Benefits of Geriatric Parkour

বার্ধক্যে ‘দস্যিপনা’! সুস্থ থাকতে এমনই নয়া ধারায় মজেছেন বয়স্কেরা, এক বার পরখ করে দেখবেন নাকি?

৬০ পেরিয়েও কেউ আপনাকে বলল নাতি-নাতনির মতোই হুটোপাটি করতে। শুধু দস্যিপনা করতেই পাঠানো হল নির্দিষ্ট স্থানে, তা হলে কেমন হবে? ভাবছেন, বুড়ো বয়সে হাড়গোড় ভাঙার শখ কারই বা থাকে? তবে এমন দস্যিপনাই হতে পারে আশীর্বাদস্বরূপ।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ ০৯:৫৭

ছবি: সংগৃহীত।

গাছে চড়া, ফল পাড়া, পাঁচিলে বসে আচার চাখা, বল খেলা— ছোটবেলায় যা যা করেছেন, সেই জীবনই যদি অবসরের পরে ফিরে আসে?

Advertisement

ধরুন, ৬০ পেরিয়েও কেউ আপনাকে বলল নাতি-নাতনির মতোই হুটোপাটি করতে। দস্যিপনা করতেই পাঠানো হল নির্দিষ্ট স্থানে, তা হলে কেমন হবে? ভাবছেন, বুড়ো বয়সে হাড়গোড় ভাঙার শখ কারই বা থাকে? তা হলে কিন্তু একটু ভেবে দেখতেই হবে। কারণ, কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পরে এমনই দস্যিবৃত্তি করে বেড়াচ্ছেন একদল বয়স্ক মানুষ। পাঁচিল ধরে ঝুলছেন, ডিঙিয়ে যাচ্ছেন বেড়া, রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছেন, পাঁচিলে বসে পা দোলাচ্ছেন। তাঁদের মুখ-চোখ দেখলে স্পষ্টতই বোঝা যায়, ৬০-এর গেরো কাটিয়ে শৈশবের আনন্দ ফিরে পেয়ে তাঁরা বেজায় খুশি।

সুস্থ থাকতে এমন শারীরিক কসরত এখন জনপ্রিয় হয়েছে সিঙ্গাপুরে। যাকে বলা হচ্ছে বয়স্কদের পার্কো। এই সব শিখে বয়সকালেও দিব্যি দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বেটি বুনের মতো বয়স্কারা। তাঁর কথায়, ‘‘পার্কো করার পরে মনে হচ্ছে, আবার নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি। একটু ক্লান্তি এসেছে, কিন্তু তার পরেও প্রাণবন্ত হয়ে উঠছি।’’

বয়সকালে হঠাৎ করেই জীবনযাপনে বদল আসে। ব্যস্ততার দিন শেষে, সময় কাটে বাড়িতেই। শরীর চাঙ্গা রাখতে বেছে নিতে হয় হাঁটাহাটি, নয়তো যোগাসনের মতো শারীরিক কসরত। তবে ব্যতিক্রম আছে অবশ্যই। অনেকেই বয়সকালে দিব্যি টেনিস, গল্‌ফ খেলেন, সাঁতারে অংশ নেন, ফুরফুরে ভাবে বাঁচেন।

লম্ফঝম্ফ করেই দিন কাটবে, মন থাকবে ফুরফুরে।

লম্ফঝম্ফ করেই দিন কাটবে, মন থাকবে ফুরফুরে। ছবি:সংগৃহীত।

তবে বয়স হয়ে যাওয়া মানেই যে আবদ্ধ জীবন নয়, বরং তখনও সুস্থ শরীরে বাঁচা যায়, সেই ভাবনা থেকেই সিঙ্গাপুরে শুরু হয়েছে বয়স্কদের পার্কো। সহজ ভাবে বলতে গেলে, পার্কো হল একরকম স্টান্ট, যেখানে দেওয়াল, রেলিং, বেড়া পেরিয়ে শারীরিক কসরত দেখিয়ে এক স্থান থেকে অন্যত্র যাওয়া হয়। পার্কো শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল পথ বা গতিপথ।

