Upal Sengupta on World Music Day

ওঁরা ভাষা বোঝেননি, তবে সুরের মূর্ছনায় ভেসেছিলেন! বুঝেছিলাম সঙ্গীতের কোনও গণ্ডি নেই

দেশবিদেশের মধ্যে সীমারেখা থাকলেও, সঙ্গীতের কোনও গণ্ডি নেই। মনে করেন উপল সেনগুপ্ত। কী ভাবে সারা বিশ্বের সুরের প্রভাব রয়েছে তাঁর উপর, আন্তর্জাতিক সঙ্গীত দিবসে জানালেন শিল্পী।

Advertisement
উপল সেনগুপ্ত
শেষ আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ ০৮:৫৫
বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে লিখলেন উপল সেনগুপ্ত।

বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে লিখলেন উপল সেনগুপ্ত। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

শৈশব থেকেই বাড়িতে গানের পরিবেশ। মূলত বাংলা গান, রবীন্দ্রসঙ্গীতই বাজত। তবে একটা সময়ের পরে গান শোনার ব্যাপ্তির বৃদ্ধি হল। বিভিন্ন ভাষায় নানা গান শোনার অভ্যাস হল। ক্রমশ বুঝলাম, বিভিন্ন ভাষায় গান শুনলেও, সুর নিজেও তো একটা ভাষা।

Advertisement

আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচয়ের ধাপগুলি আজও মনে আছে। রাবীন্দ্রিক বাড়ি ছিল আমাদের। পিসি ছিলেন শৈলজারঞ্জন মজুমদারের ছাত্রী। পিসি ও বাবার কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতাম। আমার বোন আবার ইংরেজি গানের ভক্ত ছিল। সেটাও শুনতাম। এ সব লিখতে গেলে মনে পড়ে যায়, প্রথম ক্যাসেট রেকর্ডারের কথা। বেশ দাম দিয়েই কেনা হয়েছিল। প্রথম দেবব্রত বিশ্বাস, কিশোর কুমার ও মান্না দে-র গানের ক্যাসেট কেনা হয়েছিল। সেই সময়ে পাড়ার একজনের থেকে ইংরেজি গানের ক্যাসেট নিয়ে এসেছিলাম। সেখানে হ্যারি বেলাফন্টে, এঙ্গলবার্ট হ্যাম্পারডিঙ্ক, সাইমন অ্যান্ড গারফাঙ্কেল, জিম রিভ্স ও বব ডিলানের মতো শিল্পীদের গান ছিল। এ ছাড়া পাড়ার এক দাদা গিটার বাজিয়ে ‘বিটল্‌স’-এর গান শুনিয়েছিলেন।

‘আমার হ্যারি বেলাফন্টে খুব ভাল লাগত’।

‘আমার হ্যারি বেলাফন্টে খুব ভাল লাগত’। ছবি: সংগৃহীত।

স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে গিয়ে বিদেশি গানের সঙ্গে পরিচয় গাঢ় হল। আর্ট কলেজের ছাত্র ছিলাম। প্রায়ই ধর্মতলায় ‘সিম্ফনি’-তে যেতাম। তবে নিজের ভাষায় গান শোনারও অভ্যাস ছিল। স্বপন বসুর লোকগীতি শুনতাম। বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগীতি কেমন হয়, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হল। অনুপ ঘোষালের লোকগীতি শুনতাম। গম্ভীরা, হাওইয়া, ভাটিয়ালি-সহ নানা ধরনের গানের সঙ্গে পরিচয় হল। প্রত্যেকটি ধরনের মধ্যে কী কী পার্থক্য রয়েছে, সেগুলিও ক্রমশ বুঝলাম। এর পরে আমার গান শোনার তালিকায় জুড়ল বব মারলে, পিঙ্ক ফ্লয়েড, জন ডেনভার, কেনি রজার, রজার বিটেকার, ইগল্‌স-এর। বুঝলাম সারা বিশ্বে কত রকমের সুর হয়। কোনওটা রক, কোনওটা রেগে (reggae), ক্যালিপসো, অথবা কানট্রি।

