লোকসভায় রাহুল গান্ধী। ছবি: পিটিআই।
ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সমঝোতা নিয়ে লোকসভায় আবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে নিশানা করলেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। আর সেই বক্তৃতার সময় বরাবরের মতোই প্রবল বাধা পেলেন ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে।
বুধবার লোকসভায় বক্তৃতায় রাহুল বলেন, ‘‘যদি ‘ইন্ডিয়া’ (বিজেপি বিরোধী জোট) ক্ষমতায় থাকত, তা হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার সময় দ্বিপাক্ষিক সমমর্যাদার প্রশ্নে আপস করত না। কিন্তু মোদীর সরকার ভারতমাতাকে বিক্রি করে দিয়েছে। ভারতের মাটিতে মার্কিন পণ্যের অবাধ অনুপ্রবেশের অনুমতি দিয়ে দেশের কৃষকদের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তোলার বন্দোবস্ত করেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা বন্ধক দিয়েছে আমেরিকার কাছে।’’ বিরোধী দলনেতার অভিযোগ, ‘‘এটি আদতে পাইকারি আত্মসমর্পণ।’’
লোকসভায় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের বাজেট প্রস্তাবের উপর বিতর্কে রাহুল বুধবার ট্রাম্প সরকারের কাছে মোদীর ‘আত্মসমর্পণের’ ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। রায়বরেলীর কংগ্রেস সাংসদের মন্তব্য, ‘‘কেন তিনি (মোদী) ভারতকে বিক্রি করেছেন, তার কারণ হল, তারা (আমেরিকা) তাঁর (মোদী) শ্বাসরোধ করছে। তাঁদের ঘাড়ের উপর চেপে বসেছে।’’ আইকিডো এবং জিউ-জিৎসুতে পারদর্শী রাহুল তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে মার্শাল আর্টের উপমা টেনে বলেন— ‘‘অনেক মার্শাল আর্টে প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করার কৌশল হল, ঘাড় চেপে শ্বাসরোধ করা।’’ আর সেই ‘শ্বাসরোধে’র উদাহণ দিতে গিয়ে ‘এপস্টিন ফাইল’ প্রসঙ্গের উল্লেখ করেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ২ ফেব্রুয়ারি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতা সংক্রান্ত চুক্তির ঘোষণা করে শুল্কের পরিমাণ ২৫ থেকে কমিয়ে ১৮ করা এবং রাশিয়া থেকে তেল কেনার শাস্তি হিসাবে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ‘জরিমানা’ প্রত্যাহারের বার্তা দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে জানিয়েছিলেন, সমঝোতার শর্ত হিসাবে আমেরিকার কাছ থেকে ৫০,০০০ কোটি ডলারেরও (৪৫ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি) বেশি মূল্যের জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি, কয়লা এবং অন্যান্য অনেক পণ্য কিনবে। ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়া থেকে কেনা তেল ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান মাধ্যম বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি। রাহুল বুধবার সে দিকটিতেই ইঙ্গিত করেছেন। পাশাপাশি, সংবাদ সংস্থা রয়টার্স প্রকাশিত খবরে দাবি, বাণিজ্য সমঝোতার শর্ত হিসাবে এ বার মার্কিন কৃষিপণ্য ও দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য দরজাও আংশিক ভাবে খুলে দিতে চলেছে মোদী সরকার।
এ ক্ষেত্রে ভারতীয় কৃষক ও গবাদি পশুপালকদের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে বলে অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা। ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ এবং ‘কৃষক-স্বার্থে’ আঁচ না-লাগার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কোনও ক্ষেত্রেই চুক্তির খসড়ার ‘শর্ত’ প্রসঙ্গে স্পষ্ট উত্তর মেলেনি কেন্দ্রের তরফে। সে প্রসঙ্গও লোকসভায় উঠে এসেছে বিরোধী দলনেতার বক্তব্যে। প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের ‘যুদ্ধের যুগ শেষ হয়ে গিয়েছে’ মন্তব্যেরও সমালোচনা করেছেন রাহুল। তিনি বলেন, ‘‘আসলে, আমরা যুদ্ধের যুগে প্রবেশ করছি। ইউক্রেনে যুদ্ধ চলছে, গাজ়ায় যুদ্ধ চলছে, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ চলছে, ইরান যুদ্ধের হুমকির মুখে রয়েছে, আমাদেরও ‘অপারেশন সিঁদুর’ হয়েছে। আমরা এক বিপজ্জনক পৃথিবীতে প্রবেশ করছি। আমাদের শক্তি বুঝতে হবে এবং আমাদের দেশের মূল শক্তি হল আমাদের জনগণ।’’
নয়াদিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’র সরকার থাকলে ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতা নিয়ে সম্ভাব্য কথোপকথনের রূপরেখাও তুলে ধরেছেন রাহুল। তিনি বলেন, ‘‘আমরা ট্রাম্পকে প্রথমেই বলতাম যে, এই সমীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হল ভারতীয় তথ্য। যদি আমেরিকা ডলারকে রক্ষা করতে চায়, তা হলে তাদের স্বীকার করতে হবে যে ভারতীয় তথ্যই সবচেয়ে বড় সম্পদ। দ্বিতীয়ত, আমরা ট্রাম্পকে বলতাম যে, যদি আপনি এতে প্রবেশাধিকার চান, তা হলে আমাদের সঙ্গে সমমর্যাদায় কথা বলবেন। আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করবেন না যেন আমরা আপনার দাস। ‘ইন্ডিয়া’ সরকার ট্রাম্পকে বলত যে, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কোনও আলোচনা করা যাবে না এবং আমরা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা অটুট রাখব।’’ এর পরেই তাঁর মন্তব্য, ‘‘তৃতীয় বিষয়টি হল, আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে স্পষ্ট জানাতাম যে, আমরা বুঝতে পারি আপনার কৃষি ভোটার-ভিত্তি আছে। আমেরিকার কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় আপনার দায়বদ্ধতা রয়েছে। তবে আমরা আমাদের কৃষকদেরও রক্ষা করতে দায়বদ্ধ।’’
লোকসভায় বাধাদানের পাশাপাশি সরকারপক্ষের তরফে বুধবার রাহুলে মন্তব্যের কড়া সমালোচনাও করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংসদীয়মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু বলেন, ‘‘রাহুলের বক্তৃতা মিথ্যায় ভরা। আমরা তা লোকসভার কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার জন্য উদ্যোগী হব। সংসদের ভেতরে একটি প্রস্তাব আনা হবে। আমাদের দল অবস্থান নিয়েছে যে, আমরা রাহুলের মিথ্যাচারের প্রতিবাদ বাইরেও করব।’’ রাহুল তাঁর বক্তৃতায় কেন্দ্রীয় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরীকে নিশানা করে যৌন অপরাধী ধনকুবের এপস্টিনের সঙ্গে শিল্পপতি অনিল অম্বানীর যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। লোকসভার বাইরে পুরী বলেন, ‘‘রাহুলের অভিযোগ ভিত্তিহীন। এপস্টিন এক জন অপরাধী। তাঁর বিরুদ্ধে শিশু যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং ভুক্তভোগীরা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। আমার কথোপকথনের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক ছিল না।’’