তবে বয়স্কদের জন্য যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছে, তাতে লম্ফঝম্প থাকলেও, তা ঠিক সাধারণ পার্কোর মতো নয়। বরং প্রশিক্ষকের কড়া নজরদারিতে চলা এই ফিটনেস কৌশল আসলে শরীর-মন চাঙ্গা রাখার প্রয়াস। বয়স হলে শরীর অশক্ত হয়ে পড়ে। মনের জোর কমে। হাঁটাচলা কম হলে অস্থিসন্ধির ব্যথা বাড়ে। বয়স্কদের হাঁটাচলা, একা ঘোরাফেরার আত্মবিশ্বাসটাই কমে যায়। মনে ভয় থাকে, আচমকা পড়ে গেলে, বা চোট পেলে কী হবে? চিকিৎসকেরা বলছেন, সমস্ত ভয় কাটিয়ে, মস্তিষ্ক এবং শরীরের সমন্বয়ের সূত্রটি ঠিক রাখতেই এমন প্রশিক্ষণের ভাবনা। এই কৌশল বয়স্কদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিরও হাতিয়ার।

শরীর-মন সুস্থ রাখতে  যোগাসন নয়, চাই রোমাঞ্চ।

শরীর-মন সুস্থ রাখতে যোগাসন নয়, চাই রোমাঞ্চ। ছবি:সংগৃহীত।

মুম্বইয়ের চিকিৎসক বৈভব বাগারিয়া একা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য পার্কো কোনও বাড়ির উঁচু তলা থেকে ঝাঁপ দেওয়া বা তাঁদের দিয়ে দুঃসাহসিক শারীরিক কসরত করানো নয়, বরং এর উদ্দেশ্য হল শরীরকে প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করা।

এর উদ্দেশ্য হল, পড়ে গেলেও যাতে চোট না লাগে, সেই ভাবে শরীরকে নমনীয় করে তোলা। হাঁটাচলার সময় আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা, মানসিক এবং শারীরিক ভাবে বয়সকালেও সুস্থ থাকা।

সিঙ্গাপুরে এমন কর্মযজ্ঞ শুরু হলেও, ভারতে কিন্তু একে একেবারে নতুন বলা যাবে না। বরং এই দেশে বয়স্ক মানুষেরাও বহু দিন ধরেই এমন নানা ধরনের শারীরিক কসরতের সঙ্গে যুক্ত। একেবারে একই না হলেও ডন-বৈঠক, কুস্তির আসরে বয়স্কেরাও নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শন করেন। ভারতীয় এই কসরতগুলিও শরীর-মনের সমন্বয়ের যোগসূত্র হিসাবে কাজ করে।

চেন্নাইয়ের পার্কো প্রশিক্ষ্ক প্রভু মণির পর্যবেক্ষণ, দুই দশক ধরে এমন ধরনের শারীরিক কসরতে পঞ্চাশ এবং ষাটোর্ধ্বদের আগ্রহ বাড়ছে। তাঁর কথায়, একটু ভাবনাচিন্তা করে প্রশিক্ষণ দিলে এই দেশেও তা জনপ্রিয় হতে পারে। কঠিন কসরতের বদলে তাকে কিছুটা সরল করতে হবে। ব্যক্তিবিশেষের শারীরিক সক্ষমতার উপর নির্ভর করে প্রশিক্ষণের ব্যস্থা করতে হবে।

বয়স্কদের পড়ে যাওয়ার একটা ভয় থাকে। তা ছাড়া, হাঁটাচলা কম করলে অস্থিসন্ধির নমনীয়তাও কমে। বয়স্কেরা পড়ে গেলে চোটও হয় গুরুতর। প্রভু মণি জানাচ্ছেন, পার্কো শিক্ষা দেয়, পড়ে গেলেও শরীরের কোন ভঙ্গিমায় চোট কম লাগতে পারে। বয়স্কদের জন্য যা জরুরি।

কী ভাবে এই ধরনের প্রশিক্ষণ হয়?

খোলা জায়গাতেই প্রশিক্ষণ হয়। পড়ে গেলে চোট-আঘাত যাতে না লাগে, সে জন্য ম্যাটও পেতে রাখা হয়। তবে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস জাগলে সেই সব সরিয়ে দেওয়া হয়। কারণ, স্বাভাবিক পরিবেশই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অর্থে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।

বেঙ্গালুরু নিবাসী অস্থিসন্ধির শল্যচিকিৎসক অর্জুন মঞ্জুনাথ স্বামীর কথায়, ভারতের মতো দেশে যেখানে বয়সকালে পড়ে গিয়ে চোট পাওয়ার প্রবণতা যথেষ্ট, সেখানে এই ধরনের শারীরিক প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ হতে পারে। এমনকি, কমবয়সিরাও স্বাস্থ্য ভাল রাখতে তা করতে পারেন।

Advertisement
আরও পড়ুন