Aniket Mitra Exclusive Interview

ভন্সালী-হিরানী থেকে শাহরুখ-অক্ষয়ের সঙ্গে কাজ, ভিস্যুয়াল আর্টিস্ট অনিকেত মনে করেন ‘বাংলায় পেশাদারিত্ব কম’!

কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে স্বর্ণপদক পেয়ে পাশ করেছেন অনিকেত মিত্র। কর্পোরেট সংস্থায় চাকরি দিয়ে শুরু। এখন তিনি পেশায় ভিস্যুয়াল আর্টিস্ট, স্টোরিবোর্ড আর্টিস্ট, কনসেপ্ট ডিজ়াইনার— একে একে জুড়েছে একাধিক তকমা। নিজের কাজ, শিল্প থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, নানা বিষয় নিয়ে আড্ডা দিলেন।

Advertisement
অয়ন্তিকা দত্ত মজুমদার
শেষ আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ ০৮:৫৯
শিল্পী অনিকেত মিত্র।

শিল্পী অনিকেত মিত্র। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম, মূল ছবি: ফেসবুক।

কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়ির ছেলে। তবে গত কয়েক বছর ধরে মুম্বইয়ের বাসিন্দা। বলিউড থেকে দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রি— সর্বত্র তাঁর আঁকার জয়জয়কার। তিনি অনিকেত মিত্র। গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে স্বর্ণপদক নিয়ে পাশ করেছেন। কর্পোরেট সংস্থায় চাকরি দিয়ে কেরিয়ার শুরু। এখন তিনি পেশায় ভিস্যুয়াল আর্টিস্ট, স্টোরিবোর্ড আর্টিস্ট, কনসেপ্ট ডিজ়াইনার— একে একে জুড়েছে একাধিক তকমা। কাজ করেছেন সঞ্জয় লীলা ভন্সালী, বিধুবিনোদ চোপড়া, শাহরুখ খান, অক্ষয় কুমার, অজয় দেবগনের মতো তাবড় তারকাদের সঙ্গে। ব্যস্ততার ফাঁকে আড্ডা জমালেন আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে।

Advertisement

প্রশ্ন: ইন্ডাস্ট্রিতে সাধারণত লোকে অভিনেতা হতে চান বা কেউ পরিচালক হতে চান। ‘ভিস্যুয়াল আর্টিস্ট’-এর পেশাটাকে বেছে নেওয়ার কারণ কী?

অনিকেত: কর্মজীবন শুরু কলকাতায়। কর্পোরেট সংস্থায়। ইচ্ছা ছিল স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি বানাব। তিনটে বানিয়েওছিলাম। নানা চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছে সেগুলো। তৈরি করতে গিয়ে বুঝি, আমার অনেক কিছু শেখার প্রয়োজন। সিনেমা তৈরির পড়াশোনা আমার ছিল না, ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক কারণে কোনও প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারিনি। আমি নিজের ছবির জন্য ‘স্টোরি বোর্ড’ তৈরি করা শুরু করি। সেটাই যে পরবর্তী কালে আমার পেশা হয়ে দাঁড়াবে, তা কখনও ভাবিনি।

প্রশ্ন: তা হলে তো রোজই হাতে-কলমে কাজ শিখছেন!

অনিকেত: অবশ্যই! আমি তো বলি, এখন আমার কলেজজীবন চলছে। বিভিন্ন তারকা পরিচালক আমার শিক্ষক, যাঁদের থেকে আমি সরাসরি, হাত-কলমে কাজ শিখতে পারছি। এতটা আমি হয়তো কোনও নামী প্রতিষ্ঠানে গেলেও শিখতে পারতাম না।

প্রশ্ন: সঞ্জয় লীলা ভন্সালী, রাজকুমার হিরানী, বিধু বিনোদ চোপড়ার মতো তারকা পরিচালকদের সান্নিধ্য পেয়েছেনশাহরুখ খান, অক্ষয় কুমার, দীপিকা পাড়ুকোন-সহ একাধিক তাবড় অভিনেতার সঙ্গেও কাজ করেছেন। এঁদের কোন চাবিকাঠি আপনার হাতে থাকে?

