ইমরানের দৃষ্টিশক্তি কি চলে যেতে পারে? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
হুইলচেয়ারে বন্দি। ডান চোখ ফুলে লাল। যত বারই পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ছবি সামনে এসেছে, এ ভাবেই দেখা গিয়েছে তাঁকে। শোনা গিয়েছে, দীর্ঘ কয়েক মাস ধরেই চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন ইমরান। তাঁকে যে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেল কর্তৃপক্ষ ‘আই ড্রপ’ ছাড়া আর কিছুই দেননি, সে অভিযোগও ওঠে। ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পাকিস্তান সরকারকে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছিলেন সুনীল গাওস্কর, কপিল দেব-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটদলের ১৪ জন প্রাক্তন অধিনায়ক। সেই আবেদনের পরেই ইমরানকে মঙ্গলবার ইসলামাবাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেন অক্লুসন রোগে আক্রান্ত তিনি। রেটিনার এই জটিল রোগ ধীরে ধীরে অকেজো করে দিচ্ছে ডান চোখকে। প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিই চলে গিয়েছে ইমরানের। রেটিনার যে কোনও রোগই ভয়াবহ। সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেন অক্লুসন রোগটি হয় কিছু বিশেষ কারণে। কেন ইমরানই আক্রান্ত হলেন ওই রোগে?
ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (পিআইএমএস)-এ চিকিৎসা চলছে ইমরানের। খবর, তাঁর ডান চোখ থেকে অনবরত জল পড়ছে। চোখে ইঞ্জেকশনও দেওয়া হয়েছে। এর পরেও সংশয় থেকেই যাচ্ছে, ইমরানের দৃষ্টিশক্তি কি পুরোপুরি চলে যেতে পারে?
সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেন অক্লুসন রোগটি তাঁদেরই হয়, যাঁদের রক্তচাপ খুব বেশি, রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে গিয়েছে। অথবা যাঁরা ডায়াবিটিসের শিকার, রক্তে শর্করা প্রায়ই ওঠানামা করে। এমনটাই জানালেন চক্ষুরোগ চিকিৎসক সৌমেন মণ্ডল। তাঁর কথায়, ‘‘সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেন অক্লুসন অনেকটা চোখের স্ট্রোকের মতো। সাধারণত ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধলে স্ট্রোক হয়। ইমরানের ক্ষেত্রে রেটিনার শিরায় রক্ত জমাট বেঁধেছে। রক্তক্ষরণও হচ্ছে। ফলে চোখ ফুলে উঠেছে এবং দৃষ্টিশক্তি ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে।’’
কতটা ভয়াবহ সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেন অক্লুসন?
রেটিনায় অজস্র শিরা-উপশিরা থাকে। তার মধ্যে প্রধান যে শিরাটি রয়েছে, তার নাম ‘সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেন’। যদি কোনও কারণে শিরার মধ্যে দিয়ে রক্ত চলাচল বাধা পায়, তা হলে রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করে। একে বলে ‘থ্রম্বাস’, অর্থাৎ, শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহের যে স্বাভাবিক ধারা, সেটিকে অবরুদ্ধ করে দেয়। এতে যে সমস্যা হয়, তাতে রক্ত ও তরল চোখের ভিতরে জমা হতে থাকে। এর ফলে অপটিক নার্ভে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। যাকে ‘ইন্ট্রাঅকুলার প্রেশার’ বলা হয়। এতে রেটিনা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই চাপ যত বাড়ে, ততই রেটিনায় রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এই অবস্থাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ম্যাকুলার ইডিমা’। এর কারণে চোখ থেকে অনবরত জল পড়তে থাকে, চোখ লাল হয়ে ফুলে ওঠে এবং দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে শুরু করে। এই রোগের একেবারে শুরুর দিকে রোগীর ‘সাইড ভিশন’, অর্থাৎ পাশের জিনিস দেখার ক্ষমতা নষ্ট হতে থাকে। ধীরে ধীরে দু’পাশের দৃশ্যও ঝাপসা হতে থাকে।
চিকিৎসক সৌমেন জানাচ্ছেন, ইমরানের যে রোগটি হয়েছে তাতে যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হয়, তা হলে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে। রোগটি সারাতে হলে শুরুতেই চোখে ইঞ্জেকশন দিতে হবে। এতেও কাজ না হলে লেজ়ার থেরাপি করা যেতে পারে। ডায়োড লেজ়ার থেরাপিতে এখন রেটিনার চিকিৎসা হয়। ডায়োড লেজ়ারের কাজ হল নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মি চোখের ভিতরে পাঠানো। প্রথমে রোগীর চোখের চারপাশের পেশি অবশ করার ইঞ্জেকশন দেওয়া হবে। এর পরে চোখের সাদা অংশ বা স্ক্লেরার ভিতর দিয়ে লেজ়ার রশ্মি পাঠানো হবে, যা সরাসরি গিয়ে পড়বে সিলিয়ারি বডিতে। এই সিলিয়ারি বডির কাজ হল, তরল তৈরি করে চোখকে আর্দ্র রাখা ও চোখের ভিতরের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা। চোখের কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করাও এর কাজ।
রেটিনার কেন্দ্রস্থল যদি অস্বাভাবিক ফুলে ওঠে রক্তক্ষরণ হতে থাকে, তা হলে অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজন হয়। তবে যদি এগুলির কোনওটিই সময়মতো না হয়, তা হলে দৃষ্টি পুরোপুরি চলে যেতে পারে।