প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। — ফাইল চিত্র।
এক বছর দেশবাসীকে সোনা কেনায় লাগাম পরাতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বাঁচাতে বলেছেন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার (ফরেক্স)। কিন্তু কেন এই পদক্ষেপের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী? বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত মহল বলছে, বিদেশ থেকে সোনা আমদানি করতে যে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় কেন্দ্রীয় সরকারের, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাতেই রাশ টানতে চাওয়া হচ্ছে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে (১ মে পর্যন্ত) ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার ৭৭৯ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলার কমে গিয়েছে, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা। তার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার এখন হয়েছে দেশে ৬৯,০৬৯ কোটি ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬৫ লক্ষ ২৪ হাজার কোটি টাকা।
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে তেলের দাম বেড়েছে। বেড়েছে আমদানির খরচও। আমদানি-রফতানি ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সোনা আমদানির খরচও বেড়েছে। তার ফলে চাপ পড়ছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডারে। এই আবহে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে আপাতত এক বছর সোনা কিনতে বারণ করেছেন।
কেন সোনা ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
পৃথিবীতে সোনা কেনার ক্ষেত্রে ভারত অগ্রগণ্য। প্রতি বছর এ দেশের মানুষ ৭০০ থেকে ৮০০ টন সোনা কেনেন। কিন্তু এ দেশে সোনা মেলে মাত্র এক থেকে দু’টন। অর্থাৎ, প্রয়োজনের ৯০ শতাংশ সোনা তাদের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এত সোনা আমদানি করা হলেও তার প্রভাব কিন্তু এ দেশের শিল্পোৎপাদনে পড়ে না। উল্টে সোনা আমদানি করতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়।
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারত ৭২০০ কোটি ডলারের সোনা আমদানি করেছে। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তা ছিল ৫৮০০ কোটি ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪ লক্ষ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। ওই বছরের থেকে গত বছরে সোনা আমদানি বেড়েছিল ২৪ শতাংশ। ভারত বিদেশ থেকে যত পণ্য আমদানি করে, তার ৯ শতাংশই হল সোনা। সবচেয়ে বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করে অপরিশোধিত তেল। তার পরেই রয়েছে সোনা। এখন শুল্ক, লেভি-সহ ৬ শতাংশ আমদানি কর রয়েছে।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মোদীর অনুরোধ, বাড়িতে যা-ই অনুষ্ঠান থাকুক, আগামী এক বছর কোনও সোনার গয়না কেনা চলবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সোনা কেনাতেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়। এক সময়ে সঙ্কটময় পরিস্থিতি বা যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে লোকে দেশহিতে সোনা দান করে দিত। এখন দান করার দরকার নেই। কিন্তু এক বছর বাড়িতে যে অনুষ্ঠানই হোক, আমরা সোনার গয়না কিনব না— দেশহিতে আমাদের এই সঙ্কল্প করতে হবে। আমরা সোনা কিনব না, বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে হবে।”
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে মোদীর দেশবাসীকে করা এই অনুরোধ ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলেই মনে করা হচ্ছে। অস্থিরতার কারণে পৃথিবী জুড়ে তেলের দাম বেড়েছে। তার ফলে চাপ পড়েছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে। সূত্রের খবর, এই আবহে সেই চাপ কমাতে নীতিপ্রণয়ণকারীদের একাংশ মনে করছেন, বিদেশ থেকে তুলনায় কম প্রয়োজনীয় পণ্য, সোনা আমদানিতে লাগাম পরানো দরকার। তা হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে চাপ কিছুটা কমবে। কারণ, এ দেশের মানুষজন বিয়ে থেকে যে কোনও অনুষ্ঠানে সোনা কেনেন। তা কমালে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে কোপ কম পড়বে।
প্রসঙ্গত, মোদী যখন এই কথা বলছেন দেশবাসীকে, তার আগেই দেশে সোনার আমদানি অনেকটাই কমে গিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বিদেশ থেকে প্রায় ১০০ টন সোনা আমদানি করেছিল ভারত। ফেব্রুয়ারি মাসে তা কমে হয়েছে ৬৫-৬৬ টন। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ থেকেই ইরানের সঙ্গে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের সংঘাত শুরু হয়েছে। মার্চ মাসে ভারতের সোনা আমদানি কমে হয়েছে ২০ থেকে ২২ টন। এপ্রিলে ভারত সোনা আমদানি করেছে ১৫ টন। অতিমারির সময় ছাড়া গত ৩০ বছরে ভারতের সোনা আমদানি এতটা কমেনি।