবায়িত করা যায়।”
রূপা-রুদ্রনীল জোট এ দিন শুরু থেকেই ছিলেন বিধ্বংসী মেজাজে। কখনও রঙ্গ-ব্যঙ্গ, কখনও শাণিত উত্তর, ঠোঁটের ডগায় উপস্থিত ছিল উভয়েরই। যে জয়ী চার তারকা প্রার্থীর হাতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী টলিউডের দায়িত্ব দিয়েছেন, রূপা-রুদ্রনীল তাঁদের মধ্যে অন্যতম। এ দিন তাঁরা সাফ জানিয়ে দেন, ‘ব্যান’ সংস্কৃতি আর থাকবে না। ফেডারেশনের ‘দাদাগিরি’ বন্ধ হবে। প্রযোজক-পরিচালক-শিল্পীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। প্রযোজকদের ঘাড়ে নিয়মনীতির বোঝা আর চাপিয়ে দেওয়া হবে না। কারও গায়ে রাজনৈতিক রং লাগতে দেওয়া হবে না। আভাসে এ-ও বোঝান, বদল আসতে পারে ইন্ডাস্ট্রির একাধিক সংগঠনে। তবে সেই বদল যে রাতারাতি নয়, সে কথা তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্ট। রুদ্রনীল যেমন বলেন, “আমরা সবাইকে নিয়ে কাজ করব। এখানে ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’-এর ‘টুকরে টুকরে সংস্কৃতি’ চলবে না। বিভেদের রাজনীতিকে আর কোনও ভাবে টলিউডে ঢুকতে দেওয়া হবে না।”
টলিউডের মঙ্গল প্রার্থনা করে রুদ্রনীলের আহ্বান, “সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন। সকলের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করুন। দেশের প্রতি, রাজ্যের প্রতি সকলের সমান শ্রদ্ধা থাক। বিজেপি সরকার এটাই চায়।”
নন্দনে টিম ‘প্রত্যাবর্তন’। নিজস্ব চিত্র।
আরও একটি আশ্বাস দেন রূপা এবং রুদ্রনীল। শহর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পোস্টারমুক্ত করবেন তাঁরা। নাম না করে উভয়েই মনে করিয়ে দেন, কী কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কী রবীন্দ্রজয়ন্তী! সর্বত্র প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মুখ। আগামী দিনে এই ‘সংস্কৃতি’ আর দেখবে না শহর। এ দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ‘প্রত্যাবর্তন’ ছবির অন্যতম অভিনেতা-গায়ক শিলাজিৎ মজুমদার। তিনি প্রকাশ্যে রূপা এবং রুদ্রনীলকে অনুরোধ করেন, “এর বদলে বর্তমান সরকারের নেতৃস্থানীয়দের ছবি যেন জায়গা করে না নেয়। তা হলে একই ভাবে তিনি আবার প্রতিবাদ জানাবেন।” দুটো ছবিরই পরিবেশক অজন্তা, গ্লোব সিনেমাহলের মালিক শতদীপ সাহা। তিনি বলেন, “আগামী দিনে কলকাতা আগের মতো বাংলা ছবির পোস্টারে সেজে উঠবে।” শিলাজিৎ কি নতুন সরকারকে নিয়ে গান বাঁধবেন? সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গায়ক-অভিনেতা বলেন, “১৯৯৪ সালে একটা গান বেঁধেছিলাম, ‘তোদের ঘুম পেয়েছে বাড়ি যা’। কাদের উদ্দেশে গানটি করেছিলাম, কেউ বুঝতে পারেননি। ফলে অনেক দেরিতে সবার ঘুম ভেঙেছিল। আর এ সবে নেই। গান গাইছি, অভিনয়ে আছি। আর কী চাই?”