রক গানের প্রতি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ছিল সেই সময়ের তরুণদের। তবে আমার হ্যারি বেলাফন্টে খুব ভাল লাগত। তাই আমার রক মিউজ়িক-এর বাইরে অন্য ধরনের সঙ্গীতের প্রতি বেশি আগ্রহ ছিল। এর পরে আফ্রিকার গানবাজনা শোনা শুরু হল। সেখানকার শিল্পীদের চিনলাম। বিদেশি সঙ্গীত, লোকগীতির পাশাপাশি সলিল চৌধুরী, রাহুল দেববর্মণ, সুধীন দাশগুপ্তের গানও বাজত। তবে আমার উপরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল হ্যারি বেলাফন্টের। তিনি একাধারে অনেক কিছুর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নির্দিষ্ট একটি ধারার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। ক্যালিপসো, ব্লুজ়-সহ নানা ধরনের গান রয়েছে তাঁর। ওঁর গানে প্রেম তো ছিলই, রসবোধও ছিল, আবার রাজনীতিও ছিল। নাটকের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। আর্থিক অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেকে সংস্কৃতির সঙ্গে সমৃদ্ধ করেছিলেন। তাই ওঁর গানে সেই ছাপও পেয়েছিলাম। ‘উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর মতো গানের উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। ইথিয়োপিয়ার দুর্ভিক্ষের জন্য আর্থিক সংগ্রহের উদ্দেশ্য নিয়ে এই গান বাঁধা হয়েছিল। গানটি বেঁধেছিলেন মাইকেল জ্যাকসন ও লায়নেল রিচি।

‘বিদেশি শ্রোতার সামনে চন্দ্রবিন্দু-র গান গাই। দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা।’

‘বিদেশি শ্রোতার সামনে চন্দ্রবিন্দু-র গান গাই। দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা।’ ছবি: সংগৃহীত।

আফ্রিকার বেশ কিছু গান আমার খুবই প্রিয়। ভাষাটা হয়তো বোধগম্য হয়নি। কিন্তু সুর ছুঁয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আফ্রিকান শিল্পী মিরিয়াম মাকেবার ‘মালাইকা’ গানটি। দেশবিদেশে ভৌগোলিক সীমারেখা, গণ্ডি, সীমান্ত থাকে। কিন্তু সঙ্গীতশিল্পীদের জন্য এমন কোনও গণ্ডি না থাকাই ভাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে সলিল চৌধুরী, প্রত্যেকের গানেই দেশবিদেশের সুরের প্রভাব রয়েছে। ‘দ্য লঙ্গেস্ট ডে’ নামে একটি গান রয়েছে, সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে হিন্দি গান ‘জ়িন্দগি মিলকে বিতায়েঙ্গে’।

বিদেশে আমরা প্রায়ই অনুষ্ঠান করতে গিয়েছি। মূলত বাঙালি শ্রোতাদের সময়েই আমরা অনুষ্ঠান করেছি। কিন্তু একবার আমরা ন্যাশভিল-এর একটি পাবে গিয়েছিলাম। সেখানে শিল্পীদের সঙ্গে আলাপ হয়। পরের দিন আবার আমরা গিয়েছিলাম। সেই দিন আমরা বিদেশি শ্রোতার সামনেই চন্দ্রবিন্দু-র গান গাই। সে এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা। ‘ত্বকের যত্ন নিন’ গানটি শুনে ওঁরা খুব উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। ভাষাটা বুঝছিলেন না। তবে রক অ্যান্ড রোল বাজছে, সেটা উপভোগ করেছিলেন। সেই দিনও উপলব্ধি করি, সত্যিই সুর নিজেই একটি ভাষা। সীমানা গণ্ডি পেরিয়ে এর বিস্তার মাপা যায় না।

তাই নতুন যাঁরা সঙ্গীত নিয়ে এগোতে চান, তাঁদেরও দেশবিদেশের গান শোনা উচিত। আমার প্লে-লিস্টে তো আজও বেজে যায় হ্যারি বেলোফন্টে, রিচার্ড বোনা, সাইমন অ্যান্ড গারফাঙ্কেল, বিটল্‌স ও সলিল চৌধুরীর গান।

(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)

Advertisement
আরও পড়ুন