‘অদম্য’কে ছড়িয়ে দিতে গ্রামে গ্রামে পরিচালক রঞ্জন ঘোষ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
পরিচালক রঞ্জন ঘোষ কি আধুনিক ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য’ হওয়ার চেষ্টায়? তাঁর ‘অদম্য’ ছবির পটভূমিকায় কবির ‘দেশলাই কাঠি’ কবিতা। ১৩ ফেব্রুয়ারি ছবিমুক্তি। তার আগেই তিনি ছবি নিয়ে গ্রামগঞ্জে পৌঁছে যাচ্ছেন! কেন? আনন্দবাজার ডট কম-কে পরিচালকের সাফ জবাব, “আমার ছবিকে যাতে ‘নিস ছবি’ বলে আটকে দেওয়া না হয়, তার জন্য।” রসিকতাও করেছেন, “আমি ছবির মতোই অদম্য।”
ছবি নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিচালকদের ছড়িয়ে পড়া নতুন নয়। এর আগেও স্বাধীন পরিচালকেরা তাঁদের ছবি নিয়ে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছেন। পরিচালক গৌতম ঘোষ যেমন প্রেক্ষাগৃহে সগৌরবে চলার পরেও তাঁর ‘মা ভূমি’ ছবি নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন দক্ষিণ ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে। সম্প্রতি, ‘নধরের ভেলা’ ছবি নিয়ে একই পথে হাঁটলেন পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। এ বার রঞ্জনও...! কথাশেষের আগেই পরিচালক বলে উঠলেন, “প্রদীপ্তদাকে অনুসরণ করিনি। গেরিলা পদ্ধতিতে ছবি বানিয়েছি। গেরিলা পদ্ধতিতেই দর্শকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করছি। গ্রামবাসীরা কিন্তু এই পদ্ধতি পছন্দ করছেন।” উজ্জীবিত এই প্রজন্মের পরিচালকেরাও। তাঁরা বিস্মিত, স্বাধীনভাবে ছবি বানিয়ে এ ভাবেও দর্শকের কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়! তাঁরাও আগামী দিনে হয়তো এ ভাবেই এগিয়ে যাবেন।
এই প্রথম কোনও ছবি নিবেদন করলেন অপর্ণা সেন। রঞ্জনের এই ভাবনা প্রশংসা কুড়িয়েছে সৃজিত মুখোপাধ্যায়-সহ বহু খ্যাতনামী পরিচালকের।
বিশেষ পদক্ষেপের সপক্ষে রঞ্জনের আরও যুক্তি, “দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে। এ দিকে, তথাকথিত তারকাখচিত নয় এ ছবি। প্রান্তজনদের নিয়ে লেখা। তাঁরাই যদি সেই ছবি দেখতে না পারলেন,তা হলে কী হল?” পরিচালক তাই সদ্য ছবি নিয়ে ঘুরে এলেন সুন্দরবনের কাকদ্বীপে। “ওখানকার একটি কলেজে ছবি দেখালাম। সাদা পর্দা, বাঁশের কাঠামো ছাত্রেরাই জোগাড় করেছিল। ‘অদম্য’ দেখে কী খুশি সবাই!” এখানেই শেষ নয়। ছবির ট্রেলার আর গান নিয়ে একই ভাবে প্রথম থেকে পরিচালক কড়া নেড়েছেন শহুরে দর্শকের দরজায়। সঙ্গী ছবির নতুন নায়ক আরিয়ুন ঘোষ। কখনও শ্যামবাজার পাঁচমাথা, তো কখনও গড়িয়াহাট! আবার কলেজ স্ট্রিট থেকে সোজা বরাহনগর। রঞ্জনের ক্লান্তি ছিল না। “দর্শক আমাদের এই উদ্যমকে উৎসাহিত করেছেন। জানিয়েছেন, এই অভিনব পদ্ধতি তাঁদের ছুঁয়ে গিয়েছে।” তাঁর মতে, এই ছবির জন্য এই ধরনের প্রচারই দরকার ছিল।
কিন্তু টলিউডের অন্দরে যে অন্য কথা! নিন্দকদের দাবি, রঞ্জনের ‘অদম্য’ ছবিটি ‘গুপি শুটিং’ করে তৈরি। তাই বরাবর মাল্টিপ্লেক্সে যাঁর ছবি চলে, তিনি লুকিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় ছবি দেখাচ্ছেন।
বক্তব্য শুনে হেসে ফেলেছেন পরিচালক। ফের রসিকতা করেছেন, “‘গুপি ছবি’ কাকে বলে? আমি তো জানি না! সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ‘অদম্য’ কিন্তু ‘গুপি ছবি’র ঠাকুরদা।” রঞ্জন এই বক্তব্যের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। বলেছেন, “ছবিতে হাতেগোনা অভিনেতা। কোনও লাইট বা বড় ক্যামেরা ব্যবহার করিনি। ফলে, ট্রলি, রূপসজ্জাশিল্পী— কিছুই প্রয়োজন পড়েনি। চার মাস আরিয়ুন-সহ আমরা ছ’জন সুন্দরবনের কাকদ্বীপে ছিলাম। সেখানেই শুটিং হয়েছে।” ছবিতে মঞ্চের সেঁজুতি মুখোপাধ্যায় অতিথিশিল্পী। ছবিটি আদ্যন্ত রাজনৈতিকমনস্ক। নির্বিচারে অরণ্য এবং প্রাণিসম্পদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কথা বলবে।
এ ভাবে কত দর্শকের কাছে পৌঁছোনো সম্ভব? ব্যবসাই বা কী হবে?
কারণ, গ্রামে বিনামূল্যে পর্দা টাঙিয়ে ছবি দেখালে তো খরচের টাকা উঠে আসবে না। রঞ্জনের যুক্তি, “ওই জন্যই ফেব্রুয়ারিতে শহরের প্রেক্ষাগৃহে ছবিমুক্তি। পাশাপাশি, শহরতলি, গ্রামগুলিতেও দেখাব। থিয়েটারহল ভাড়া করা হলে টিকিটের ব্যবস্থা রাখব।” আশা করছেন, “এ ভাবে ছড়িয়ে যেতে পারলে, আগামী দিনে ভাল ছবির দর্শক টানতে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। হয়তো এটাই হয়ে উঠবে ‘ভাল ছবি’ দেখানোর বিকল্প পথ।”