সুখোই-৩০ যুদ্ধবিমান। —ফাইল চিত্র।
‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’— পুরনো এই আপ্তবাক্য অনুসরণ করেই পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ায় ‘কূটনৈতিক রণনীতি’ নির্ধারণ করছে নয়াদিল্লি। সেই নীতি মেনেই ‘অপারেশন সিঁদুর’-পর্বে খোলাখুলি পাকিস্তানকে সমর্থন করা আজ়ারবাইজানের শত্রুরাষ্ট্র আর্মেনিয়াকে ধারাবাহিক ভাবে সামরিক সাহায্য দিচ্ছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। এ বার সেই পথে হেঁটে আর্মেনিয়াকে প্রায় ১০-১২টি সুখোই এসইউ-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নয়াদিল্লি। ঘটনাচক্রে, আজ়ারবাইজানে ইরানের হামলার আগেই হল সেই চুক্তি।
রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি সুখোই-৩০ এমকেআই বিক্রির জন্য ইতিমধ্যেই আর্মেনিয়ার সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তি সই হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রের খবর, চুক্তির অঙ্ক প্রায় ৩০০ কোটি ডলার (প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা)। রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নির্মিত সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান ভারতীয় বায়ুসেনা এবং নৌসেনার অন্যতম হাতিয়ার। বর্তমানে আর্মেনীয় বায়ুসেনার হাতে কয়েকিট সুখোই এসইউ-৩০ এসএম যুদ্ধবিমান রয়েছে। এসইউ-৩০ এমকেআই তার উন্নততর সংস্করণ। যুদ্ধবিমানে ব্যবহৃত গাইডেড বোমা, ‘এরায় টু সারফেস’ ক্ষেপণাস্ত্র-সহ নানা সরঞ্জামও আর্মেনিয়াকে সরবরাহ করবে ভারত।
এর পাশাপাশি আর্মেনিয়াকে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘উত্তম এইএসএ রেডার’ সরবরাহের প্রসঙ্গও রয়েছে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিতে। প্রসঙ্গত, এর আগে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তেজস যুদ্ধবিমান কেনা নিয়া ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল আর্মেনিয়ার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ফলপ্রসূ হয়নি। যদিও ইতিমধ্যেই ভারত থেকে পিনাকা ‘মাল্টি ব্যারেল রকেট লঞ্চার’, আকাশ ১-এস আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন বিধ্বংসী অস্ত্র এবং ১৫৫ এমএম ‘অ্যাডভান্স টাওড আর্টিলারি গান সিস্টেম’ (এটিএজিএস) আমদানি করেছে ওই দেশ।
প্রসঙ্গত, আর্মেনিয়া এবং আজ়ারবাইজান দুই দেশই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্বাধীনতার পরে ১৯৯১ সালে বিতর্কিত নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলের দখল নিয়ে সীমান্ত সংঘর্ষ শুরু হয় দু’দেশের। এর পরে ২০২০ সালে দু’দেশের যুদ্ধে প্রায় সাড়ে ছ’হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন। খ্রিস্টান প্রধান নাগোরনো-কারাবাখে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ উঠেছিল আজ়ারবাইজানের বিরুদ্ধে। সে সময় মস্কোর মধ্যস্থতায় সংঘর্ষ বিরতি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন করে সংঘর্ষ শুরুর পরে ইউক্রেন সমস্যায় ব্যতিব্যস্ত ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়া আর সম্ভব হয়নি। পাকিস্তান এবং তুরস্কের মদতে নাগোরনো-কারাবাখের অধিকাংশ এলাকাই দখল করে নিয়েছে আজ়ারবাইজান।
৪,৪০০ বর্গকিলোমিটারের নাগোরনো-কারাবাখ সোভিয়েত জমানায় আজ়ারবাইজানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এই অঞ্চলের প্রায় দেড় লক্ষ বাসিন্দার অধিকাংশই আর্মেনীয় খ্রিস্টান। তাঁরা মুসলিম রাষ্ট্র আজ়াবাইজানের অধীনে থাকতে নারাজ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আজ়ারবাইজান সেনার ধারাবাহিক হামলায় ওই এলাকার লক্ষাধিক খ্রিস্টান নাগরিক আর্মেনিয়ায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বহু খ্রিস্টান গ্রামবাসীকে খুনও করেছে পাকিস্তান-তুরস্কের মদতপুষ্ট আজ়ারবাইজান ফৌজ। ১৯৯৪ সালের লড়াইয়ের পর থেকে নাগোরনো-কারাবাখের বিস্তীর্ণ অঞ্চল আর্মেনিয়ার মদতপুষ্ট খ্রিস্টান মিলিশিয়া গোষ্ঠী ‘আর্টসাক ডিফেন্স আর্মি’র দখলে ছিল। কিন্তু গত তিন বছর ধরে আজ়ারবাইজান ফৌজের ধারাবাহিক হামলায় রণে ভঙ্গ দিয়েছে তারা। এই পরিস্থিতিতে আজ়ারবাইজানের মোকাবিলায় ভারতীয় অস্ত্রেই ভরসা রাখছে আর্মেনিয়া।