(বাঁদিকে) উদ্ধব ঠাকরে এবং একনাথ শিন্দে (ডানদিকে)।
উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি)-র ন’জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ছ’জন সোমবার আনুষ্ঠানিক ভাবে যোগ দিলেন একনাথ শিন্দের নেতৃত্বাধীন শিবসেনায়। সোমবার মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী শিন্দের উপস্থিতিতে মুম্বইয়ে সাংবাদিক বৈঠক করে দলবদলের ঘোষণা করলেন তাঁরা। তাঁদের স্বাগত জানিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে শিন্দে বলেন, “ছ’টি বাঘ এখানে এসেছে। তাঁরা সবাই এখন প্রকৃত শিবসেনা পরিবারে যোগ দিয়েছেন। আমি তাঁদের প্রকৃত শিবসেনা পরিবারে স্বাগত জানাই।”
মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধবের দল ছেড়ে শিন্দেসেনার যোগদানকারী ছ’জন লোকসভা সাংসদ— নাগেশ পাতিল আশিতকর (হিঙ্গোলি), সঞ্জয় দেশমুখ (যবতমল-ওয়াসিম), সঞ্জয় যাদব (পরভণী), সঞ্জয় দিনা পাটিল (মুম্বাই উত্তর-পূর্ব), ওমপ্রকাশ রাজে নিম্বলকর (ওসমানাবাদ), ভাউসাহেব ওয়াকচুরে (শিরডি) জানিয়েছেন, মহারাষ্ট্রের উন্নয়নের স্বার্থেই তাঁরা প্রকৃত শিবসেনায় শামিল হলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে মহারাষ্ট্রে উদ্ধবসেনা ন’টি এবং শিন্দেসেনা সাতটি আসনে জিতেছিল। ছ’জন সাংসদের দলত্যাগের ফলে লোকসভায় উদ্ধবের দলের শক্তি কমে হল তিন।
২০২২ সালেই টুকরো হয়েছিল উদ্ধবের নেতৃত্বাধীন ‘অবিভক্ত শিবসেনা’। দলে প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত বালাসাহেব ঠাকরের পুত্রের হাত থেকে সে সময় মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রিত্ব এমনকি, দলের নাম আর ‘তির-ধনুক’ নির্বাচনী প্রতীকও ছিনিয়ে নিয়েছিলেন বিদ্রোহী শিন্দে। এ বার ছ’জন সাংসদকে ছিনিয়ে নেওয়ায় লোকসভায় তাঁর দলের আসন বেড়ে হল ১৩। উদ্ধবের সঙ্গে রইলেন তিন সাংসদ— অরবিন্দ সবন্ত, অনিল দেশাই এবং রাজাভাউ ওয়াজ়ে। আত্মবিশ্বাসী শিন্দে সোমবার বলেন, “চার বছর আগে— ২০২২-এর ২২ জুন আমরা শিবসেনার ভিতরে বিদ্রোহ করেছিলাম। তখন আমাদের সঙ্গে ৪০ জন বিধায়ক ছিলেন। আর এখন আমরা চার নয়, ছক্কা মেরেছি। এটিই আমাদের ছক্কা।”
সূত্রের খবর, গত সপ্তাহেই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে বিদ্রোহী ছ’জন সাংসদ জানিয়েছেন, উদ্ধবের শিবসেনা বাল ঠাকরের পুরনো মতাদর্শ ত্যাগ করে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। আগামী দিনে তারা কংগ্রেসে মিশে যাবে। তাই তাঁরা দল ছাড়তে চান (যদিও ইতিমধ্যেই সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন উদ্ধব)। দলত্যাগ বিরোধী আইন বলছে, কোনও রাজনৈতিক দলের টিকিটে নির্বাচিত সাংসদ-বিধায়কদের দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি সদস্য মনে করলে অন্য দলে যোগ দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে দলত্যাগবিরোধী আইন কার্যকর হবে না। ফলে শিন্দসেনার হয়ে লোকসভার ট্রেজারি বেঞ্চে বসতে তাঁদের কোনও বাধা রইল না।
