পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর শখ অনেকেরই আছে। আর যেখানেই যান, আঞ্চলিক খাবারটিও চেখে দেখতে ভালবাসেন তাঁরা। তবে, খাবার পরিবেশনের পর যদি প্লেটে পড়ে থাকা খাবারটির দিকে তাকালেই ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় হয়, তা হলে কি সেই পদটি মুখে তুলে নিতে পারবেন?
কারও দেখলেই ভয় করে, আবার অনেকে সেই খাবারই চেটেপুটে খান। বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন খাবারের পদ রয়েছে অসংখ্য। বিদেশ-বিভুঁইয়ে যাওয়ার আগে বিশ্বের কোন প্রান্তে, কোন খাবারটি দেখলে ভয় করতে পারে, তা জেনে নিলে ক্ষতি কী! সেই পদটি আপনার বড্ড ভাল লেগে গেল, এও তো হতে পারে।
তাই-হুয়ে-কুয়ে: চিনের তাইওয়ান শহরের ‘স্ট্রিট ফুড’ এই খাবার। এটি দেখতে লাল রঙের ছোট ছোট কেকের মতো। কাঠিতে করে বিক্রি করা হয়। পদটি আদতে তৈরি হয় শূকরের রক্ত দিয়ে।
শূকরের রক্তের সঙ্গে স্টিকি রাইস আর বাদামের মিশ্রণ মিশিয়ে কেক বা পুডিংয়ের মতো বানানো হয়। পরিবেশন করা হয় সসের সঙ্গে। তাইওয়ানের রাস্তার ধারে বসে খাবার বিক্রেতারা গরম গরম এই খাবারটি পরিবেশন করেন।
কুমিরের মাংসের স্টেক: কুমিরের মাংসের স্টেক অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা (যেমন কেনিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা) এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (থাইল্যান্ড ও ফিলিপিন্সসহ) এর মতো দেশগুলিতে খাওয়া হয়। এই মাংস চর্বিহীন ও উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ। এর স্বাদ নাকি অনেকটা মুরগি ও মাছের স্বাদের মিশ্রণের মতো।
এই পদ বানানোর সময় গোটা কুমিরের গায়ে নানা রকম মশলা মাখিয়ে কয়লার উপরে ঝলসানো হয়। রাস্তার ধারে দোকানগুলিতে আস্ত ঝলসানো কুমিরকেই সাজিয়ে রাখা হয়, তার পর ছোট ছোট টুকরো করে পরিবেশন করা হয়।
গডজ়িল্লা র্যামেন: চিনের তাইওয়ান প্রদেশে এই খাবারটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে শেষ কয়েক বছরে। র্যামেনের সঙ্গে ৪০টিরও বেশি মশলাপাতি, কোয়েল পাখির ডিম, বেবি কর্ন, শূকরের মাংস এবং বাঁশের কোঁড় (ব্যাম্বু শুট) মিশিয়ে এই পদটি তৈরি করা হয়।
পদটি পরিবেশন করা হয় একটি বিশাল মাপের বাটিতে। এই পদের মূল আকর্ষণ হল, কুমিরের সামনের পায়ের একটি আস্ত অংশ ভাপিয়ে র্যামেনের উপর পরিবেশন করা হয়- যা বাটি থেকে বাইরের দিকে ঝুলে থাকে।
গ্রিল্ড পিগ নোজ়: ভিয়েতনামের জনপ্রিয় ‘স্ট্রিট ফুড’-এর তালিকায় রয়েছে এই খাবারটি। শূকরের শরীরের বিভিন্ন অংশ খাওয়া হয় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত। তবে ভিয়েতনামে গেলে দেখতে পাবেন শূকরের নাক কেটে তাতে ঝাল-ঝাল মশলা মাখিয়ে গ্রিলারে গ্রিল করে রাস্তার ধারে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হচ্ছে।
