Sports Scenario in West Bengal

টাকা নেই, পরিকাঠামো নেই, সদিচ্ছা নেই! ‘খেলা হবে’-র রাজ্যে নেই খেলা, ময়দানে উঠে আসছে না নতুন সৌরভ

কেউ বলছেন পরিকাঠামোর অভাব, কেউ বলছেন অর্থের অভাব, কারও কাছে অভাব সদিচ্ছার। অভাবের সংসারে তাই সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, লিয়েন্ডার পেজের পর আর কোনও আন্তর্জাতিক তারকা উঠে আসেননি।

Advertisement
অনির্বাণ মজুমদার
অনির্বাণ মজুমদার
শেষ আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ২১:০৭
Current situation of Sports in West Bengal

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

উঠতি খেলোয়াড়দের নিয়ে কলকাতায় প্রতিযোগিতা করতে চেয়ে পারেননি। মাস কয়েক আগে ভারতীয় টেনিস দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সকাতরে বলছিলেন, নানা দরজায় ঘুরে এত অপমানিত হতে হয়েছিল যে, তা আর মনেই রাখতে চান না।

Advertisement

শুধু অপমানই মনে রাখতে চাইছেন না, তা নয়। তিনি যে এ রাজ্য থেকে দেশের অধিনায়কত্ব করেছিলেন, সেটাও ভুলে যেতে চান! খেলাধুলোর ক্ষেত্রে এটাই পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক ছবি। কেউ বলছেন পরিকাঠামোর অভাব, কেউ বলছেন অর্থের অভাব, কারও কাছে অভাব সদিচ্ছার। এমত অভাবের সংসারে তাই সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, লিয়েন্ডার পেজের পর আর কোনও আন্তর্জাতিক তারকা উঠে আসেননি।

পরিকাঠামো নেই

ময়দানে কান পাতলেই শোনা যায়, যেটুকু পরিকাঠামো ছিল, তা-ও ক্রমশ উবে যাচ্ছে। রাজ্য অ্যাথলেটিক্সের সঙ্গে জড়িত এক কর্তার বক্তব্য, ‘‘এখন তো আর ভোরবেলা রেড রোডে দৌড়লেই অলিম্পিক্স বা এশিয়ান গেমসে যাওয়া যায় না! চাই বিজ্ঞানসম্মত অনুশীলন এবং তার ব্যবস্থা। অন্য দেশ তো দূরের কথা, বিহার-ওড়িশার মতো রাজ্যগুলোও পরিকাঠামো আমূল বদলে ফেলেছে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সিন্থেটিক ট্র্যাকে একটা সময়ে চাইলেই অনুশীলন করা যেত। এখন আর সেখানে অবারিত দ্বার নয়। অনুমতি পেতে পেতে খেলা থেকে অবসর নেওয়ার সময় চলে আসে।’’ অন্য এক কর্তা জানাচ্ছেন, কলকাতার বাইরে অন্য জেলা থেকে যাঁরা যুবভারতীতে অনুশীলনের সুযোগ পান, তাঁদের কাছে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় বাসস্থান। আগে স্টেডিয়ামের গ্যালারির নীচের ঘরগুলিতে থাকার ব্যবস্থা করা হত। এখন সেই সুযোগ নেই। ঘরগুলি তালাবন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে।

বুলা চৌধুরি-আরতি সাহারা কেউ গঙ্গায়, কেউ পুকুরে সাঁতার কেটে বড় হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য পেয়েছেন। স্বাভাবিক ভাবেই ২০২৬ সালে তা সম্ভব নয়। কিন্তু রাজ্য সাঁতার সংস্থার এক প্রাক্তন কর্তা জানাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক্স সংস্থা অনুমোদিত একটিও সুইমিং পুল এ রাজ্যে নেই। সেই কারণেই প্রচুর টাকা খরচ করে সৌবৃতি মণ্ডলের মতো সাঁতারুকে অন্য রাজ্যে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। ১৯৭৬ সাল থেকে বিশ্ব হকি সংস্থা অ্যাস্ট্রোটার্ফে খেলা বাধ্যতামূলক করেছে। এ রাজ্যে অ্যাস্ট্রোটার্ফ বসতে লেগে গিয়েছে ৫০ বছর।

অর্থ নেই

সৌবৃতির মতো অ্যাথলিট যা পারেন, তা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। ভিন্‌ রাজ্যে গিয়ে অনুশীলন করার সামর্থ্য আছে হাতেগোনা কয়েক জনের। তাঁদের মধ্যে এক খেলোয়াড় বললেন, তিনি শুরুতে টাকা জোগাড় করে অন্য রাজ্যে অনুশীলন করতেন। বছর খানেকের মধ্যে তিনি সেই রাজ্যেই নাম লেখান। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘এখানে (পশ্চিমবঙ্গে) কেন পড়ে থাকব? যদি অনুশীলন করার জন্য সারা বছর অন্য রাজ্যেই থাকতে হয়, তা হলে তো সেই রাজ্যের হয়ে জাতীয় স্তরে প্রতিনিধিত্ব করাই ভাল। দরকারের সময় তারাই তো দেখেছে।’’

দাবায় এখন দক্ষিণ ভারতের রাজত্ব। গুকেশ-প্রজ্ঞানন্দেরা বিশ্বমঞ্চে কাঁপাচ্ছেন। ম্যাগনাস কার্লসেনদের হারিয়ে দিচ্ছেন। অথচ, গুকেশ-প্রজ্ঞাদের একটা সময়ে হারিয়ে দেওয়া এই রাজ্যের আরণ্যক ঘোষ-মিত্রাভ গুহ-দীপ্তায়ন ঘোষেরা হারিয়ে গিয়েছেন। এখানকার দাবাড়ু থেকে কর্তা সকলেই একমত, দক্ষিণের রাজ্যগুলি দাবার জন্য যা করে, তার ছিটেফোঁটাও এ রাজ্যে নেই। প্রতিভাবান এক দাবাড়ুর বাবার কথায়, ‘‘বার বার রাজ্য সরকারের কাছে আর্থিক সাহায্যের আবেদন করেছি। কোনও ফল হয়নি।’’

বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির অনিচ্ছা

বার বার উঠে এসেছে পড়শি রাজ্য বিহার, ওড়িশার উদাহরণ। সেখানে রাজ্য সরকার যেমন সরাসরি খেলোয়াড়দের সাহায্য করে, তেমনই আর্থিক সামর্থ্য থাকা বেসরকারি সংস্থাগুলিকে ‘বাধ্য’ করা হয় খেলায় বিনিয়োগ করতে। ওড়িশা সরকার তো ভারতীয় হকি দলকেই স্পনসর করে। পাশাপাশি, সরকারের নির্দেশ বা অনুরোধে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থাও টাকা ঢালে। পশ্চিমবঙ্গের এক ক্রীড়া প্রশাসকের আক্ষেপ, ‘‘এখানে ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহমেডানের মতো ক্লাবগুলোর জন্য বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসেন। কোটি কোটি টাকা ঢালেন। কিন্তু সেখানে ক’জন বাঙালি খেলেন? শুভাশিস বসু ছাড়া আর একজন বাঙালিও ভারতীয় ফুটবলের মূল স্রোতে আছেন?’’

ওই কর্মকর্তাই ১৫-১৬ বছর আগের উদাহরণ দিয়ে জানালেন, অলিম্পিক্সে অংশগ্রহণকারী এক মহিলা অ্যাথলিটের তখন বিদেশে অনুশীলন করার জন্য ২৫ হাজার টাকা দরকার পড়েছিল। কলকাতার এক অবাঙালি শিল্পপতি এক কথায় তাঁকে আড়াই লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজ্যের অ্যাথলেটিক্স মহল বলছে, সেটা ‘ব্যতিক্রম’। তার পরে এ রাজ্যের কোনও শিল্পোদ্যোগী এমন উদ্যোগ নিয়েছেন কি না, কেউ মনে করতে পারছেন না।

দফতরহীন ক্রীড়া সংস্থা

রাজ্যে অধিকাংশ খেলার নিয়ামক সংস্থার কোনও স্থায়ী দফতরই নেই। বিভিন্ন বড় ক্লাবের দয়াদাক্ষিণ্যে তারা দফতর চালানোর জায়গা পায়। বড় ক্লাবের দরকার পড়লে সেই ঘরও ছেড়ে দিতে হয়। একটা সময়ে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে সব খেলারই স্থায়ী দফতর ছিল। কিন্তু এখন সেগুলি ‘অন্য কাজে’ ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুর উদাহরণ দিয়ে অ্যাথলেটিক্সের এক কর্তার বক্তব্য, ‘‘সেখানে নেহরু স্টেডিয়ামে সব খেলার আলাদা দফতর আছে। এক ছাদের তলায় সকলে কাজ করছে। উন্নতি এমনিই হয় না। শুধু ক্রিকেটের কথা ভাবলে চলবে?’’

দ্বিতীয় সৌরভ হল না কেন?

শুধু ক্রিকেটের কথা ভাবলে এ রাজ্য থেকে দ্বিতীয় এক জন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও পাওয়া যায়নি। ঋদ্ধিমান সাহা ধারাবাহিক ভাবে টেস্ট খেললেও সেই ‘দাপট’ দেখাতে পারেননি। বাঙালি না হলেও তবু মহম্মদ শামি, মুকেশ কুমার, আকাশদীপেরা এই রাজ্য থেকে ভারতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু এখন তাঁদের জায়গাও নড়বড়ে। এর একটা ব্যাখ্যা আছে অনুষ্টুপ মজুমদারের কাছে। বাংলার রঞ্জি দলের প্রাক্তন অধিনায়ক বললেন, ‘‘এখন ক্রিকেটের সিস্টেমটা বদলে গিয়েছে। আগে দু’-তিন বছর রঞ্জিতে ধারাবাহিক ভাবে ভাল খেললেই ভারতীয় দলে সুযোগ পাওয়া যেত। এখন টি-টোয়েন্টির যুগ। আইপিএলের যুগ। আইপিএলে ভাল খেললেই জাতীয় দলের দরজা খুলে যায়। যার এক নম্বর উদাহরণ জসপ্রীত বুমরাহ। বৈভব সূর্যবংশীও কিছুদিনের মধ্যেই ভারতীয় দলে খেলে ফেলবে।’’

পশ্চিমবঙ্গ থেকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটার উঠছে না কেন? অনুষ্টুপের বক্তব্য, ‘‘বেঙ্গল প্রিমিয়ার লিগ (সিএবি-র টি-টোয়েন্টি লিগ) খারাপ হচ্ছে না। কিন্তু অন্য রাজ্যের লিগগুলোর তুলনায় এখানে রান কম হচ্ছে। আমাদের ক্রিকেটারেরা সেখানেই মার খেয়ে যাচ্ছে।’’ তা হলে উপায়? অনুষ্টুপ বলছেন, ‘‘যদি আরও টি-টোয়েন্টি লিগ বাড়ানো যায়, তা হলে একটা সুরাহা হতে পারে। না হলে কিন্তু আমাদের ক্রিকেটারদের জায়গা সত্যিই কমে যাচ্ছে।’’ ক্রিকেটও ভুগছে সেই পরিকাঠামোর অভাবেই!

Post: খেলা হবে?

Advertisement
আরও পড়ুন