১৯৬৬ সালে হিন্দুত্ববাদী আদর্শ এবং মরাঠি মানুষের স্বার্থরক্ষার যে অঙ্গীকার করে বালাসাহেব নয়া দল ‘শিবসেনা’ গড়েছিলেন, অতীতেও তাতে কয়েক বার ভাঙন ধরেছে। কিন্তু সে সব ক্ষেত্রে দলের ‘আদর্শ ‘ছিনতাই’-এর সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। ছগন ভুজবল, নারায়ণ রানে, সঞ্জয় নিরুপম, গনেশ নায়েকের মতো বিদ্রোহী হেভিওয়েট মরাঠি নেতারা সে চেষ্টা করেনওনি। কারণ, বিপরীত আদর্শের দল কংগ্রেস বা এনসিপি-তে নাম লিখিয়েছিলেন তাঁরা। সে দিক থেকে দেখতে গেলে, প্রথম বার সেই দাবি শোনা গিয়েছিল রাজ ঠাকরের মুখে। বালাসাহেবের জীবদ্দশাতেই ২০০৬ সালে তাঁর প্রিয় ভাইপো রাজ শিবসেনার সঙ্গ ছেড়ে নিজের দল মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা (এমএনএস) গড়েছিলেন। পিতৃব্যের নামে একটিও অভিযোগ না করলেও, প্রকাশ্যে উদ্ধবের ‘নেতৃত্বগুণ’ নিয়ে কটাক্ষ করেছিলেন তিনি। সুবক্তা রাজ রাজনীতিতে এসেছিলেন উদ্ধবের অনেক আগে। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতাও ছিল সুবিদিত।
কিন্তু প্রাথমিক ভাবে মরাঠি জনসমাজে ঢেউ তুললেও দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতিতে সফল হতে পারেননি রাজ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বালাসাহেব তখনও জীবিত থাকায় রাজের ‘কাজ’ তুলনামূলক ভাবে অনেকটাই কঠিন ছিল। বাস্তব পরিস্থিতি বিচার না করে কট্টরপন্থী অবস্থান নেওয়া এবং হিংসাত্মক আন্দোলনের কারণে ক্রমশ মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে রাজ কোণঠাসা হয়ে পড়েন বলেও ওই অংশের মত। তা ছাড়া, আর এক হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপিকে পাশে পাননি তিনি। যেমনটা ২০২২ সালে পেয়েছিলেন শিন্দে। চলতি বছর বৃহন্মুম্বই পুরসভার ভোটে উদ্ধবের সঙ্গে জোট গড়েও সাফল্য পাননি রাজ। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী বিজেপি-শিন্দেসেনা জোটের দখলেই গিয়েছে।
প্রসঙ্গত, মহারাষ্ট্রে ২০১৯ সালে বিধানসভা নির্বাচনে জোট করে লড়েছিল শিবসেনা এবং বিজেপি। ভোটের পরই জোট ভাঙে। বিজেপির সঙ্গ ছেড়ে শরদ পওয়ারের এনসিপি এবং কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলান উদ্ধব। গোড়ায় এনসিপি বিধায়ক এবং শরদের ভাইপো অজিত পওয়ারের সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী হন বিজেপির দেবেন্দ্র ফডণবীস। কিন্তু সে সরকার দিন দুয়েকের বেশি টেকেনি। এর পর শিবসেনা, এনসিপি এবং কংগ্রেসের জোট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন উদ্ধব। শিন্দেকে তিনি নগরোন্নয়ন ও পূর্ত দফতরের দায়িত্ব দেন। মহারাষ্ট্রের রাজনীতির বাইরে শিবসেনা নেতা শিন্দের তেমন কোনও পরিচিতি ছিল না ২০২২-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত। ওই বছর ২০ জুন একদল শিবসেনা বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তিনি শিরোনামে। প্রথমে গুজরাত, তার পর অসম, এবং তার পর গোয়া— তিন বিজেপি শাসিত রাজ্যে বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের সঙ্গে নিয়ে তিনি উদ্ধবের সঙ্গে দর কষাকষি চালাতে থাকেন। এক সময় বোঝা যায়, শিবসেনার অধিকাংশ বিধায়কই তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। অতঃপর নিরুপায় উদ্ধবের ইস্তফা। ৩০ জুন, ২০২২ বিজেপিকে সঙ্গে নিয়ে নতুন সরকার গড়েন শিন্দে। উপমুখ্যমন্ত্রী হন বিজেপির ফডণবীস। ২০২৪-এর বিধানসভা ভোটের পরে বিজেপি তাঁকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব না-ছাড়ায় শিন্দে ‘অন্য সমীকরণে’ সক্রিয় হয়েছেন বলে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি এনডিএ জোটেই থেকে যান।