সঙ্গীতশিল্পী কেকে-এর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতিতেত ডুব জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের। ছবি: সংগৃহীত।
সময়টা ১৯৯৬ বা ১৯৯৭। সালটা আমি একটু এ দিক-ও দিক করে ফেলছি হয়তো। রেকর্ডিং স্টুডিয়োয় একটি ছেলে ঢুকল। বিজ্ঞাপনী ‘জিঙ্গল’-এর কম্পোজ়িশন নিয়ে। সেই ছেলেটি ছিলাম আমি। আর সেই ‘জিঙ্গল’ গাইতে এসেছিলেন সাদামাঠা এক জন। পরনে সাধারণ পোশাক। স্টুডিয়োয় ঢুকেই বলেছিল ‘জিৎ, গানটা শোনা আমাকে’। সেই কেকে-এর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ। একটা স্যুটকেস কোম্পানির জন্য ‘জিঙ্গল’ তৈরি করেছিলাম আমরা। আমার কাছে ও অনুপ্রেরণা।
এমন মাটির মানুষ এখন খুব কম দেখা যায়। সবসময় হাসিমুখ। খুব প্রাণবন্ত মানুষ ছিল আমার বন্ধু। অন্ধেরী ইস্টের সেই স্টুডিয়ো, সেই রেকর্ডিংয়ের মুহূর্ত এখনও আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। চোখের নিমেষে যেন কাছের বন্ধুকে হারিয়ে ফেললাম! ২০২২ সালের ৩১ মে-এর সেই রাত। এখনও মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে।
কেকে-এর সঙ্গে রেকর্ডিং-এ জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
কলকাতায় অনুষ্ঠান করতে আসার দু’দিন আগেই আমাকে ফোন করেছিল। আমরা একটা গান তৈরি করেছিলাম। ও বলেছিল, ছবিটা মুক্তি না পেলেও গানটা যদি রিলিজ় করা যায়। কথা হয়েছিল যে, কলেজে অনুষ্ঠান করবে। তার পর দু’দিন থাকবে। তখনই আমরা কথা বলে নেব। কিন্তু সেই কথা আর বলা হল না।
বন্ধুর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরে কী মনে হয়েছিল গায়কের? ছবি: সংগৃহীত।
৩১ মে তখন আমি আর আমার স্ত্রী চন্দ্রাণী (গঙ্গোপাধ্যায়) এক বন্ধুর রেস্তরাঁয় খেতে গিয়েছি। আচমকাই পেয়েছিলাম ফোনটা। কেকে-এর আপ্তসহায়কের ফোন দেখে একটু অবাক হয়েছিলাম। ফোন তুলতেই শুধু কান্নার শব্দ। কেকে-এর আপ্তসহায়ক হিতেশের সঙ্গেও অনেকদিনের আলাপ আমার। ও-ই ফোনে প্রথম বলে, ‘আপনার বন্ধু আর নেই।’ হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল আমার। হাসপাতালে ছুটেছিলাম আমি আর চন্দ্রাণী। দেখলাম, হাসপাতালে শুয়ে ওর নিথর দেহ। এক পায়ে মোজা আছে। আর এক পায়ে নেই। পরনে জিন্স, টি-শার্ট। রকস্টার ছিল তো ও। দেখে মনে হচ্ছিল বিশ্রাম নিচ্ছে। এখনই যেন মঞ্চে উঠবে। এর থেকে বেশি আর কিছু বলতে পারব না। কারণ, নিজের বন্ধুকে ওই অবস্থায় দেখার পরে আমি আর কিছু ভাবতেই পারিনি।
এখনও মনে পড়ে ‘সড়ক ২’ ছবির গান রেকর্ডিং-এর মুহূর্ত। ওর সঙ্গে আমি অনেক সময় কাটিয়েছি। খুব খেতে ভালবাসত। কিন্তু গানই তো আমাদের দু’জনকে একসুতোয় বেঁধেছিল। তাই ‘স়়ড়ক ২’ ছবির একটা মুহূর্ত সারাজীবন আমার মনে গেঁথে থাকবে। তখন আমার বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। তার মধ্যেই রেকর্ডিং হচ্ছে। পরিচালক মহেশ ভট্ট কথা বলছেন। আমার হাত চেপে দাঁড়িয়েছিল কেকে। কারণ, ও জানত আমার মনের অবস্থা। পরিচালক কেকে-কে বলেছিলেন, মনপ্রাণ দিয়ে আমার বাবার জন্য গান গাইতে। ও বলেছিল, ‘কাকুকে এই গানটা শোনাস’। যত ক্ষণ না আমার মুখে হাসি ফুটত, তত ক্ষণ রেকর্ডিং থামাত না ও। বার বার বলত, ‘আর এক বার করি’। আমার পছন্দের খুব গুরুত্ব দিত। কেকে এক জনই ছিল। কোনও গায়কের ছোঁয়া ছিল না ওঁর গায়কিতে। চার বছর কেটে গিয়েছে। আরও হয়তো অনেক বছর কেটে যাবে। কিন্তু, বন্ধু থেকে যাবে সারাজীবন আমার মনের অন্দরে। যত্ন করে রাখব ওর সঙ্গে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত।