Rahul Arunoday Banerjee death

এক মাস পার! রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে নতুন নিয়ম, রাহুলের মৃত্যুর পরে কী কী ঘটল টালিগঞ্জে?

রাহুলের মৃত্যুর পরে অভিনেতা কলাকুশলীদের নিরাপত্তায় তৎপর হয়েছে টলিপাড়া। তাঁর জন্যই নাকি ‘এক’ হয়ে গিয়েছে ফেডারেশন ও পরিচালক-অভিনেতারা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৮
রাহুলের মৃত্যুর এক মাস পার।

রাহুলের মৃত্যুর এক মাস পার। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

দেখতে দেখতে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর এক মাস পূর্ণ হল। গত ২৯ মার্চ তাঁর মৃত্যুর খবর স্তব্ধ করে দিয়েছিল টলিপাড়া-সহ গোটা বাংলার মানুষকে। এখনও স্তব্ধ রাহুলের পরিবার। থমকে গিয়েছে তাঁদের জীবন। তবে অভিনেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঘটে গিয়েছে অনেক কিছু। তাঁর মৃত্যুর পরে অভিনেতা কলাকুশলীদের নিরাপত্তা জোরদার করতে তৎপর হয়েছে টলিপাড়া। কখনও আবার তাঁর জন্যই নাকি ‘এক’ হয়ে গিয়েছে ফেডারেশন ও পরিচালক-অভিনেতারা।

Advertisement

রাহুলের মৃত্যুর পরে ঠিক কী কী ঘটল এই এক মাসে?

১) ২৯ মার্চ। তালসারিতে শুটিং হচ্ছিল ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের। দৃশ্যে ছিলেন রাহুল ও ধারাবাহিকের নায়িকা শ্বেতা মিশ্র। বলা হচ্ছে, সেই শুটিং করতে গিয়েই তলিয়ে যান রাহুল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।

২) ময়নাতদন্তের রিপোর্ট জানায়, জলে ডুবেই অভিনেতার মৃত্যু হয়েছে। জল ঢুকে ফুসফুস ফুলে গিয়েছিল। বালি ঢুকে যায় তাঁর খাদ্যনালীতেও। শোনা যায়, ওড়িশা পুলিশের অনুমতি ছাড়াই শুটিং হচ্ছিল ওই এলাকায়।

৩) সমুদ্রের নামার দৃশ্য কি চিত্রনাট্যে ছিল? প্রথম দিন সংবাদমাধ্যমকে প্রযোজনা সংস্থা ‘ম্যাজিক মোমেন্টস্‌’-এর হয়ে লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “এ কী ঘটে গেল! আমাদের চিত্রনাট্যে গভীর জলের কোনও দৃশ্য ছিল না। শুনেছি, সেই সময় ওকে অনেকে বার বার মানা করছিল জলে না নামার জন্যে। এমনকি, বাকি শিল্পীদের গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কারও বারণ শোনেনি ও। আমি তো স্পটে ছিলাম না।” জলে নামার দৃশ্য ছিল কি না, তা নিয়ে জলঘোলা শুরু হয়।

৪) অভিনেতার মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই তাঁর বিজয়গড়ের বাড়ির সামন জড়ো হতে থাকেন বিনোদনজগতের মানুষ ও তাঁর অনুরাগীরা। পরদিন, অর্থাৎ ৩০ মার্চ দুপুরে রাহুলের বাড়ির সামনে যান বিজেপি নেত্রী পাপিয়া অধিকারী। তাঁকে ঘিরে ধরেন স্থানীয়েরা। কেউ কেউ ফিরেও যেতে বলেন। বিজেপি কর্মীদের নিয়ে তাঁকে এলাকায় ঢুকতে দেখেই উত্তেজনা ছড়ায়। স্থানীয়দের দাবি, প্রয়াত অভিনেতার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা।

রাহুলের শেষযাত্রা।

রাহুলের শেষযাত্রা। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

৫) ৩০ মার্চ রাহুলের দেহ তালসারি থেকে কলকাতার বাড়িতে নিয়ে আসেন তাঁর পরিজনেরা। শেষযাত্রার আগে বিজয়গড়ে জড়ো হন তাঁর বন্ধু ও অনুরাগীরা। রাহুল ঘোষিত বাম সমর্থক ছিলেন। তাই বাম শিবিরের বন্ধুরাও এ দিন পৌঁছে যান। রাহুলের মরদেহ তাঁরা মুড়ে দেন লাল পতাকায়। ‘লাল সেলাম’ স্লোগান তোলেন। বামপন্থীদের গান গাইতেও দেখা যায় তাঁদের। এই বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অনেকেই দাবি করেছিলেন, শিল্পীর মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে।

৬) সে দিন অভিনেতার বাড়িতে গিয়েছিলেন অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী, রূপাঞ্জনা মিত্রেরা। বিকেলের আগেই অভিনেতার বাড়ির নীচে দাঁড়িয়ে ‌থাকতে দেখা গিয়েছিল ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস, মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, অভিনেতা চন্দন সেন, দিগন্ত বাগচী থেকে অনেককেই।

৭) কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় রাহুলের। পুত্র সহজকে নিয়ে যান প্রিয়াঙ্কা সরকার। সহজই সারে তার বাবার কাজ।

৮) রাহুলের মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করতে থাকে টলিপাড়ার একাংশ।

৯) ১ এপ্রিল বিভিন্ন দিক থেকে ‘ম্যাজিক মোমেন্টস্‌’ সংস্থার দিকে আঙুল উঠতে থাকে। সংস্থার তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয় লীনা গঙ্গোপাধ্যায় আর মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন থাকতে চান না।

রাহুলের জন্য পদযাত্রা।

রাহুলের জন্য পদযাত্রা। ছবি: সংগৃহীত

১০) অভিনেতার স্মরণে ৪ এপ্রিল পদযাত্রার আয়োজন করা হয়। ‘জাস্টিস ফর রাহুল’ নামে এই পদযাত্রার আয়োজক হিসাবে নাম ছিল ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়, যিশু সেনগুপ্ত, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, রানা সরকার, সৌরভ দাস, সৌরভ পালোধি, রূপাঞ্জনা মিত্র, পিয়া সেনগুপ্ত, স্বরূপ বিশ্বাস, অপর্ণা সেন, অঞ্জন দত্ত, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় থেকে অঙ্কুশ হাজরা, শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, গৌরব চক্রবর্তী, কাঞ্চন মল্লিকের।

১১) ৪ এপ্রিল আর্টিস্ট ফোরামের তরফ থেকে প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে রিজেন্ট পার্ক থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়। সেখানে ছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী-সহ একাধিক তারকা। উপস্থিত ছিলেন প্রিয়াঙ্কা সরকারও।

তালসারিতে এফআইআর দায়ের করেন প্রিয়াঙ্কা।

তালসারিতে এফআইআর দায়ের করেন প্রিয়াঙ্কা। ছবি: সংগৃহীত

১২) সেই রাতেই প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে তালসারিতে যান প্রসেনজিৎ ও ঋতুপর্ণা। সেখানে প্রযোজনা সংস্থা ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’-এর কর্ণধার শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও লীনা গঙ্গোপাধ্যায়-সহ পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল, ফ্লোর এগ্‌জ়িকিউটিভ প্রোডিউসার শান্তনু নন্দী এবং প্রযোজক সংস্থার ম্যানেজার চন্দ্রশেখর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন প্রিয়াঙ্কা।

১৩) ৫ এপ্রিল টলিপাড়া ডাক দেয় কর্মবিরতির। টেকনিশিয়ানস স্টুডিয়োয় অভিনেতাদের সংগঠনের এক বৈঠকের পরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফেডারেশন ও আর্টিস্ট ফোরাম সকলের সম্মতিতে জানানো হয়, ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হবে কর্মবিরতি। প্রত্যেক অভিনেতা, শিল্পী ও কলাকুশলীকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার দাবিতে এই কর্মবিরতির ঘোষণা করা হয়। অনেকেই এই দিন বলেন, রাহুলই গোটা ইন্ডাস্ট্রিকে মিলিয়ে দিলেন!

১৪) এক সাক্ষাৎকারে লীনাগঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধারাবাহিক আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা নেই তাঁর। কিন্তু সপ্তাহ ঘুরতেই বদলে যায় চিত্রনাট্য নতুন করে সাজানো হয়। যোহ করা হয় একাধিক নতুন চরিত্র।

৭ এপ্রিল কর্মবিরতি নিয়ে আলোচনায় শিল্পীরা।

৭ এপ্রিল কর্মবিরতি নিয়ে আলোচনায় শিল্পীরা। ছবি: সংগৃহীত

১৫) পরিকল্পনা অনুযায়ী ৭ এপ্রিল সকাল ১০টায় ‘টেকনিশিয়ান স্টুডিয়ো’য় একত্রিত হন টলিপাড়ার শিল্পীরা। দফায় দফায় আলোচনার মাধ্যমে আর্টিস্ট ফোরামের সভাপতি রঞ্জিত মল্লিক এবং কার্যকরী সভাপতি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় কর্মবিরতি শেষের ঘোষণা করেন। ‘ম‍্যাজিক মোমেন্টস’ প্রযোজনা সংস্থার কোনও কাজ আপাতত করবেন না শিল্পী বা টেকনিশিয়ানরা, এমন ঘোষণাও হয়। উপস্থিত হয়েছিলেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, হরনাথ চক্রবর্তী, শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, দেব-সহ শিল্পীদের অনেকেই। বৈঠকে ছিলেন রাহুলের স্ত্রী, অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারও।

১৬) রাহুলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এই দিনই আরও একটি বড় বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। প্রযোজক-অভিনেতা এবং সাংসদ দেব ঘোষণা করলেন, “আর কোনও ‘ব্যান কালচার’ নয়। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বৈঠকে জানিয়েছেন, যে সমস্ত পরিচালক, অভিনেতা এই ‘সংস্কৃতি’র কারণে দীর্ঘ দিন বসে রয়েছেন, স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে বৈঠক করে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের কাজে ফেরাবেন তিনি।”

১৭) ঘোষণা অনুযায়ী ‘ভোলেবাবা পার করেগা’, ‘চিরসখা’, দুই ধারাবাহিক তড়িঘড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তার পরেই টেকনিশিয়ানদের সমস্যা নিয়ে সরব হন দুই ধারাবাহিকের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা। এই বিষয়টি নিয়ে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় একটি বৈঠক করেন এবং জানান, কলাকুশলীদের নিয়ে সমাধান সূত্র খোঁজা হবে। ‘কনে দেখা আলো’— এই ধারাবাহিকটি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে থাকে।

১৮) ১০ এপ্রিল সবচেয়ে বড় ঘোষণা করেন দেব। এই বৈঠকের কেন্দ্রেও ছিল রাহুলের মৃত্যু। আর্টিস্ট ফোরামের বৈঠকে দেব ‘ব্যান’ উঠিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ৭২ ঘণ্টার সময়সীমাও বেঁধেছিলেন। সেই সময়সীমা পেরোতেই দেব জানান, তাঁর আসন্ন ছবি ‘দেশু ৭’-এ থাকছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। এই ছবির মাধ্যমেই কাজে ফিরছেন তিনি, জানিয়ে দেন দেব। এই ছবির পরিচালক, প্রযোজকও তিনি নিজেই— এই ঘোষণাও চমকে দেয় দর্শককে। তবে দেবের এই ঘোষণা সম্পর্কে ফেডারেশনের কোনও ধারণা নেই, এমনটাই জানিয়েছিলেন স্বরূপ বিশ্বাস।

১৯) ১২ এপ্রিল আর্টিস্ট ফোরামের ফের একটি বৈঠক হয়। ‘ম্যাজিক মোমেন্টস্‌’-এর সঙ্গে কারা কাজ করতে চান, কারা চান না— এই নিয়ে ভোট হয়। অধিকাংশরাই কাজ করতে চান না, এমনই ফল বেরোয়। প্রসেনজিৎ এই দিন বলেছিলেন, “যত দিন না ওঁরা দু’জন নির্দোষ প্রমাণিত হচ্ছে, তত দিন ওঁদের সঙ্গে কেউ কাজ করতে রাজি নন। একই ভাবে ওঁদের সঙ্গে যুক্ত কোনও কাজও নতুন করে হবে না। যদি না প্রযোজনার হাতবদল হয়।”

২০) ১২ এপ্রিল ‘চিরসখা’ ধারাবাহিকের শেষ সম্প্রচার হয়। তবে ১৬ এপ্রিল জানা যায়, বন্ধ হচ্ছে না আর একটি ধারাবাহিক— ‘কনে দেখা আলো’। এই ধারাবাগিক লীনা-পুত্র অর্ক গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রযোজিত। নির্দিষ্ট শর্তাবলি মেনেই নাকি এই ধারাবাহিক বন্ধ করা হয়নি বলে জানানো হয়। তবে কী কী শর্ত রয়েছে ফোরামের? তা প্রকাশ্যে আসেনি।

২৭ এপ্রিলের বৈঠক।

২৭ এপ্রিলের বৈঠক। ছবি: সংগৃহীত

২১) ২৭ এপ্রিল একটি বৈঠক হয় ইমপা-আর্টিস্ট ফোরামের। উপলক্ষ, অভিনেতাদের নিরাপত্তার নবীকরণ নিয়ে প্রযোজকদের সঙ্গে বৈঠক। নতুন ‘এসওপি’ (আদর্শ পরিচালন পদ্ধতি) তৈরি এবং সেটি চালু করা। ফোরামের কার্যকরী সভাপতি প্রসেনজিৎ এ দিনের বৈঠক রাহুলের স্মৃতিতে উৎসর্গ করেন। যিশু তাঁর কথায় সায় দিয়ে বলেন, “আমরা একসঙ্গেই পথ চলছিলাম। চলতে চলতে হয়তো কিছু ক্ষেত্রে আমরা একটু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলাম। রাহুল সেটা দেখিয়ে দিয়ে গেল।”

গত এক মাসে গঙ্গা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক অনেক জল। রাহুলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন নিয়মাবলি, উঠেছে নিষেধাজ্ঞা, জোরদার হয়েছে নিরাপত্তা। কিন্তু এখনও ধোঁয়াশা, ঠিক কী ঘটেছিল ২৯ মার্চ তালসারিতে? সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আশায় এখনও থমকে রয়েছে রাহুলের পরিবার।

Advertisement
আরও পড়ুন