India-Pakistan

শান্তি বৈঠকের পাক চালে সন্ত্রাস-তির ভোঁতা! উদ্বিগ্ন দিল্লি

বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতির প্রশ্নে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে বিরতি টানতে বড় ভূমিকা নিচ্ছে পাকিস্তান।

অগ্নি রায়
শেষ আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:১৬

—প্রতীকী চিত্র।

কূটনীতির লড়াইয়ে নয়াদিল্লিকে ইতিমধ্যেই পাঁচ গোল মেরে বেরিয়ে গেল ইসলামাবাদ। আজ পাকিস্তানে আমেরিকা-ইরানের ঐতিহাসিক বৈঠকটি শুরু হওয়ার পর এমনই মনে করছে কূটনৈতিক শিবিরের একাংশ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল।

এটা ঘটনা যে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতির প্রশ্নে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে বিরতি টানতে বড় ভূমিকা নিচ্ছে পাকিস্তান। বিরোধী শিবির তো বটেই, কূটনৈতিক শিবিরের একাংশ ঘরোয়া ভাবে জানাচ্ছে, ভারতের নাকের ডগায় বসে ইসলামাবাদ যে উচ্চতায় পৌঁছে গেল তাতে হাত কামড়ানো ছাড়া নয়াদিল্লির এখন বিশেষ কিছু করার নেই। এ-ও মনে করা হচ্ছে, কূটনৈতিক বিচক্ষণতার অভাবেই ট্রেন ভারতের স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় ভারত যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেদের কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করতে পারেনি। অথচ আরব রাষ্ট্রগুলিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূতের বিশাল সংখ্যা, জ্বালানি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্যের আয়তন, ইরানের সঙ্গে সভ্যতাগত সংযোগ এবং শক্তিক্ষেত্রে দীর্ঘ দিনের নির্ভরতাকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আজ ইসলামাবাদ নয়, নয়াদিল্লির মাটিতেই এই বোঝাপড়া হওয়ার কথা ছিল।

কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশের কথায়, ‘‘২০২৫ সালে পাকিস্তান পহেলগামে নারকীয় হামলার পর এবং গোটা বিশ্বে তাদের একঘরে করে দেওয়ার জন্য ভারতের প্রচেষ্টার পরেও কী ভাবে পাকিস্তান বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন ভূমিকা তৈরি করে নিতে পারল? এটা ভারতীয় কূটনীতির ব্যর্থতা। মনমোহন সিংহের সরকার ২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বই হামলার পর কিন্তু যথেষ্ট কার্যকর ভাবেই পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক স্তরে কোণঠাসা করে দিয়েছিল।’’ যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তিনি তুলেছেন, ব্রিকস-এর বর্তমান সভাপতি রাষ্ট্র হিসেবে ভারত কেন শান্তি উদ্যোগে মধ্যস্থতা করতে পারল না? বিশেষত যখন সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব এবং ইরান ব্রিকস-এর সদস্য?

‘নমস্তে ট্রাম্প’, ‘হাউডি মোদী’, ‘আগলে বার ট্রাম্প সরকার’— প্রচারের পরেও আমেরিকা কেন পাকিস্তানের হাত ধরছে তার জবাবদিহিও চাইছেন বিরোধীরা। অভিযোগ, আমেরিকাকে তার সুবিধামাফিক বাণিজ্যচুক্তিতে সম্মতি দেওয়ার বিনিময়ে কিছুই আদায় করতে পারেনি নয়াদিল্লি।

কূটনৈতিক শিবিরের একাংশের বক্তব্য, পাকিস্তানের ভূমিকা আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাঠ্যপুস্তকে ঢুকে পড়ল। এরপর সন্ত্রাসে পুঁজি জোগানের ক্ষেত্রে নজরদারি সংস্থা এফএটিএফ-র ধূসর তালিকায় পাকিস্তানকে ঢোকানোর যে মরিয়া চেষ্টা মোদী সরকার করে চলেছে তা কার্যত দুঃসাধ্য হয়ে গেল। তেলের দাম কমানো এবং মুদ্রাস্ফীতি রোখার (যদি এই বৈঠক আংশিক সফল হয় তা হলেও) পুরস্কার হিসেবে আইএমএফ-এর ঋণ ঢেলে দেওয়া হবে অর্থনৈতিকভাবে বেহাল এই দেশটিকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানির বিশেষ সুবিধা ভোগ করছিল পাকিস্তান, ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংখ্যালঘু পীড়ন এবং সন্ত্রাসে মদত দেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই সুবিধা স্থগিতের দাবি উঠেছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে শুধু আমেরিকা নয়, ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রও যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের উদ্যোগে সপ্রশংস বিবৃতি দিয়ে চলেছে একের পর এক। ফলে ইউরোপের বাজারে কোনও বাধা অদূর ভবিষ্যতে নেই ইসলামাবাদের। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত নিরপত্তা চুক্তি আগেই করা হয়েছে। অর্থনৈতিক ভাবে এবং কৌশলগত ভাবে সৌদি আরবকে এরপর আরও দৃঢ় ভাবে পাকিস্তান পাশে পাবে বলে মনেকরা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় কথা, এর পর নিজেদের শর্তমাফিক ভারতকে আলোচনার টেবিলে বসতে চাপ দেওয়ার প্রশ্নে আমেরিকা এবং ইউরোপকে সঙ্গে পেতে পারে আজকের পাকিস্তান, এমন আশঙ্কাও সাউথ ব্লকে তৈরি হয়েছে। কোনও আন্তর্জাতিক বিবৃতিতে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসে পাকিস্তানের ভূমিকার বিষয়টি জোরালো ভাবে ঢোকানোও নয়াদিল্লির কাছে এর পর যথেষ্ট সমস্যাজনক হয়ে উঠবে। এটাও মাথায় রাখা হচ্ছে, মধ্যস্থতার এই গোটা উদ্যোগে পাকিস্তানের পিছনে চিনের অদৃশ্য উপস্থিতি রয়েছে।

দাড়িপাল্লার এক দিকে আমেরিকা-ইজ়রায়েল এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্র এবং অন্য দিকে ইরান থাকা সত্ত্বেও ভারত কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ— এই অভিযোগ নতুন করে সামনে আসছে। আর তারই সুযোগ নিয়েছে পাকিস্তান। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কে ক্রমশ শীতলতার পথে হেঁটেছে মোদী সরকার। সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের হত্যা প্রসঙ্গে ‘নীরব’ থেকেছে। ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কার্যত নমো নমো করেই চলছে গত আট বছর। অথচ এই ইরান কিন্তু অপারেশন সিঁদুরের পর প্রকাশ্যে ভারতের পাশেই দাঁড়িয়েছিল।

আরও পড়ুন