Budget allocation for the Minority Affairs and Madrasa Education

মাদ্রাসা-শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেও পিছোতে হয়েছিল বুদ্ধকে! প্রথম বাজেটেই মমতার বরাদ্দ করে যাওয়া অর্থ অর্ধেক করল বিজেপি

সীমান্তবর্তী এলাকার মাদ্রাসাগুলি ‘জঙ্গি তৈরির আঁতুড়ঘর’ বলে মন্তব্য করে দলের মধ্যেই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে। মাদ্রাসাগুলিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার কাজও সবটা করে উঠতে পারেননি। মাদ্রাসা নিয়ে গোড়া থেকেই কড়া অবস্থান শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬ ২১:১০
WB BJP government has reduced the allocation for the Minority Affairs and Madrasa Education sectors in the state budget

(বাঁ দিক থেকে) বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রাজ্যে ক্ষমতার হাতবদল হতেই সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের বাজেট বরাদ্দ এক ধাক্কায় কমল সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি। ভোটের আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে পেশ করা অন্তর্বর্তী বাজেটে (ভোট অন অ্যাকাউন্ট) গোটা অর্থবর্ষের জন্যই এই দফতর খাতে ৫৭১৩.৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। সোমবার স্বপন দাশগুপ্তের পেশ করা পূর্ণাঙ্গ বাজেটে সেই বরাদ্দের পরিমাণ কমে হয়েছে ২১৬৫.৪২ কোটি টাকা।

Advertisement

এ রাজ্যে মাদ্রাসা শিক্ষা বরাবরই স্পর্শকাতর বিষয়। ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির টানে এত দিন কোনও শাসক দলই তাতে হাত দেয়নি। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার অল্প দিন পরেই মাদ্রাসাগুলির শিক্ষাব্যবস্থাকে মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার একটা চেষ্টা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘‘মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষা দিন তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু তার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষাও দিতে হবে। যেমন রামকৃষ্ণ মিশন দেয়। কিন্তু মাদ্রাসা নিয়ে আমাদের কাছে এমন কিছু খবর আসছে যা উদ্বেগজনক।’’ রাজ্যে অনুমোদনহীন খারিজি মাদ্রাসাগুলি সন্ত্রাসবাদীদের আঁতুড়ঘর বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি। এই মন্তব্য ঘিরে তখন তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল। পার্টির চাপে সে যাত্রা পিছু হটতে হয়েছিল বুদ্ধবাবুকে।

পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৩ সালে মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নতি এবং তাকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কিদওয়াই কমিটি গড়েছিল বুদ্ধদেব সরকার । সিপিএমের এক সংখ্যালঘু নেতার কথায়, ‘‘সেই সুপারিশ সবটা বাস্তবায়িত করা যায়নি। তাতে জ্যোতিবাবুরও আপত্তি ছিল। তিনি দলকে এবং বুদ্ধদাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, তাড়াহুড়ো করে এগুলো করলে ভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হবে।’’ ফলে বুদ্ধদেবের ইচ্ছা থাকলেও উপায় ছিল না।

বাম জমানাতেই জেলাওয়াড়ি সরকারি মাদ্রাসার গোড়াপত্তন হয়েছিল। বর্তমানে রাজ্যে ইংরাজি মাধ্যম সরকারি মাদ্রাসার সংখ্যা ১৩টি। সরকার পোষিত মাদ্রাসা রয়েছে ৬১০টি। পঞ্চায়েত চালিত এমএসকে মাদ্রাসা ৫০০-র কাছাকাছি। এর বাইরেও বহু মাদ্রাসা ছিল যেগুলির কোনও সরকারি অনুমোদন ছিল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পরে এই ধরনের ৬৫০টি মাদ্রাসাকে সরকার পোষিত মাদ্রাসায় রূপান্তরিত করা হয়। সংখ্যালঘু উন্নয়ন এবং মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে বরাদ্দও বাড়ানো হয়, অন্তত খাতায়কলমে।

গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী বাজেট পেশের সময় এই বরাদ্দ ঘিরে তৎকালীন শাসক দল ও বিরোধীদের মধ্যে তীব্র চাপানউতর হয়েছিল। ২০২৫-২০২৬ অর্থবর্ষের তুলনায় চলতি অর্থবর্ষে সংখ্যালঘু উন্নয়ন এবং মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে ২০ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধি করার কথা জানিয়েছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। বিধানসভা কক্ষেই ‘বিশেষ সম্প্রদায়কে তোষণের’ অভিযোগে সরব হয়েছিল বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল। সেই সময়ের পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘আমরা ক্রিমিন্যাল নই।’’ ববির পাশে দাঁড়িয়ে মমতা বলেছিলেন, ‘‘একটা সম্প্রদায়কে হেয় করা হচ্ছে এ সব মন্তব্য করে।’’

ফলে বিজেপি ক্ষমতায় এসে যে সংখ্যালঘু খাতে বরাদ্দ কমাবে, তার মধ্যে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু বরাদ্দ কমলেও ফারাক বিশেষ কিছু হবে না বলেই জানাচ্ছেন সরকারি আমলাদের একাংশ। তাঁদের মতে, বরাদ্দ যা-ই ঘোষণা করা হোক না কেন, তৃণমূল আমলে বছর শেষে প্রায় অর্ধেক টাকা খরচ না-হয়ে পড়ে থাকত। ফলে এই সরকার যদি বরাদ্দ টাকা পুরোপুরি খরচ করতে পারে তা হলে বাস্তব পরিস্থিতির বিশেষ হেরফের হবে না। আইএসএফ বিধায়ক তথা ফুরফুরা শরিফের পিরজাদা নওশাদ সিদ্দিকীও বলেছেন, ‘‘গত চারটি অর্থবর্ষে বিগত সরকার বরাদ্দের অর্ধেকও খরচ করতে পারেনি।’’ তবে একই সঙ্গে বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে তাঁর বক্তব্য, এই সরকারও যদি বরাদ্দ অর্থ খরচ করার ক্ষেত্রে গুরুত্ব না-দেয়, তা হলে সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিপন্ন হবে।

বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী তৃণমূলের মুখ্যসচেতক তথা মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামান বলেন, ‘‘নির্দিষ্ট ভাবে একটি সম্প্রদায়কে পিছিয়ে দেওয়ার প্রয়াস দেখা গিয়েছে বাজেটে।’’ একই কথা মমতার তৃণমূলের সঙ্গে থাকা বিধায়ক মদন মিত্রেরও। তাঁর কথায়, ‘‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশের কথা বলে কারও বিকাশ আর কারও বিকাশে বাধা তৈরির প্রতিফলন রয়েছে বাজেটে।’’

ক্ষমতায় এসেই অনুমোদনহীন মাদ্রাসার প্রতি কড়া অবস্থান নিয়েছে বিজেপি সরকার। জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই ধরনের মাদ্রাসায় কারওও সন্তান পড়াশোনা করলে তিনি অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। পাশাপাশি, মাদ্রাসার হালহকিকত নিয়ে জেলাশাসকদের একটি সমীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। কোন জেলায় কটি মাদ্রাসা সরকারের নিয়ন্ত্রণে, কতগুলি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে (ধর্মীয় অনুদানের ভিত্তিতে চলা) তার পরিসংখ্যান জানতে চেয়েছে নবান্ন। আগামী ৫ জুলাই এই রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে ।

Advertisement
আরও পড়ুন