লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। —ফাইল চিত্র।
লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে নোটিস দিল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি (এসপি), ডিএমকের মতো কয়েকটি বিরোধী দল। তাবে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এই উদ্যোগে শামিল হয়নি লোকসভার দ্বিতীয় বৃহত্তম দল তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের লোকসভার দলনেতা হিসাবে অভিষেক মঙ্গলবার জানালেন, কংগ্রেস যে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে চায় তাতে তৃণমূলের সাংসদদের সই করতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু তার আগে বিজেপি-বিরোধী মঞ্চ ‘ইন্ডিয়া’-ভুক্ত দলগুলিকে যৌথ বিবৃতি দিতে হবে।
মঙ্গলবার দুপুরে লোকসভার সচিবালয়ে স্পিকারের বিরুদ্ধে সংসদীয় আইনের ৯৪(সি) ধারায় নোটিস জমা দেন কংগ্রেসের মুখ্য সচেতক কে সুরেশ। সঙ্গে ছিলেন লোকসভায় কংগ্রেসের সহকারী দলনেতা গৌরব গগৈ এবং হুইপ মহম্মদ জাভেদ। ছিলেন এসপি, ডিএমকের প্রতিনিধিরাও। জানা গিয়েছে, লোকসভার সচিব উৎপলকুমার সিংহকে ওই নোটিস খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন স্পিকার। সংসদীয় প্রথা মেনে অনাস্থা প্রস্তাব ঘিরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সভা পরিচালনা করবেন না তিনি। ফলে বাজেট অধিবেশনের প্রথম পর্বের বাকি তিন দিন (বুধ, বৃহস্পতি এবং শুক্র) সংসদের নিম্নকক্ষে দেখা যাবে না ওমকে। সচিবালয় সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই এই নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছেন ওম। লোকসভা সচিবালয় সূত্রের খবর, মার্চ মাসে বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বে অনাস্থা নোটিসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কেন আনা হল অনাস্থা?
বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, লোকসভার বাজেট অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদজ্ঞাপন পর্বে রাহুল-সহ বিরোধী দলের বিভিন্ন সাংসদকে বক্তৃতা করতে দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি আট জন সাংসদকে নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে। এই দুই ঘটনার প্রতিবাদেই স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে, অনাস্থা প্রস্তাবের জন্য ওই নোটিসে বিরোধী শিবিরের ১১৮ জন সাংসদ স্বাক্ষর করেছেন। তাতে কংগ্রেসের পাশাপাশি ডিএমকে এবং সমাজবাদী পার্টি, শিবসেনা (উদ্ধব), এনসিপি (শরদ), আরজেডি এবং বামপন্থী সাংসদেরাও স্বাক্ষর করেছেন। তবে তৃণমূল সাংসদেরা ওই অনাস্থা প্রস্তাবে সই করেননি।
সোমবার সকালে সকালে ‘ইন্ডিয়া’র নেতাদের বৈঠকে স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। কংগ্রেস জানায়, মূলত চারটি কারণে প্রস্তাব আনার কথা ভাবা হয়েছে—
১. লোকসভায় বক্তৃতা করতে দেওয়া হচ্ছে না বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে। প্রাক্তন সেনাপ্রধান এমএন নরবণের অপ্রকাশিত বইয়ের পাতা থেকে উদ্ধৃত করে সরকারের সমালোচনার পরে এক সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। মুখ খুলতে পারেননি লোকসভার বিরোধী দলনেতা।
২. স্পিকারের দাবি ছিল, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদজ্ঞাপন বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী জবাবি ভাষণ দিতে এলে তাঁর উপরে হামলা চালাতে পারেন বিরোধী শিবিরের মহিলা সাংসদেরা। আজ প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢ়রা-সহ কংগ্রেসের মহিলা সাংসদেরা স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি লিখে এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, “বিরোধীদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস নেই প্রধানমন্ত্রীর।’’
৩. বিরোধী আট সাংসদকে অধিবেশনের বাকি সময়ের জন্য একতরফা ভাবে সাসপেন্ড করা।
৪. বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে লোকসভায় ভাষণের সময়ে বইয়ে প্রকাশিত তথ্য পাঠ করতে বারণ করা হলেও, বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবেকে বই দেখে বলতে দেওয়া। স্পিকারের চেয়ার কেন কোনও আপত্তি জানায়নি তা নিয়ে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ তুলেছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। একাধিক গুরুতর ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত তাঁর বক্তৃতায় জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করলেও স্পিকার তাঁকে বিরত করেননি বলে অভিযোগ।
অনাস্থা-উদ্যোগে কেন নেই তৃণমূল?
