রাগে ফেটে পড়েন যখন তখন, কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায়, কী করবেন সেই মুহূর্তে? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
অল্পেই মাথাগরম! যখন-তখন রেগে অগ্নিশর্মা। কথায় কথায় বাড়ি মাথায় করেন। রেগে গেলে আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। তার পরই সর্বনাশ। যাকে যা খুশি বলে দেওয়া, সন্তান দুষ্টুমি করলে বকাবকি, মারধর, আপনজনদের সঙ্গে চেঁচামেচি-অশান্তি। কিছু ক্ষণ পরে রাগ কমে গেলেই অনুশোচনা, মনখারাপ। রাগ হলে তা উগরে দিলেই স্বস্তি! প্রচলিত ধারণা এমনই বলে। যেমন, রাগ প্রকাশ করলেই তা প্রশমিত হয় বলে মনে করেন বহু মানুষ। যদিও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রচলিত ধারণা ঠিক নয়। রাগের প্রকাশ নয়, বরং রাগ নিয়ন্ত্রণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর তা করতে হবে সঠিক উপায়ে।
রাগের প্রকাশ যত হবে, ততই রক্তচাপের হেরফের হবে। শরীরের বারোটা বাজবে। এমনই বলছেন হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের গবেষকেরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, রাগ প্রকাশ করলেই তা প্রশমিত হবে, মন শান্ত হবে— এই ধারণা সঠিক নয়। রাগ প্রকাশ করার বিষয়টি আপাত ভাবে ভাল মনে হলেও তার বৈজ্ঞানিক কোনও ভিত্তি নেই। তা বলে রাগকে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। রাগ হোক, কিন্ত সে মুহূর্তে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রাগ কমানোর সবচেয়ে ভাল উপায় হল এমন কিছু কাজ করা, যা শারীরিক উত্তেজনা কমায়।
রাগ কেন হয়?
মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, যার নাম অ্যামিগডালা। রাগ হলে সেই অংশটি উত্তেজিত হয়ে ওঠে। মস্তিষ্কের সামনের অংশ বা প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স পরিস্থিতি বোঝার আগেই অ্যামিগডালা অংশটি উত্তেজিত হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাতে থাকে। সে সময়ে শরীরের আরও কিছু হরমোনর তারতম্যের কারণেও রাগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষণা বলছে, রাগ এক-আধদিনের ব্যাপার নয়। দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপ, কোনও বিষয়ে অত্যধিক উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার কারণে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের ক্ষরণ বেড়ে যায়। এই হরমোনের তারতম্য ঘটলে তখন উদ্বেগ এতটাই বেড়ে যায় যে চিন্তাভাবনা গুলিয়ে যেতে থাকে। বিভ্রান্তি গ্রাস করে। আর তার বহিঃপ্রকাশই হল রাগ। হরমোনের গোলমাল যত বেশি হবে, রাগের প্রকাশ তত বাড়বে। আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা লোপ পাবে। তাই রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কিছু কাজ করতেই হবে।
রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায় কী?
১) রাগ হচ্ছে বুঝলে চুপ করে যান। অহেতুক কথা বাড়াবেন না, এতে সমস্যা বাড়বে।
২) অনেকেই রাগ হলে ব্যায়াম শুরু করেন বা এক পাক দৌড়ে আসেন, এতে রাগ প্রশমিত হয় না, বরং শারীরিক উত্তেজনা আরও বাড়ে। রাগ হলে শারীরিক কসরত না করে বরং শান্ত হয়ে বসে ‘বক্স ব্রিদিং’ করার চেষ্টা করুন। শ্বাসের এক বিশেষ ব্যায়াম যা স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। চার ধাপে করতে হয়। প্রথমে শ্বাস ছাড়ুন। তার পর ২০ সেকেন্ড স্থির হয়ে বসতে হবে। এর পর গভীর ভাবে শ্বাস টানুন টানা ১০ সেকেন্ড ধরে। শ্বাস ধরে রেখে ৫ গুনুন। তার পর ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন আবারও ১০ সেকেন্ড ধরে। উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা কমাতে, মনঃসংযোগ বৃদ্ধিতে ও স্মৃতিশক্তি উন্নত করতেও শ্বাসের এই ব্যায়ামটি করা যেতে পারে।
৩) কী কারণে আপনি রেগে যাচ্ছেন, সে বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে কী ভাবে সমস্যার সমাধান হবে, তা নিয়ে মনোযোগী হওয়া জরুরি। অন্যের নিন্দা বা সমালোচনা না করে নিজের পছন্দ-অপছন্দ পরিষ্কার করে জানান। নির্দিষ্ট করে আপনার চাহিদাটা বলুন।
৪) পছন্দের কাজ করুন। ছবি আকুঁন, ছবি তুলতে ভাল লাগলে তাই করুন। গল্পের বই পড়ার চেষ্টা করুন। বাগান করার শখ থাকলে খুবই ভাল। দেখবেন মন ভাল হয়ে যাবে।
৫) যে বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার থেকে যদি বেরিয়ে আসতে সমস্যা হয়, তা হলে অন্য কিছুতে মন দিন। যদি সাজগোজ পছন্দ হয়, তা হলে পছন্দের জামাকাপড় পরুন। এতেও মন ভাল হয়ে যাবে।
৬) যখনই বুঝবেন রাগ চড়চড় করে বাড়ছে, মনে মনে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত গুনুন। এই সামান্য বিরতি প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সজাগ হওয়ার সময় দেয়, ফলে তাৎক্ষণিক চিৎকার বা খারাপ ব্যবহার করা থেকে নিজেকে সংযত রাখতে পারবেন।
৭) প্রতিদিন সকালে অন্তত ১০-১৫ মিনিট ধ্যান বা মেডিটেশন করলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ে এবং আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ আসে। প্রাণায়াম করাও ভাল। এতেও মন স্থির হবে এবং উত্তেজনা কমবে।