অনিকেত: যে কোনও ক্ষেত্রে আমার নান্দনিক বোধটা কাজে লেগে যায়, যাকে ইংরেজিতে বলে ‘এস্থেটিক সেন্স’। ধরুন, পরিচালক নিজের কল্পনায় একটি দৃশ্য ভেবেছেন। সেই দৃশ্যটি কাগজে-কলমে ফুটিয়ে তুলি আমি। সেই ছবিগুলিই ওই দৃশ্যের রেফারেন্স হিসাবে পৌঁছে যাবে সিনেমাটোগ্রাফি, ভিস্যুয়াল এফেক্টস, প্রোডাকশন ডিজ়াইন, কস্টিউমের মতো একাধিক টিমের কাছে। পরিচালকের কল্পনাকে রূপ দেওয়া আমার কাজ। পাতার পর পাতা এঁকে তৈরি করি স্টোরিবোর্ড, তাতেই ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে পরিচালকের কল্পনা।

প্রশ্ন: পরিচালকের কল্পনার চরিত্রও তো তা হলে আপনার আঁকাতেই প্রাণ পায়?

অনিকেত: হ্যাঁ। এমন বহু বড় বড় ছবি আছে, যেগুলির চরিত্রের গঠনে সাহায্য করেছি, যাকে বলে ‘ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট’। কোনও চরিত্রকে দেখতে কেমন হবে, তার পোশাক-পরিচ্ছদ কেমন হবে বা কোনও অ্যাকশন দৃশ্যে হয়তো কোনও চরিত্র প্রচণ্ড আহত হবে, তখন সেই চরিত্রকে কেমন দেখতে হবে— এগুলোও আমার আঁকায় ফুটে ওঠে।

‘পাঠান’ ছবির জন্য অনিকেতের কাজ।

‘পাঠান’ ছবির জন্য অনিকেতের কাজ। ছবি: অনিকেত মিত্র।

প্রশ্ন: কখনও আপনার আঁকার পরে কোনও নির্দিষ্ট চরিত্রের জন্য অভিনেতা নির্বাচিত হয়েছেন?

অনিকেত: অনেক ছবিতেই হয়েছে। নাম ধরে বলছি না। প্রযোজক, চ্যানেল বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাছে যখন আমাদের ‘ভিস্যুয়াল প্রেজ়েন্টেশন’ পৌঁছোয়, তখন সেই ছবি দেখে অনেক অভিনেতার সঙ্গে মিল পেয়েও তাঁদের কাস্ট করা হয়।

প্রশ্ন: কাজ বাছাই করেন কী ভাবে?

অনিকেত: দু’ভাবে কাজ হতে পারে। এক, প্রচণ্ড পেশাদার হয়ে। কাজ করলাম, টাকা নিলাম, বাড়ি চলে গেলাম। দ্বিতীয়, আমি মানুষ সঞ্চয় করায় বিশ্বাসী। তাই আগে যাঁকে কথা দিই, শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে থাকি। এমন অনেক তারকার সঙ্গে কাজের সুযোগ হাতছাড়া করেছি, যাঁদের নাম শুনলে লোকে হয়তো আমাকে উন্মাদ বলবে। মণিরত্নমের ‘পোনিয়িন সিলভান’-এর একটা দৃশ্যের ‘অন লোকেশন স্টোরিবোর্ড আর্টিস্ট’ হওয়ার ডাক পাই। দু’মাস ধরে তাইল্যান্ডের বিভিন্ন লোকেশনে ঘুরে মণি স্যারের সঙ্গে কাজের সুযোগে। যে কোনও শিল্পীর পক্ষে মাথাখারাপ করে দেওয়া সুযোগ। কিন্তু, আমি তত দিনে কথা দিয়ে ফেলেছিলাম চন্দ্রপ্রকাশ দ্বিবেদীকে। ‘পৃথ্বীরাজ’-এর কাজ মাঝপথে ফেলে চলে যেতে পারতাম না। যাইনি। বিনয়ের সঙ্গে সেটাই ওঁদের সরাসরি জানিয়েছিলাম। তাতে প্রশংসিতও হয়েছি।

প্রশ্ন: মধ্যবিত্ত ছাপোষা বাঙালি বাড়ির ছেলে। বড় বড় নামে়র সঙ্গে কাজ শুরুর সময় চিন্তা হয়নি?

