রূপার প্রস্তাবে কী প্রতিক্রিয়া সোহিনী, সুজনের? ছবি: সংগৃহীত।
রাজ্যে ঘটেছে পালাবদল, এ বার কি পালা বদলাবে বিনোদন দুনিয়ার? প্রশ্নটা গত দেড় মাসে বহু বার উঠেছে। কারণ তৃণমূলের মতো বিজেপিও সংস্কৃতি জগতের বহু মানুষকে বিধায়ক করেছে। তবে, তাঁদের বেশির ভাগকেই দেখা যায়নি মন্ত্রিসভায়।
এরই মধ্যে বুধবার সিদ্ধান্ত হয়েছে, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, পাপিয়া অধিকারী, রুদ্রনীল ঘোষ, হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে গড়া হবে এক উপদেষ্টামণ্ডলী। সঙ্গে থাকবেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, যিশু সেনগুপ্ত থেকে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের মতো অরাজনৈতিক অভিনেতা-পরিচালকেরাও। শিল্পী-কলাকুশলীদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ কি এ বার প্রশমিত হবে?
আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার আনন্দবাজার ডট কম-কে বিজেপি বিধায়ক রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “নাট্যদলগুলির প্রেক্ষাগৃহ পাওয়া নিয়ে কোনও স্বচ্ছতা ছিল না এত দিন। নেতা মন্ত্রীদের ধরে সবাইকে বুকিং করতে হত। এক জন অনুষ্ঠান করতে চান। কিন্তু কোথায় করবেন তা জানেন না। তখন নেতাকে ধরতে হত। এটা তো সুস্থ পরিবেশ নয়।” এরই বিপরীতে হাঁটতে চাইছে বিজেপি সরকার, দাবি রূপার। তিনি জানান, একছাতার তলায় অনেকগুলি কমিটি রাখা হবে। তার মধ্যে কোনও কমিটি দেখবে চলচ্চিত্র উৎসব, কোনও সংগঠন দায়িত্ব নেবে প্রেক্ষাগৃহের। আর স্বচ্ছ ভাবে এই সব কিছু পরিচালনার জন্য একটি ওয়েবসাইট থাকবে। সেখানে সব নথি রাখা হবে।
শুধু তা-ই নয়, একটি বিশেষ অ্যাপের চিন্তাভাবনাও করা হচ্ছে বলে জানান রূপা। সিনেমা বা থিয়েটার দেখার জন্য সেই অ্যাপ ব্যবহার করা যাবে। কোথায়, কত টাকায়, কোন ছবি বা নাটক দেখা যাবে— সে সব তথ্য পেয়ে যাবেন দর্শক।
গত ১৫ বছরে, তৃণমূলের শাসনে নাট্যদলগুলি বার বার অভিযোগ তুলেছে স্বজনপোষণের। সরকারি প্রেক্ষাগৃহে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল তাবড় নাট্য পরিচালক-অভিনেতার। সেই ক্ষোভ চূড়ান্ত আকার নেয় ২০২৪-এ আরজি কর-কাণ্ডের প্রতিবাদে। পথে নেমে প্রতিবাদ করায় বহু দলকে কার্যত ‘নিষিদ্ধ’ করে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। ‘চেতনা’র তরফে অভিনেত্রী নিবেদিতা মুখোপাধ্যায় সমাজমাধ্যমে জানিয়েছিলেন তিনি আর মঞ্চে অভিনয় করবেন না।
‘নান্দীকার’-এর সোহিনী কী বললেন? ছবি: সংগৃহীত।
‘চেতনা’ বা নিবেদিতা এক নন। রাজ্য জুড়ে ছোট-বড় বহু নাট্যসংস্থাই সরকারি প্রেক্ষাগৃহে সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ তোলে। এ প্রসঙ্গে রূপা বললেন, “নেতানির্ভর ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হবে। ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে যে কোনও সংগঠন দেখতে পারবে কবে, কোন সময়ে সরকারি প্রেক্ষাগৃহ ফাঁকা রয়েছে। স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ হবে।” তবে তিনি জানিয়েছেন, এ সব কাজ রাতারাতি শুরু করা সম্ভব নয়। মাস তিনেক সময় লাগতে পারে।
রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে খানিকটা স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন ‘নান্দীকার’-এর সোহিনী সেনগুপ্ত। তিনি বললেন, “এমন একটি ওয়েবসাইট বা অ্যাপ তৈরি হলে ভালই হবে। প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হবে বলেই আমার আশা। আমরা নিজেরা ভুক্তভোগী। নান্দীকার তো ভাল নাটকই করে। অথচ, সেই নাটক প্রদর্শন করতে কত সমস্যায় পড়তে হয়, তিন মাসে একটা তারিখ হয়তো পাওয়া যায় কলকাতার সরকারি প্রেক্ষাগৃহে।” তাঁর দাবি, যাঁরা উৎকৃষ্ট মানের নাটক তৈরি করেন, প্রদর্শন করেন, তাঁদের কথা সরকারেরই ভাবা উচিত। কারণ উৎকৃষ্ট শিল্পের জন্য পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন হয়। তাই নতুন পদ্ধতিতে আখেরে বাংলা থিয়েটারের উন্নতি হবে বলেই সোহিনীর আশা।
নতুন ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন কৌশিক সেন? ছবি: সংগৃহীত।
রূপার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে নাট্যকর্মী ও ‘স্বপ্নসন্ধানী’ নাট্যদলের কর্ণধার কৌশিক সেন বলেছেন, ‘‘এটা হলে তো খুব ভাল হয়। তবে এই যে হল পাওয়া ক্ষেত্রে সমস্যা, এটা অনেক দিনের। ২০১২ সালে আমরা যখন প্রথম ‘ম্যাকবেথ’ মঞ্চস্থ হওয়ার পরে আমরা এই সমস্যার সম্মুখীন হই। তখন সবে তৃণমূল সরকার এসেছে। ওই নাটকে সরকার-বিরোধী কিছু ইঙ্গিত ছিল। ওই সময় টানা দু’বছর সরকারি হল পেতে ‘স্বপ্নসন্ধানী’র কালঘাম ছুটে গিয়েছিল। এটার পিছনে যে তৃণমূল সরকারই দায়ী, সেটা সবাই বলবে। কিন্তু তখন আমরা হল পাব কি পাব না, তা নিয়ে ওই শাসক দলটির হার্ডকোর রাজনীতি করা নেতাদের যত না মাথাব্যথা ছিল, তার চেয়ে বেশি হাত ছিল আমাদের নাট্যজগতেরই বন্ধুদের। ‘নাট্যস্বজন’ নামে একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছিল তখন, তৃণমূলের ছত্রছায়াতেই। কিন্তু সেই নাট্যবন্ধুরাই ‘স্বপ্নসন্ধানী’র হল পাওয়ায় বাধা দিয়েছিলেন। নোংরা রাজনীতিটা আমাদের পেশার দুনিয়াতেই আছে। সেটা সাফ হওয়া দরকার।’’
আদৌ কি কোনও সুরাহা হবে? কী মত সুজনের? ছবি: সংগৃহীত।
যদিও সোহিনীর মতো আশাবাদী হতে পারছেন না ‘চেতনা’র সুজন মুখোপাধ্যায়। তিনি মনে করেন, অ্যাপ বা ওয়েবসাইট তৈরি হতেই পারে। কিন্তু একটা কমিটি থাকা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে তাঁর আক্ষেপ, আজও গড়া যায়নি নাট্য অ্যাকাডেমি। প্রেক্ষাগৃহ পাওয়ার জন্য একটা ‘ডেট’ কমিটি রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন সুজন। যেখানে শুধু রাজনীতিকেরা নন, থাকবেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাঁর কথায়, “এই কমিটির সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গিই আসল। অ্যাপ হতেই পারে। আগের সরকার লিখিত ভাবে অনুমতি দিত, হয়তো ভবিষ্যতে তা ডিজিট্যালি পাওয়া হবে। কিন্তু অ্যাপেও যে স্বচ্ছতা থাকবে, তা কি এতটা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়? দিনের শেষে সেই অ্যাপের নেপথ্যেও তো থাকবেন কোনও সদস্য। তারিখ তো তাঁরাই দেবেন।”
বিজেপির আর এক বিধায়ক অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ বলেন, “রাতারাতি কিছু করা সম্ভব নয়। আজ বললেই কাল অ্যাপ তৈরি করা সম্ভব নয়। প্রস্তাব এসেছে, আরও কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। আর কী কী যুক্ত করা যেতে পারে, তা ভেবে দেখা হবে।” তবে তাঁর আশ্বাস, নাটক, যাত্রা, সঙ্গীত বা যে কোনও কারণেই প্রেক্ষাগৃহ পাওয়া যাবে। কোনও সংগঠন বা ব্যক্তি সহজে বেছে নিতে পারবেন, এমন পদ্ধতির কথা ভাবা হয়েছে। তিনি বলেন, “আসলে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। এত বছর যন্ত্রণায় ছিলেন তাঁরা। এখন যা হবে তা সুষ্ঠু ভাবে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে করা হবে।”