বীজচক্র কি ঋতুস্রাবের কষ্ট কমাতে পারে? কী এর লক্ষ্য? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ঋতুস্রাবের সময় শুধু নয়, অনেকেরই অস্বস্তি শুরু হয় কয়েকটি দিন আগে থেকে। কোমরের নিম্নাংশে, স্তনেও ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা যায়। কারও মুখে ব্রণও হয়। তা ছাড়া ঋতুস্রাবের দিনগুলিতে মেজাজে বদল, তলপেটে, ঊরুতে যন্ত্রণা তো আছেই।
ঋতুস্রাব শুরুর কয়েকটি দিন আগে থেকেই স্ত্রী হরমোন ইস্ট্রোজেন আর প্রোজেস্টেরনের তারতম্য ঘটতে থাকে। সে কারণেই এমন উপসর্গ দেখা দিতে থাকে। এই সময়ে হরমোনের মাত্রার যে হেরফের হয় শরীরে, তা নিয়ন্ত্রণেই তৈরি বীজচক্র। ঋতুচক্রের কোন পর্যায়ে কী ভাবে, কোন বীজ খেলে হরমোনের ভারসাম্য রক্ষিত হবে, তাই বলা হয়েছে বীজচক্রে।
তিসি, চিয়া, কুমড়ো, সূর্যমুখী, তিল— নানা বীজের নানা রকম পুষ্টিগুণ। খনিজে সমৃদ্ধ বীজগুলির কাজও ভিন্ন। পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিকের কথায়, ‘‘ বীজচক্রের মাধ্যমে শরীরে হরমোনের ভারসাম্য ঠিক রাখার চেষ্টা করা হয়। ঋতুচক্রের শুরুতে চলে ফলিকিউলার ফেজ় (১-১৪ দিন), পরের ১৪ দিন থাকে লুটিয়াল ফেজ়। এই দুই পর্বে হরমোনের মাত্রা ঠিক রাখতে কোন কোন বীজ খাওয়া দরকার, তাই বলা হয়েছে এতে।’’
কী ভাবে কাজ করে বীজচক্র?
ফলিকিউলার ফেজ় (ডিম্বাশয়ে ফলিকল তৈরি থেকে ডিম্বস্ফোটন পর্যন্ত) বা ঋতুচক্রের প্রথম ১৪ দিনের ডায়েটে রাখা ভাল কুমড়ো এবং তিসির বীজ। অনন্যা জানাচ্ছেন, কুমড়ো এবং তিসি বীজে ফাইটোইস্ট্রোজেন এবং ম্যাগনেশিয়াম মেলে, যা ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। পরের পর্ব অর্থাৎ লুটিয়াল ফেজ় চলাকালে খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে তিল এবং সূর্যমুখীর বীজ। এই দুই বীজ প্রোজেস্টেরন উৎপাদনে সহায়ক।
হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় কী ভাবে কাজ করে বীজ?
তিসি বীজে রয়েছে লিগন্যান্স, যা ইস্ট্রোজেনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। প্রোজেস্টেরনের তুলনায় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা অনেকটা বেড়ে গেলে নানা রকম সমস্যা হয়। তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে বীজচক্র। অন্য দিকে, সূর্যমুখী এবং তিলে মেলে জ়িঙ্ক, ভিটামিন বি৬। ওভুলেশন বা ডিম্বস্ফোটনের জন্য জরুরি একটি খনিজ হল জ়িঙ্ক। অন্য দিকে, ভিটামিন বি৬ প্রোজেস্টেরনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে মেজাজ বশে রাখতে সাহায্য করে।
এ ছাড়া, প্রতিটি বীজেই কমবেশি ফাইবার মেলে। অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেন শরীর থেকে বার করে দিতে সাহায্য করে ফাইবার। ওমেগা ৩ এবং ওমেগা ৬ ফ্যাটি অ্যাসিড প্রদাহ কমিয়ে হরমোনের কার্যকারিতা ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
অনন্যা বলছেন, ‘‘বীজচক্র নিয়ে প্রচুর গবেষণা এখনও না হলেও, কয়েকটি বীজের উপকারিতা প্রমাণিত। পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম খাকলে ইস্ট্রোজেনের মাত্রার হেরফের হয়। তা ঠিক রাখতে তিসি বীজ কাজে আসে। অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি নিঃসৃত হরমোনের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে ভিটামিন বি৬, জ়িঙ্ক।’’
পু্ষ্টিবিদ দীপশিখা জৈন জানাচ্ছেন, নিয়ম করে বীজগুলি খেলে অনিয়মিত ঋতুস্রাবের সমস্যা কমবে, হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং ডিম্বাণুর গুণগত মানও বৃদ্ধি পাবে।
কী ভাবে বীজ খেতে হবে
প্রতি দিন ১-২ চামচ বীজ খাওয়া যায় এবং তা গুঁড়ো করে খেলে ভাল, বলছেন অনন্যা। তিনি জোর দিচ্ছেন পুষ্টির ভারসাম্যেও। প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন, খনিজ, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট— প্রতিটি উপাদানই শরীরের জন্য জরুরি।
শুধু বীজই হরমোর ভারসাম্যহীনতার সমাধান নয়, বরং পুষ্টির সামঞ্জস্য রেখে খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, উদ্বেগ কমানোর উপরও জোর দিচ্ছেন পুষ্টিবিদেরা। পাশাপাশি, ঋতুস্রাবের সমস্যায় শুধু বীজচক্রের উপর ভরসা না রেখে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।