অনিকেত: আমি আজও মধ্যবিত্ত ছাপোষাই। আমার সমাজমাধ্যমের পাতায় কোথাও কোনও পার্টি বা প্রিমিয়ার বা ঝাঁ-চকচকে ছবি পাবেন না। কিন্তু আমি সর্বত্র যাই। কিন্তু, ওই জীবনধারাকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলতে দিইনি। কখনও ভাবিনি যে, ‘ধর্মা’ বা ‘যশরাজ’-এ কাজ করে ফেলেছি, ছোটখাটো কারও সঙ্গে কাজ করব না। কাজটা কাজই।

প্রশ্ন: নামীদের সঙ্গে কোনও বিশেষ মুহূর্ত মনে রয়ে গিয়েছে?

অনিকেত: মনে রাখার মতো ঘটনা প্রচুর আছে। একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে। ‘পৃথ্বীরাজ’-এর সেটের। ছবিতে ঘোড়া নিয়ে একাধিক যুদ্ধের দৃশ্য আছে। ওরকমই একটা দৃশ্যের শটের সময়ে, একটি ঘোড়া খানিক বেসামাল হয়ে পড়ে। দৃশ্যটা হচ্ছে, সংযুক্তা তাঁর বান্ধবীদের নিয়ে পালাচ্ছেন। সেই অনুযায়ী, প্রত্যেক ঘোড়ার পিঠে দু’জন করে বসেছিলেন। পিছনে এক জন করে মহিলা ছিলেন, মূলত তাঁরা স্টান্ট-উওম্যান। শুটের মাঝে সেই ঘোড়া গিয়ে একটা স্তম্ভে সজোরে ধাক্কা মারে। পিছনের মেয়েটি ছিটকে পড়েন। দৃশ্যের মাঝে আচমকা অঘটন, বাকি ঘোড়াগুলো তখনও ছুটছে। মেয়েটি বীভৎস চোট পান। অক্ষয় ছিলেন একেবারে সামনের দিকের একটা ঘোড়ায়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঘোড়া ঘুরিয়ে ফেরত আসেন। শুটিং থামানো হয়। অক্ষয়ের দেহরক্ষীরা ছুটে আসেন, সেটের চিকিৎসকেরা ছুটে আসেন। সে দিন দেখেছিলাম, সেটের বাকিদের প্রতি, বিশেষত স্টান্টম্যানেদের প্রতি এক জন তারকার দায়বদ্ধতা। অক্ষয় এখনও নিজের স্টান্ট নিজেই করেন। আমাদের দেশের স্টান্টম্যানেদের জন্য তিনি অনেক কিছু করেছেন।

‘পৃথ্বীরাজ’ ছবির কলাকুশলীদের সঙ্গে শিল্পী।

‘পৃথ্বীরাজ’ ছবির কলাকুশলীদের সঙ্গে শিল্পী। ছবি: অনিকেত মিত্র।

প্রশ্ন: সুশান্ত সিংহ রাজপুতের শেষ ছবি ‘দিল বেচারা’য় কাজ করেছিলেন

অনিকেত: হ্যাঁ! ওই ছবি দিয়েই তো বলিউডে যাত্রা শুরু আমার। সেই হিসাবে দেখতে গেলে, সুশান্ত আমার প্রথম হিরো। কাস্টিং ডিরেক্টর মুকেশ ছাব়ড়ার মাধ্যমেই আমার মুম্বই যাওয়া এবং সুশান্তের সঙ্গে পরিচয়। স্বস্তিকাদি (মুখোপাধ্যায়) ছিলেন নায়িকার মায়ের চরিত্রে। ওঁর সঙ্গেও ওখানেই আলাপ। অন্যরকম অভিজ্ঞতা। ‘দিল বেচারা’ আমার কাছে আনন্দেরও, আবার বিষাদেরও। সত্যি বলছি, ছবিটা আমি আজ পর্যন্ত দেখে উঠতে পারিনি। সুশান্তের মৃত্যুটা এমন আকস্মিক যে, আমার আর নিজের প্রথম ছবির কাজ দেখার সাহসই হয়নি।

প্রশ্ন: মুকেশ ছাবড়া আপনাকে কী করে খুঁজে পেলেন?

