Vinesh Chandel

সাংবাদিক থেকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, তারপর ভোটকুশলী! ভোটের মুখে আইপ্যাকের কর্তা বিনেশের ঠিকানা ইডি হেফাজত

২০১৫ সালে তৈরি হয় আইপ্যাক। সেই থেকে বিনেশ রয়েছেন এই সংস্থায়। তিনি সংস্থার অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা। বেশির ভাগ সময় দিল্লিতেই থাকেন বিনেশ। মেঘালয়ে তৃণমূলের কাজকর্ম দেখাশোনা করেন। তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৩৮
ED Arrests Ipac Cofounder Vinesh Chandel, Who is Vinesh Chandel

আইপ্যাকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিনেশ চান্দেল। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রাজ্যওয়ারি পরিসংখ্যান তাঁর ঠোঁটস্থ। ভাষার বাধাকে তিনি কোনও বাধা বলে মনে করেন না। প্রযুক্তি, তথ্যরাশি আর ভাষ্য নির্মাণের মিশেলে রাজনৈতিক প্রচারকেই ‘সময়ের দাবি’ বলে মনে করেন তিনি।

Advertisement

তিনি আইপ্যাকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিনেশ চান্দেল, যাঁকে কয়লা পাচার মামলার সূত্রে সোমবার রাতে গ্রেফতার করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। মঙ্গলবার দিল্লির পটীয়ালা আদালত বিনেশকে ১০ দিনের ইডি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে।

কিন্তু কে এই বিনেশ? তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় তাঁর স্থান কোথায়? কেন তিনি ‘গুরুত্বপূর্ণ’? কেন তাঁর গ্রেফতারির পরেই টুইট করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়?

প্রশান্ত কিশোরের পরবর্তী সময়ে আইপ্যাকের ‘কর্তা’ হিসাবে প্রতীক জৈনের নামই শোনা গিয়েছে। ‘পিকে’র পর ‘পিজে’ই ভোটকুশলী সংস্থার সামনের মুখ। তিনিই নির্দেশক। কিন্তু প্রতীক ছাড়াও আরও যে ‘মেঘনাদেরা’ নেপথ্যে থেকে আইপ্যাকে কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে বিনেশ অন্যতম। মধ্য চল্লিশের বিনেশ মধ্যপ্রদেশের উমারিয়ার ভূমিপুত্র। মূল পড়াশোনা আইন নিয়ে। ভোপালের ন্যাশনাল ’ল ইনস্টিটিউট ইউনিভার্সিটি (এনএলআইইউ) থেকে স্নাতক।

আইন পাশ করার পরে প্রথমে দু’টি সংস্থায় ‘শিক্ষানবিশ আইনজীবী’ হিসাবে কাজ করেন বিনেশ। কিন্তু রাজনীতির নেশায় তাঁর পেশাদার জীবন মোড় নেয় ভিন্ন দিকে। সাংবাদিকতা শুরু করেন। খবরের ‘বিশ্লেষক’ হিসাবে একটি ইংরেজি চ্যানেলে যোগ দেন। যদিও মন টেকেনি। পাঁচ মাসের মধ্যেই সেই কাজ ছেড়ে দিয়ে ফিরে যান আইনের পেশায়। ‘ওভারসিস ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যালায়েন্স প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে একটি সংস্থায় আইনি পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ শুরু করেন। বছরখানেক পরে সেই কাজও ছেড়ে দেন বিনেশ। ব্যক্তিগত ভাবে সুপ্রিম কোর্টে আইনের অনুশীলন শুরু করেন।

২০১৪ সালে প্রশান্ত কিশোরদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন বিনেশ। তিনি ছিলেন ‘সিটিজেন্স ফর অ্যাকাউন্টেব্‌ল গভর্ন্যান্স’-এর অন্যতম সদস্য, যারা কাজ করেছিল ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনী প্রচারে নরেন্দ্র মোদীর হয়ে।

২০১৫ সালে তৈরি হয় আইপ্যাক। সেই থেকে বিনেশ রয়েছেন এই সংস্থায়। তিনি সংস্থার অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা। বেশির ভাগ সময় দিল্লিতেই থাকেন বিনেশ। মেঘালয়ে তৃণমূলের কাজকর্ম দেখাশোনা করেন তিনি। তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। আইপ্যাককে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দেওয়ারও পুরোধা মধ্যপ্রদেশের এই ভূমিপুত্র। ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে বসেছিল সারা বিশ্বের রাজনৈতিক কুশলী সংস্থাগুলির ‘এক্সপো’, যাকে বিশ্ব রাজনীতির তাবড় ব্যক্তিত্বেরা ‘রাজনৈতিক অলিম্পিক্স’ হিসাবে অভিহিত করেছিলেন। সেই মেলায় এশিয়া থেকে একমাত্র সংস্থা হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করেছিল আইপ্যাক, যার নেপথ্যে ছিলেন বিনেশ।

