নরেন্দ্র মোদী। — ফাইল চিত্র।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক মুখে নরেন্দ্র মোদী সরকার সংসদে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস তথা মহিলাদের সংরক্ষণ বিল নিয়ে এসেছিল। দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন জোগাড় করতে না পারায় মোদী সরকার সেই সংবিধান সংশোধনী বিল লোকসভায় পাশ করাতে পারেনি। কারণ, বিরোধীরা এককাট্টা হয়ে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। এ বার পশ্চিমবঙ্গ-সহ কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা ভোটের ফলপ্রকাশের পরে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মোদী সরকার ফের একটি সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করানোর পরিকল্পনা করছে।
সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনে এমন একটি বিল আনার কথা ভাবা হয়েছে, যাতে প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে— প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্র বা রাজ্যের মন্ত্রীরা যদি পাঁচ বছরের বেশি কারাদণ্ড হতে পারে, এমন অপরাধে গ্রেফতার হয়ে টানা ৩০ দিন আটক থাকেন, তা হলে ৩১তম দিনে তাঁদের পদ চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এক বছর আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই ১৩০তম সংবিধান সংশোধনী বিল-সহ তিনটি বিল সংসদে পেশ করেছিলেন। তার পরে বিলগুলি আলোচনার জন্য জেপিসি বা যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বিজেপি সাংসদ অপরাজিতা সারঙ্গীর নেতৃত্বে জেপিসি-র বৈঠকে আগামী ১৭ জুলাই ওই বিতর্কিত বিল সম্পর্কে রিপোর্ট গৃহীত হবে। ঠিক তার পরেই ২০ জুলাই থেকে বাদল অধিবেশন শুরু হতে পারে বলে সংসদের সচিবালয় সূত্রের খবর। ১৩ অগস্ট পর্যন্ত অধিবেশন চলবে। রাজনৈতিক শিবিরের মতে, বাদল অধিবেশনে এই সংবিধান সংশোধনী বিল পাশের চেষ্টা হতে পারে। তৃণমূল, উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনায় ভাঙন ধরানো, ডিএমকে-র সঙ্গে কংগ্রেসের দূরত্বের সুযোগ নিয়ে মোদী সরকারের পক্ষে সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করানোর মতো সংখ্যা জোগাড় হয়েছে কি না, এই বিল দিয়ে তার জলমাপা হবে।
কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা আগেই অভিযোগ তুলেছিল, অমিত শাহ ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস, ‘এক দেশ এক ভোট’-এর মতো সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতেই একের পর এক আঞ্চলিক দল ভাঙানোর কর্মসূচি নিয়েছেন। সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে লোকসভার ৫৪৩ জন সাংসদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বা ৩৬২ জনের ভোট দরকার। এনডিএ-র সাংসদ সংখ্যা ২৯৪। তৃণমূল থেকে বেরিয়ে এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়া ২০ জন এনডিএ-কে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উদ্ধবের শিবসেনা থেকে বেরোনো ৬ জন এনডিএ-র সঙ্গে থাকা একনাথ শিন্দের শিবসেনায় যোগ দিয়েছেন। তাঁদের নিয়ে এনডিএ-র পক্ষে ৩২০ জন হয়। বিরোধীদের মঞ্চ ‘ইন্ডিয়া’ ছেড়েছে ডিএমকে। তাদের ২২ জন সরকারের পক্ষে ভোট দিলেও এনডিএ-র ভোট ৩৪২-এ আটকে যাবে। এ বার এনডিএ কী ভাবে বাকি ভোট জোগাড় করবে, তা বিরোধী শিবির বুঝে নিতে চাইছে।
বিরোধীরা গত বছরই অভিযোগ তুলেছিল, প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীদের সরানোর বিল এনে মোদী সরকার আসলে বিরোধী-শাসিত রাজ্য সরকারগুলিকে ইচ্ছেমতো অস্থির করে তুলতে চাইছে। সেই সময়ে ৩০ জন মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে ১২ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের মামলা ছিল। কংগ্রেস-শাসিত তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি, এনডিএ-র শরিক অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডুর বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা সব থেকে বেশি ছিল। কংগ্রেস, এসপি, ডিএমকে-সহ কোনও বিরোধী দলের সাংসদই জেপিসি-তে যোগ দেননি। তবে শরদ পওয়ারের এনসিপি, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, এমআইএম জেপিসি-তে অংশ নেয়। সূত্রের খবর, জেপিসি এই সংবিধান সংশোধনী বিলের অধিকাংশ বিতর্কিত ধারাই রেখে দেওয়ার সুপারিশ করেছে। তবে আইনের অপব্যবহার রুখতে কিছু রক্ষাকবচের সুপারিশ করতে পারে জেপিসি। এই বিল অগণতান্ত্রিক— এমন অভিযোগ অবশ্য খারিজ করে দিয়েছেন এনডিএ সাংসদেরা। তাঁদের যুক্তি, কোনও মন্ত্রী ৩০ দিন আটক থাকলে তার মধ্যে অন্তত তিন বার জামিনের আবেদনের সুযোগ মেলে। বিজেপির বক্তব্য, দুর্নীতির মামলায় জেলে গিয়েও ইস্তফা না-দিয়ে দিল্লির সরকার চালিয়ে গিয়েছিলেন অরবিন্দ কেজরীওয়াল। তেমন পরিস্থিতি আটকাতেই এই বিল।
বিরোধী শিবিরের দাবি, নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিলে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীকে সরানোরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে বিজেপি কৃতিত্ব নিতে চাইছে। বাস্তবে সবাই জানে, প্রধানমন্ত্রীকে কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা গ্রেফতার করবে না। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রীদের গ্রেফতার করে বিরোধী সরকারকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা হবে। শরিক দলের নেতাদেরও লাগামে রাখা যাবে। বিজেপি এত দিন ধরে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের দলে স্থান দিয়েছে। সিবিআই-ইডিকে কাজে লাগিয়েছে। এখন এই বিল এনে নৈতিক অবস্থান নিতে চাইছে। আবার বিরোধী দলগুলিকে ভাঙিয়ে সেই বিল পাশ করাতে চাইছে।