তৃণমূল যে এই অনাস্থা প্রস্তাবের নোটিসে স্বাক্ষর করবে না, সেই আভাস আগেই মিলেছিল। মঙ্গলবার দুপুরেই লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দেন, কংগ্রেস যে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে চায় তাতে তৃণমূলের সাংসদদের সই করতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু তার আগে বিজেপি-বিরোধী মঞ্চ ‘ইন্ডিয়া’-ভুক্ত দলগুলির যৌথ বিবৃতি দাবি করেছেন অভিষেক। জানিয়ে দেন, সে প্রক্রিয়া মানলে তবেই তৃণমূল তাতে সই করবে।
অভিষেক মঙ্গলবার বলেন, ‘‘স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে সই করতে আপত্তি নেই। ‘ইন্ডিয়া’র দলগুলো সই করে একটা চিঠি লোকসভার স্পিকারকে দিক। যে চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে অনাস্থা প্রস্তাব আনার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলিই লিখিত ভাবে জানানো হোক স্পিকারকে। তিনি তিন দিনের মধ্যে সদুত্তর না-দিলে, তার পর শুক্রবার অনাস্থা প্রস্তাব আনা হোক।’’ চলতি বাজেট অধিবেশনে কংগ্রেসের সঙ্গে কক্ষ সমন্বয়ের প্রশ্নে তৃণমূলের সেই সখ্য দেখা যাচ্ছে না। সেই সূত্রেই প্রশ্ন উঠছিল, তৃণমূল কি অনাস্থা প্রস্তাবের প্রশ্নে কংগ্রেসের সঙ্গে সচেতন দূরত্ব তৈরি করতে চাইছে? অভিষেক স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কংগ্রেস যে ভাবে বলবে সে ভাবে তৃণমূল চলবে না। তাদেরও স্বাধীন বক্তব্য রয়েছে।
কেন এ কথা তিনি বলছেন, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। অভিষেকের কথায়, ‘‘কংগ্রেসের ৮ জন সাংসদকে স্পিকার নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করেছেন। চিঠি দিয়ে বলা হোক তা প্রত্যাহার করতে। তিন দিন সময় দেওয়া হোক। না-করলে তখন আনা হোক অনাস্থা প্রস্তাব।’’ অভিষেকের আরও সংযোজন, ‘‘এটাই তো নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আমাদের পার্থক্য। ভুল করলে তাঁকে সুযোগ তো দিতে হবে।’’ তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা হিসাবে অভিষেক এ-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যদি চিঠি দিয়ে, তিন দিন সময় দিয়ে কংগ্রেস অনাস্থা প্রস্তাব আনে, তৃণমূল তাতে সই করবে। কিন্তু যদি তড়িঘড়ি কংগ্রেস এই প্রস্তাব আনতে চায়, তা হলে তাতে তৃণমূল সই করবে না।
কংগ্রেসের পদক্ষেপে আপত্তি নেই জানিয়েও তৃণমূলের এই শর্ত দেওয়াকে জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধী পরিসরের সমীকরণে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে অভিমত অনেকের। তাঁদের বক্তব্য, বাজেট অধিবেশনে তৃণমূল সলতে পাকাতে শুরু করেছে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার বিষয়ে। কিন্তু সে ব্যাপারে কংগ্রেস, বিশেষ করে রাহুল গান্ধী তেমন ‘উৎসাহ দেখাননি’। সেই সূত্রেই অনেকে মনে করছেন, লোকসভার স্পিকারের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের উদ্যোগে আনা অনাস্থা প্রস্তাবের দৌত্যে তৃণমূলও শর্ত চাপিয়ে রাখল। একই সঙ্গে কৌশলে জুড়ে নিতে চাইল ‘ইন্ডিয়া’-ভুক্ত দলগুলিকেও।