২০২০ সালে বসুধা সিংহের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বিনেশ। ঘটনাচক্রে, বসুধাও পেশায় ‘রাজনৈতিক কুশলী’। তাঁর সংস্থার নাম ‘ভোট ব্রিজ’, যে সংস্থা মূলত কাজ করে বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন দলের বিভিন্ন নেতার হয়ে। একনাথ শিন্দে যখন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী, সেই পর্বে মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় ছিল বিনেশ-জায়ার সংস্থার অন্যতম ‘ক্লায়েন্ট’।

বিনেশ কি আচমকাই গ্রেফতার হলেন? তৃণমূলের অনেকের বক্তব্য, গত ২ এপ্রিলই ‘সঙ্কেত’ মিলেছিল। ওই দিন বিনেশের দিল্লির অফিস, আইপ্যাকের আর এক সহ-প্রতিষ্ঠাতা ঋষিরাজ সিংহের বেঙ্গালুরুর অফিস এবং অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল আম আদমি পার্টির ‘সমন্বয় ইনচার্জ’ বিজয় নায়ারের মুম্বইয়ের অফিসে তল্লাশি চালিয়েছিল ইডি। কয়লাপাচারের টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে পাচার এবং গোয়ার নির্বাচনে অবৈধ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে বিনেশের বিরুদ্ধে। প্রসঙ্গত, গোয়ার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল তৃণমূলও। সেখানকার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লুইজিনহো ফেলেইরোকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল শাসকদল। যদিও মধ্যমেয়াদেই তাঁকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল দলীয় নির্দেশে।

বিনেশের বিরুদ্ধে ইডি-র অভিযোগ, এপ্রিলে তল্লাশির পরে তিনি আইপ্যাকের গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের ইমেল-সহ বিভিন্ন নথি ডিলিট করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাকে হাওয়ালার টাকা সংক্রান্ত নথি লোপাট করার চেষ্টা বলেই অভিহিত করছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। হাওয়ালার মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে ইডি-র অভিযোগ। তার পরে ভুয়ো নথি তৈরি করে সেই টাকাকে ‘বৈধ’ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ইডি-র আরও অভিযোগ, একটি সংস্থার তরফে আইপ্যাকের অ্যাকাউন্টে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা ঋণ হিসাবে গিয়েছে। কিন্তু তাতে সুদের পরিমাণ বা ঋণ সংক্রান্ত কোনও শর্তাবলির উল্লেখ নেই। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আরও দাবি, ওই অর্থ সম্পর্কে আইপ্যাক কোনও ‘সদুত্তর’ দিতে পারেনি।

কয়লাপাচার মামলার সূত্রেই গত জানুয়ারিতে আইপ্যাক কর্তা প্রতীকের কলকাতার লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি এবং সল্টলেক সেক্টর ৫-এর দফতরে তল্লাশি চালিয়েছিল ইডি। তবে দু’জায়গাতেই পৌঁছে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই মামলা আপাতত সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। তার মধ্যেই দিল্লি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে বিনেশকে। যদিও বিনেশের গ্রেফতার আইপ্যাকের কাজে তেমন ‘প্রভাব’ ফেলেনি বলেই খবর। মঙ্গলবার সংস্থার সল্টলেকের দফতরে স্বাভাবিক কাজকর্ম চলেছে।

প্রসঙ্গত, সোমবার রাতে বিনেশের গ্রেফতারির অব্যবহিত পরেই অভিষেক তাঁর ‘এক্স’ পোস্টে লিখেছিলেন, ‘এটা গণতন্ত্র নয়, ভীতিপ্রদর্শন।’ মঙ্গলবার নির্বাচনী প্রচারে গিয়েও বিনেশের প্রসঙ্গে অভিষেক কেন্দ্রীয় সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আক্রমণ করেছেন। বিনেশের গ্রেফতারিকে তৃণমূল ‘ভোটের আগে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ব্যবহার করে প্রতিহিংসার রাজনীতি’ বলে অভিহিত করেছে। মঙ্গলবার রাজ্যসভায় তৃণমূলের দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন বিনেশের নিশঃর্ত মুক্তি দাবি করেছেন।

মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যখন তৃণমূলের যাবতীয় আলোচনা বিনেশকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছিল, সেই সময়েই জানা যায়, কয়লাপাচার মামলার সূত্রে আইপ্যাক-কর্তা প্রতীকের স্ত্রী বার্বি জৈন এবং প্রতীকের ভাই পুলকিত জৈনকেও সমন পাঠিয়েছে ইডি, যার প্রেক্ষিতে তৃণমূল মনে করছে, কেন্দ্রীয় সরকার বিধানসভা ভোটের আগে তাদের পরামর্শদাতা সংস্থার উপর ‘চাপ’ তৈরি করতে চাইছে। তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, বিনেশকে গ্রেফতার করে এবং বার্বি-পুলকিতকে নোটিস পাঠিয়ে আসলে প্রতীককে ‘বার্তা’ দিতে চাইছে বিজেপি। আসলে ‘চাপ’ তৈরি করা হচ্ছে প্রতীকের উপরেই।

Advertisement
আরও পড়ুন