হাড়ের বিরল ক্যানসার, ছড়িয়ে পড়লে চলে যেতে পারে দৃষ্টিও। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ক্যানসার শরীরের নানা জায়গাতেই হয়। তবে হাড়ের ক্যানসার বেশ বিরল। সহজে শোনা যায় না এর কথা। পৃথিবীতে যত রকম ক্যানসার ধরা পড়েছে, তার মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ হল হাড়ের ক্যানসার। আর এই রোগ ধরাও পড়ে দেরিতে। কারণ বেশির ভাগ মানুষই বুঝতে পারেন না, হাড়ের যন্ত্রণা ঠিক কী কারণে হচ্ছে। হাড়েও যে ক্যানসার হতে পারে, তা নিয়ে ধারণা কম সংখ্যক মানুষেরই আছে। হাড়ের ক্যানসারের মধ্যে অস্টিয়োসারকোমার নাম মাঝেমধ্যে শোনা যায়। অস্থিসন্ধিতে হয় এই ধরনের ক্যানসার। তবে কর্ডোমার নাম শোনা যায় না তেমন ভাবে। হাড়ের অত্যন্ত বিরল এক ধরনের ক্যানসার হল কর্ডোমা।
শরীরের কাঠামো ধরে রাখে মেরুদণ্ড। তাতেই বাসা বাঁধে কর্ডোমা। খুলির ঠিক নীচ থেকে ছড়াতে শুরু করে। ধীরে ধীরে গোটা মেরুদণ্ডকেই কব্জা করে ফেলে ক্যানসার কোষ। মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। ফলে মেরুদণ্ড দুর্বল হয়, সামান্য আঘাতেই মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যেতে পারে। কর্ডোমা হলে রোগীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি বহু গুণে বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে স্নায়বিক রোগও দেখা দিতে থাকে। কর্ডোমাকে জটিল স্নায়বিক ব্যাধির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন অনেকে। তবে এই ধরনের ক্যানসার শুধু রোগীকে চলচ্ছক্তিহীন করে দেয় না, শরীরের আরও অনেক অঙ্গকেও বিকল করে দিতে থাকে। এই ক্যানসার বিরল। বিশ্বে ১০ লক্ষ জনের মধ্যে হয়তো এক জনের হয় এই রোগ।
কর্ডোমা কেন বিপজ্জনক?
শিশু যখন মায়ের গর্ভে ভ্রূণ অবস্থায় থাকে, তখন পিঠের দিকে নোটোকর্ড নামক এক নমনীয় দণ্ড তৈরি হয়। এই নোটোকর্ডই পরবর্তীতে শিশুর মেরুদণ্ড তৈরি করে। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই এই নোটোকর্ডের কোষগুলি বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং সেখানে শক্তপোক্ত মেরুদণ্ডের কাঠামো তৈরি হয়। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের একটি গবেষণাপত্র আছে কর্ডোমা নিয়ে। সেখানে গবেষকেরা জানিয়েছন, নোটোকর্ডের কোষ বিলুপ্ত হলেও কিছু থেকে যায় খুলির নীচের অংশে। অজ্ঞাত কোনও কারণে সেই কোষগুলিরই অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন শুরু হতে পারে ভবিষ্যতে। যদি সেগুলি ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন তা ক্যানসারের রূপ নেয়। এটিই হল কর্ডোমা।
হাড়ের এই ক্যানসার সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এর লক্ষণ কোনও ভাবেই বোঝা যায় না আগে থেকে। সাধারণ ব্যথাবেদনা বলেই ভ্রম হয়। কর্ডোমা মেরুদণ্ডের একেবারে নীচের অংশে অর্থাৎ, কোমরের কিছুটা নীচে হতে পারে, আবার খুলির নীচ থেকে পিঠের মাঝ বরাবরও হতে পারে। অনেক সময়ে ঘাড়ের কাছেও বাসা বাঁধে ক্যানসার। ফলে স্পন্ডিলাইটিসের মতো লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। মাথা ঘোরা, ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা, তীব্র মাথা যন্ত্রণা শুরু হয় রোগীর।
কর্ডোমা কেবল ঘাড় বা পিঠেই হয়, অনেক সময়ে মস্তিষ্কেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মুখমণ্ডলের পেশি অবশ হতে থাকে। এর থেকে ফেশিয়াল প্যারালাইসিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, আবার দৃষ্টিশক্তিও ঝাপসা হতে শুরু করে। এ সব লক্ষণকে হাড়ের ক্যানসার বলে বোঝা যায় না একেবারেই। অনেকে ভাবেন পিঠ বা কোমরের ব্যথা, কেউ মনে করেন মাইগ্রেনের যন্ত্রণা। তাই ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে সমস্যা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। তাই চিকিৎসা শুরু হতে ও রোগটিকে যথাযথ ভাবে নির্ণয় করতে অনেক সময় লেগে যায়।
চিকিৎসা খুবই জটিল
কর্ডোমার চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল। রোগটি যেহেতু বিরল, তাই এর নির্ধারিত কোনও চিকিৎসাপদ্ধতি নেই। রোগটি কোথায় হচ্ছে, কেমন লক্ষণ দেখা দিচ্ছে, তা বুঝেই চিকিৎসা হয়। কেবল স্নায়ুরোগ চিকিৎসক নন, অস্থি চিকিৎসক, ক্যানসারের চিকিৎসক ও রেডিয়েশন স্পেশ্যালিস্টের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। ক্যানসার মেরুদণ্ডের উপরের অংশে হলে তার অস্ত্রোপচার করা হয়। খুবই সন্তর্পণে সুস্থ কোষ বাঁচিয়ে টিউমার বার করা হয়। সেই সঙ্গে রেডিয়েশন থেরাপিও চলে। তবে কর্ডোমা এক বার হলে বার বার ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে।