Bamboo Health Benefits

বাঁশ খেলে ভাল থাকে হৃদয়! রান্নার গুণে ‘সুপারফুড’, ভুলে হতে পারে বিষক্রিয়াও

বাঁশ বলতে যেই ছবি মাথায় ভেসে ওঠে, সেটিকে খাওয়া যায় না। খাওয়ার যোগ্য অংশ থাকে তার ভিতরে। বাঁশের গোড়ার ভিতর লুকিয়ে থাকা কচি অংশ, যাকে কোঁড় বলা হয়। ইংরেজি নাম ‘ব্যাম্বু শুট’ যদিও বেশি পরিচিত। সেটিই সাম্প্রতিক কালে ‘সুপারফুড’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:০৬
বাঁশ খেলে স্বাস্থ্য ভাল থাকে।

বাঁশ খেলে স্বাস্থ্য ভাল থাকে। ছবি: সংগৃহীত।

ভরপুর পুষ্টি। অতি সুস্বাদু। ধীরে ধীরে ‘সুপারফুড’-এর তকমা অর্জনের দিকে এগোচ্ছে। এমন খাবার কে খেতে চাইবেন না? তবে এই খাবারের সমস্যা কেবল নামে। কারণ বাংলা ভাষায় সেই খাবারটি খাওয়া আর বিপদে পড়াকে সমার্থক বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আর তা হল, বাঁশ। ‘বাঁশ খাওয়া’ আসলে বিপাকে পড়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে এই ভাষায়। ফলে বাঁশকে খাবারের স্বীকৃতি দিতে চান না অনেকেই। এ দিকে পুষ্টিতত্ত্বে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে সেই বাঁশই।

Advertisement

কেমব্রিজের অ্যাংলিয়া রাস্কিন ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য বিষয়ের অধ্যাপক লি স্মিথ সম্প্রতি বাঁশের পুষ্টিগুণ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলছেন, ‘‘বহুকাল ধরেই এশিয়ার বিভিন্ন অংশে বাঁশ খাওয়া হয়। সারা বিশ্বে স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার যোগ্যতা রয়েছে বাঁশের। কিন্তু সঠিক ভাবে রান্না করা দরকার। নয়তো হিতে বিপরীত হতে পারে।’’ সঠিক ভাবে রান্না করা বলতে কী বলতে চেয়েছেন সেই অধ্যাপক? তা ছাড়া কী কী উপকারিতাই বা আছে বাঁশের? এই সমস্ত উত্তরের জন্য কথা বলা হল কলকাতার পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিকের সঙ্গে।

ব্যাম্বু শুট দিয়ে রান্না।

ব্যাম্বু শুট দিয়ে রান্না। ছবি: সংগৃহীত।

বাঁশ বলতে যেই ছবি মাথায় ভেসে ওঠে, সেটিকে খাওয়া যায় না। খাওয়ার যোগ্য অংশ থাকে তার ভিতরে। বাঁশের গোড়ার ভিতর লুকিয়ে থাকা কচি অংশ, যাকে কোঁড় বলা হয়। ইংরেজি নাম ‘ব্যাম্বু শুট’ যদিও বেশি পরিচিত। বহু দিন ধরেই এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ও গ্রামবাংলার হেঁশেলে কোঁড়ের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে। উত্তর-পূর্ব ভারতে, চিন, জাপান, কোরিয়া, ইত্যাদি জায়গায় এই খাবারের বেশি চল রয়েছে। কিন্তু সেই খাবার আজ পুষ্টিবিদদের চোখে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। এখন তার পুষ্টিগুণ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। হালকা স্বাদ, সহজপাচ্য গঠন আর শরীরের নানা উপকারের জন্যই কোঁড়কে অনেকে ‘সুপারফুড’-এর মর্যাদা দিচ্ছেন।

কোঁড়ের পুষ্টিগুণ

বাঁশের কোঁড় ক্যালোরিতে কম (১০০ গ্রামে ২৫-৩০ কিলোক্যালোরি), কিন্তু পুষ্টিতে ভরপুর। এতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, ভিটামিন বি গোষ্ঠী, ভিটামিন ই, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন এবং অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট উপাদান। ফ্যাটের পরিমাণ খুব কম হওয়ায় ওজন সচেতন মানুষের জন্য এটি বিশেষ উপযোগী। এ ছাড়াও পলিফেনল, ফেনোলিক অ্যাসিড, ফ্ল্যাভোনয়েড, ফাইটোস্টেরলের মতো বায়ো-অ্যাক্টিভ যৌগও রয়েছে এতে।

বাঁশের কোঁড় কী কী ভাবে শরীরের উপকার করে?

হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে: কোঁড়ে থাকা প্রাকৃতিক ফাইবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত কোঁড় খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমে, পেট পরিষ্কার থাকে এবং হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হয়। যাঁদের ভারী খাবারে অস্বস্তি হয়, তাঁদের জন্য এটি হালকা ও পুষ্টিকর বিকল্প। তা ছাড়া এটি প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে বলে অন্ত্রের উপকারী ব্যাক্টেরিয়া পুষ্টি পায়।

ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে: কম ক্যালোরি ও বেশি ফাইবারের জন্য কোঁড় দীর্ঘ ক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে। ফলে অকারণে বার বার খাওয়ার প্রবণতা কমে। ওজন কমানোর ডায়েটের তালিকায় কোঁড় সহজেই জায়গা করে নিতে পারে, কারণ এতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়, কিন্তু অতিরিক্ত শক্তি জমে না বলে চর্বিতে পরিণত হতে পারে না।

হার্ট ভাল রাখতে সাহায্য করে: কোঁড়ে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সঙ্গে এতে ফ্যাট ও এলডিএল অর্থাৎ ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম হওয়ায় হার্টের উপর চাপ পড়ে না। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে কোঁড় খেলে হার্ট সুস্থ রাখতে সহায়ক হতে পারে।

রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে: কোঁড়ের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। ফাইবার সমৃদ্ধ বলে এটি খেলে রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যেতে দেয় না। তাই ডায়াবিটিসে আক্রান্ত অনেকের খাদ্যতালিকায় কোঁড় রাখা যায়, অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে।

প্রদাহনাশে সাহায্য করে: বাঁশের কোঁড়ে রয়েছে ফেনোলিক অ্যাসিড, ফ্ল্যাভোনয়েড ও ফাইটোস্টেরলের মতো উপাদান। এগুলি অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট হিসেবে কাজ করে, শরীরকে ক্ষতিকর অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। তা ছাড়া শরীরে প্রদাহ তৈরি হলে তা ধীরে ধীরে কমাতে পারে বাঁশের কোঁড়।

কিন্তু রান্নার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে কেন?

অধ্যাপকের সঙ্গে সহমত পুষ্টিবিদ। তাঁর কথায়, বাঁশের কোঁড় রান্নার সময়ে সঠিক পদ্ধতি মেনেই রান্না করতে হবে। নয়তো শরীরে অন্য ক্ষতি হতে পারে। কারণ বাঁশে রয়েছে ট্যাক্সিফাইলিন, যা সায়ানাইড নিঃসরণ ঘটাতে পারে। তাই কাঁচা খেয়ে নিলে শরীরে নানা রকম প্রভাব পড়তে। বমি ভাব, জিভে তেতো স্বাদ, মাথা ধরা, মাথা ব্যথা, তলপেটে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, নিম্ন রক্তচাপ, অস্বস্তি, দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে। খুব বেশি পরিমাণে খেয়ে ফেললে খিঁচুনিও ধরতে পারে। এমনকি, ফুসফুস বিকল হওয়া, হার্টের ক্ষতি হওয়ার মতো মারাত্মক ক্ষতিও হতে পারে। কিন্তু এই খাবারই যদি রান্না করে খাওয়া হয়, তা হলে এর থেকে গুণী কে-ই বা আছে!

রান্নার কোন পদ্ধতি সঠিক?

ব্যাম্বু শুট থেকে প্রথমে ভাল করে খোসা ছাড়িয়ে নিতে হবে। তার পর টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলতে হবে। এ বার ভাল করে সেদ্ধ করতে হবে। সেই জল ফেলে দিয়ে রান্নায় দেওয়া যায় টুকরোগুলি। অনেক ক্ষেত্রে আবার সেই টুকরোগুলিকে মজিয়ে নিয়ে রান্না করা হয়। তাতে আরও লাভ। কিন্তু অন্যান্য সব্জির সঙ্গে কাঁচা অবস্থায় রান্নায় মেশানো যাবে না। অল্প সাবধানতা অবলম্বন করে খেলে স্বাস্থ্যের জন্য ‘সুপারফুড’ হয়ে উঠতে পারে বাঁশের কোঁড়।

Advertisement
আরও পড়ুন