অনিকেত: কলকাতায় চাকরির সময়ে মুম্বইয়ের এক চলচ্চিত্র উৎসবে শর্টফিল্ম প্রতিযোগিতায় গল্প পাঠাই। চূড়ান্ত পর্বে সুযোগ পায় সেই গল্প। মুম্বই গিয়ে ‘জুরি মেম্বার’দের সামনে সেই গল্প তুলে ধরতে হয়। সিনেমা নিয়ে জ্ঞান ছিল না। স্ত্রীর বুদ্ধিতে গোটা রাত হোটেলে বসে আমার গল্পটা আঁকি। পরের দিন সেই আঁকাই তুলে ধরি। কেউ কোনও প্রশ্ন করেননি আমাকে, পাতার পর পাতা শুধু ছবিগুলি দেখেছিলেন। আমার গল্প শীর্ষস্থান পেয়েছিল। সম্মাননীয় সদস্যদের মধ্যে মুকেশ ছাবড়া ছিলেন।

কর্পোরেটে কাজ করতে করতে বাইরের কাজ করতাম। সেটা সংস্থা ভাল চোখে দেখেনি। চাকরিটা চলে যায়। একেবারে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে। অজস্র প্রকাশনা সংস্থা, একাধিক প্রযোজনা সংস্থার দরজায় দরজায় ঘুরেছি চাকরির জন্য। সেই সময়ে একটা ফোন পাই ‘ফক্স স্টার স্টুডিয়ো’ থেকে। মুকেশজির থেকে নম্বর পান তাঁরা। বলা হয়, ‘মুকেশজি ‘কিজ়ি ঔর ম্যানি’ (পরবর্তী কালে ‘দিল বেচারা’) নামে একটি ছবি তৈরি করছেন। ওঁর খুব ইচ্ছা ছবিটা তুমি আঁকো।’ মুম্বইয়ের সফর সেই শুরু।

প্রশ্ন: মুম্বইয়ে শুরুপরে কখনও মনে হয়নি কলকাতায় কাজ করার কথা?

অনিকেত: আসলে এখন মনে হয়, কলকাতায় এত প্রতিভাবান মানুষজন আছেন। ওখানে কাজ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আরও একটা জিনিস, ছোটবেলায় অনেক সিনেমা-সিরিয়ালে যখন ‘ক্রেডিট্‌স’ দেখাত, অনেকের নামের সঙ্গে ‘বম্বে’ লেখা থাকত। তখন অবাক হতাম যে, বাকি কারও নামের সঙ্গে তো নদিয়া বা পুরুলিয়া লেখা নেই। এখন কারণটা খানিক বুঝি। ‘বম্বে’ তকমার আলাদা মাহাত্ম্য আছে মনে হয়। এখন প্রচুর কাজের প্রস্তাব পাই কলকাতা থেকে।

প্রশ্ন: বাংলা ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন?

অনিকেত: বেশির ভাগই তাই। বাংলার কয়েক জনকে আমি ‘না’ বলতে পারি না। তাঁর মধ্যে অন্যতম প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। আরও এক জন মীর আফসার আলি। এই মানুষগুলোকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করি। এমন কিছু মানুষের কাজ আমি করি।

প্রশ্ন: মুম্বই ও কলকাতার কাজের জগতের মধ্যে কতটা ফারাক?

অনিকেত: পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে কলকাতায়। আমার কাছে পারিশ্রমিকের থেকেও কথার দাম অনেক বেশি। আমি এখনও মানুষকে বিশ্বাস করতে ভালবাসি। কিন্তু, কলকাতার একাধিক প্রজেক্টে কাজ করতে গিয়ে এত তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে, যা বলার মতো নয়। সেই কারণে নিজেকে দূরেই রাখি। তার মানে এই নয় যে, কাজ করতে চাই না। হয়তো ভবিষ্যতে অন্য ধরনের মানুষ আসবেন, তাঁদের সঙ্গে কাজ করব।

প্রশ্ন: বেশ অল্প বয়সেই তো অনেকটা অর্জন করেছেনএর পরে কী?

অনিকেত: পরিচালক হওয়ার ইচ্ছা তো আছেই। পরবর্তী কালে ছবির প্রদর্শনী করতে চাই। যেখানে মানুষের কথা ফুটে উঠবে।

অনিকেত মিত্র।

অনিকেত মিত্র। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম, মূল ছবি: ফেসবুক।

প্রশ্ন: আপনার পেশায় যদি নতুন কেউ আসতে চায়, তা হলে কী ভাবে এগোতে হবে? কী ধরনের পড়াশোনা করতে হবে?

অনিকেত: প্রথমত রোজ ছবি আঁকাটাকে নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো নিয়ম করে ফেলতে হবে। আমি শত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রত্যেকদিন অন্তত একটা ছবি এঁকে, তবে ঘুমোতে যাই। এ ছাড়া চোখ-কান খোলা রাখাটাও জরুরি। শিল্পীর ভাবনা যদি সামাজিক ভাবে প্রাসঙ্গিক না হয়, তা হলে সেই শিল্পের কোনও মূল্য নেই। আজকাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে ভাবে এগোচ্ছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা শিল্পীর সঙ্গে নয়, যন্ত্রের সঙ্গে। এই লড়াইয়ের জন্য নিজেকে পড়াশোনা করতে হবে। এআই যেন শুধুমাত্র একটা ‘টুল’ হিসাবেই থাকে।

এখন পড়াশোনার পরিসর অনেক বে়ড়েছে। বরং আমি বলব, শুধুমাত্র কলেজের ভরসায় না থেকে ইন্টারনেটের সাহায্য নিতে। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে কেউ কিছু শিখতে চাইলে তা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। কলেজের শিক্ষার মূল্য অবশ্যই আছে, তবে তা না পেলে আমার জীবন শেষ— এই ভাবনা অবান্তর।

প্রশ্ন: এআই-এর বাড়বাড়ন্তে কতটা প্রভাবিত এই পেশা?

অনিকেত: একসময়ে প্রবল কটাক্ষের শিকার হয়েছিলাম। আমি নাকি সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আঁকি। কিন্তু, যাঁরা আমাকে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন, তাঁরা পাশে ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন উদ্‌যাপনের একটি ছবি এঁকেছিলাম বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পরে আঁকা ছবিটা — তখন এআই কোথায়? এখন অনেকে ওই কায়দায় ছবি আঁকেন। ফলে নিজের কল্পনাশক্তিতে শান দিলে এআই প্রভাব ফেলতে পারবে না। শিল্পের নিজস্ব একটা গতি আছে, যাকে কখনও কোনও প্রযুক্তি দিয়েই হারানো সম্ভব নয়।

শিল্পীর কল্পনায় সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন উদ্‌যাপন (বাঁ দিকে) ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পরে তাঁর অভিনীত চরিত্রেরা (ডান দিকে)।

শিল্পীর কল্পনায় সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন উদ্‌যাপন (বাঁ দিকে) ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পরে তাঁর অভিনীত চরিত্রেরা (ডান দিকে)। ছবি: অনিকেত মিত্র।

প্রশ্ন: ভবিষ্যতে কী কী কাজ আসতে চলেছে?

অনিকেত: চলতি বছর, ২৬ জানুয়ারির প্যারেডে ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের জন্য সঞ্জয় লীলা ভন্সালী একটি ট্যাবলো ডিজ়াইন করেছিলেন। তার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। অনন্ত অম্বানী ও রাধিকা মার্চেন্টের বিয়েতে ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ করেছিলাম। তার পরে ওই ধরনের প্রচুর কাজের প্রস্তাব এসেছে। সেগুলি এক এক করে মুক্তি পাচ্ছে। রণবীর কপূরের ‘রামায়ণ’ আসছে, ‘লভ অ্যান্ড ওয়র’ আসছে। প্রভাসের ‘ফৌজি’ বলে একটা বড় মাপের ছবি আসছে। একাধিক ওয়েব সিরিজ় আসছে। কিছু আন্তর্জাতিক স্তরের কাজও আছে।

প্রশ্ন: সঞ্জয় লীলা ভন্সালী কি সেটে সত্যিই খুব কড়া?

অনিকেত: সঞ্জয়জি অনেকটা স্কুলের অঙ্ক শিক্ষকের মতো। কড়া, পেশাদার। অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। যে কোনও ফ্রেম নিখুঁত করার চেষ্টা করেন। তার জন্য যেটুকু কঠোর হওয়া প্রয়োজন, সেটুকুই হন। আমার মনে হয়, ওটুকু হওয়াই উচিত।

প্রশ্ন: এমন কোনও পরিচালক যাঁর সঙ্গে কাজ করার জন্য উদগ্রীব?

অনিকেত: এমন এক চরিত্র আছে। তার নাম প্রদোষ চন্দ্র মিত্র। আমার খুব ইচ্ছা, তার একটা ছবির দুনিয়া নিজের হাতে আঁকব। এ ছা়ড়া বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসটি কল্পনায় ফুটিয়ে তুলতে চাই। আর একটা হচ্ছে, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’। জানি না কখনও সুযোগ পাব কি না।

Advertisement
আরও পড়ুন