(বাঁ দিকে) সম্রাট চৌধরি এবং নীতীশ কুমার (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
নীতীশ কুমারের বিরোধী থেকে হয়েছিলেন তাঁরই ‘ডেপুটি’। বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরি এ বার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নীতীশের স্থলাভিষিক্ত হলেন। বিজেপির অন্দরের সমীকরণ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ‘ঘনিষ্ঠ’ এই নেতার উপরেই আস্থা রাখল পদ্মশিবির। দীর্ঘ দিন শাসকজোটের শরিক থাকলেও বিহারে এর আগে কখনও বিজেপির কেউ মুখ্যমন্ত্রী হননি। সেই দিক থেকে দেখলে বিজেপির তরফে সম্রাটই প্রথম কেউ, যিনি বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন।
সম্রাটের কাছে রাজনীতি এবং মন্ত্রিত্ব— কোনওটাই নতুন নয়। রাজনৈতিক আবহেই তাঁর বড় হয়ে ওঠা। সম্রাটের পিতা শকুনি চৌধরি এক সময় সমতা পার্টির সাংসদ ছিলেন। আর মা পার্বতী দেবী ছিলেন ওই দলেরই বিধায়ক। পরে অবশ্য তাঁরা লালুপ্রসাদ যাদবের দল আরজেডিতে যোগ দেন। আর পিতা-মাতার রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করেই লালুর দলে যোগ দেন সম্রাট। লালু-পত্নী রাবড়ী দেবী বিহারের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়, ১৯৯৯ সালে কৃষিমন্ত্রী হয়েছিলেন সম্রাট। সেই সময় অভিযোগ উঠেছিল যে, ২৫ বছর বয়স না-হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ নিয়ে শোরগোল শুরু হতেই বিহারের তৎকালীন রাজ্যপাল সুরজ ভান সম্রাটকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারিত করেন।
২০০০ সালে আরজেডি পুনর্বার জয়ী হওয়ার পর ফের মন্ত্রী হন সম্রাট। সে বার অবশ্য তিনি পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদই শেষ করতে পেরেছিলেন। ২০০৫ এবং ২০১০ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আরজেডির পরাজয়ের পরেও দলীয় আনুগত্য বদলাননি সম্রাট। ২০১৪ সালে দলের শীর্ষনেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে নীতীশের দল জেডিইউ-তে যোগ দেন তিনি। জিতনরাম মাঝিঁ মন্ত্রিসভার সদস্য করা হয় তাঁকে। তবে নীতীশ মুখ্যমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব ফের নিজের হাতে নেওয়ার পর মন্ত্রিত্ব যায় সম্রাটের।
২০১৭ সালে আরও এক বার দলবদল করে বিজেপিতে যোগ দেন সম্রাট। এক বছরের মধ্যে দলের রাজ্য সহ- সভাপতি করা হয় তাঁকে। সংগঠনিক ক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে বিহারের রাজ্য সভাপতিও হন তিনি। ২০২৪ সালে নীতীশ ফের এনডিএ শিবিরে ফিরলে নতুন মন্ত্রিসভায় একাধিক দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হয় সম্রাটকে। বিজয়কুমার সিন্হার সঙ্গে তাঁকেও উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয়। দীর্ঘ দিন বিহারের আইনসভার উচ্চ কক্ষ বিধান পরিষদ থেকে নির্বাচিত হলেও, বর্তমানে সম্রাট সে রাজ্যের তারাপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক। গত বিধানসভা নির্বাচনের সময় তারাপুরে প্রচারে এসে শাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সম্রাট জয়ী হলে তাঁকে ‘বড় কিছুর’ দায়িত্ব দেওয়া হবে। তারাপুর থেকে ৪৫ হাজার ভোটে জিতেছিলেন সম্রাট।
৬ ফুট লম্বা, কাঁচা-পাকা দাড়ির সম্রাট এক সময় গেরুয়া পাগড়ি পরতেন। ঘনিষ্ঠমহলে, তিনি নাকি দাবি করতেন যে, নীতীশকে গদিচ্যুত করে তবেই তিনি ওই পাগড়ি খুলবেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, নীতীশের ডেপুটি হওয়ার অন্তত তিন মাস পরে অযোধ্যার সরযূ নদীতে স্নান করে সেই পাগড়ি খোলেন তিনি। এই সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছিলেন, “যে দিন নীতীশ কুমার ঘোষণা করলেন যে তিনি মহাগঠবন্ধন (বিরোধী জোট) ছেড়ে এনডিএ-এ ফিরছেন, সেই দিনই আমি ঘোষণা করেছিলাম যে, এই পাগড়ি আমি প্রভু রামকে উৎসর্গ করব।” পাগড়ি খোলার প্রায় দু’বছর পর মুখ্যমন্ত্রিত্বের মুকুট পরলেন একদা নীতীশ-বিরোধী হিসাবে পরিচিত সম্রাট।
সম্রাট কুশওয়াহা সম্প্রদায়ের মানুষ। বিহারে কুর্মি এবং কুশওয়াহারা মোট জনসংখ্যার অন্তত ১০ শতাংশ। নীতীশ নিজে কুর্মি সম্প্রদায়ের মানুষ। মূলত নীতীশের কারণেই এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষ জেডিইউ এবং তাদের শরিক দলকে সমর্থন জানান। বিহারের রাজ্য রাজনীতিতে নীতীশের অনুপস্থিতিতে এই ভোটব্যাঙ্ককে ইতিবাচক বার্তা দিতেই সম্রাটকে বেছে নেওয়া হল বলে মনে করছেন কেউ কেউ। তা ছাড়া কুর্মিদের মতো কুশওয়াহারাও অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়ভুক্ত (ওবিসি)। সম্রাটকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বেছে নিয়ে পদ্মশিবির বিহারের সমগ্র ওবিসি সম্প্রদায়কেই বার্তা দিল মনে করা হচ্ছে।