এক ঝলকে দেখলে ভয় লাগতে পারে, অনেকের আবার গা ঘিনঘিনও করতে পারে। তবে ভিয়েতনামের বাসিন্দারা এই খাবারটি চেটেপুটে খান। শুধু ভিয়েতনামের বাসিন্দারা নয়, চিনেও এই খাবারটি বেশ জনপ্রিয়।
বালুট: ডিম খেতে অনেকেই ভীষণ পছন্দ করেন। তবে, বালুট নামে ফিলিপিন্সের জনপ্রিয় ডিমের পদটি দেখলে একটু অদ্ভুত লাগতেই পারে। খেতে গিয়ে ডিমের খোলস ফাটিয়ে দেখতে পাবেন হাসের ভ্রুণ! বালুট তৈরিই করা হয় ভ্রুণ তৈরি হয়ে গিয়েছে এমন ‘জীবন্ত’ ডিম দিয়ে।
ডিমগুলি আধসেদ্ধ করে খোলস সমেতই পরিবেশন করা হয়। সঙ্গে দেওয়া হয় ভিনিগার, লঙ্কা, রসুন আর নুন ডিয়ে তৈরি একটি মিশ্রণ। ডিমের খোলস অল্প করে ভেঙে মিশ্রণটি উপরে ছড়িয়ে খেতে হয় বালুট। ফিলিপিন্স ছা়ড়াও কম্বোডিয়া, তাইল্যান্ড আর ভিয়েতনামেও বালুট খাওয়ার চল রয়েছে।
সান-নাকজ়ি: অক্টোপাস খেতে গিয়ে যদি দেখেন থালাতেই সেগুলি চলাফেরা করছে, তা হলে কী করবেন? সান-নাকজ়ি পদটি মূলত তৈরি করা হয় ছোট আকারের কাঁচা অক্টোপাস দিয়ে। এই খাবারটি কোরিয়াবাসীদের খুবই প্রিয়।
পদটি বানানোর ঠিক আগে অক্টোপাসগুলি ছোট ছোট করে কেটে তার উপর ভাজা সাদা তিল আর তিলের তেল ছড়িয়ে পরিবেশন করা হয়। পরিবেশনের পরেও অক্টোপাসগুলিতে ‘প্রাণ’ থাকে। সেগুলি থালার উপরেই নড়েচড়ে বেড়ায়। এই পদের সঙ্গে তিল তেল, নুন, সয়া সস্, ভিনিগার আর গচুজাং লঙ্কা দিয়ে তৈরি একটি ডিপের সঙ্গে।
টুনা আই স্যুপ: জাপানিরা টুনা মাছের চোখ খেতে ভীষণ পছন্দ করেন। নুন, সয়া সস্ মাখিয়ে সেদ্ধ করেই খাওয়া হয় টুনা মাছের চোখ। এ ছাড়াও টুনা মাছের চোখ দিয়ে তৈরি স্যুপ জাপানিদের বড্ড প্রিয়।
ভাবুন তো স্যুপের মধ্যে জ্বলজ্বল করবে এক জোড়া চোখ! ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিতে পারে কারও কারও। আদা, সয়া সস সহ রকমারি মশলা দিয়ে একটি বড় পাত্রে স্যুপ বসানো হয়। তার পর খুব সাবধানে স্যুপের মধ্যে মাছের চোখগুলি ঢালা হয়। মিনিট ২০ সেদ্ধ করে সেই স্যুপ পরিবেশন করা হয় গরমাগরম।
মাকড়সা ভাজা: মাকড়সা দেখলেই প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যায় অনেকের। আর সেই মাকড়সাই খাওয়ার থালায় যদি মুচমুচে করে ভেজে পরিবেশন করা থালায়। কম্বোডিয়ায় এই দৃশ্য দেখা যায় ঘরে ঘরে। তবে সব রকম মাকড়সা নয়, একটি বিশেষ প্রজাতির মাকড়সাই খাবারযোগ্য।
ডিম, কর্নফ্লাওয়ার, বেকিং সোডা, নুন আর ঠান্ডা জল দিয়ে একটি মিশ্রণ বানিয়ে মাকড়সাগুলিকে সেই মিশ্রণ ঢোবানো হয়। তার পর মুচমুচে করে ভেজে পেপরিকা, নুন আর রসুনের গুঁড়ো ছড়িয়ে পরিবেশন করা হয়।
আরশোলার টেম্পুরা: ‘আরশুলা মুখে দিয়ে সুখে খায় চীনারা, কত কি যে খায় লোকে নাহি তার কিনারা।’ ‘খাইখাই’ ছড়ায় লিখেছিলেন সুকুমার রায়। বাস্তবেও রয়েছে এমন খাবার। চিনা রেস্তরাঁয় গিয়ে প্রণ টেম্পুরা নিশ্চয়ই খেয়েছেন, তবে চিংড়ির বদলে যদি আরশোলার টেম্পুরা পরিবেশন করা হয়, তা হলে অনেকেই হয়তো টেবিল ছেড়ে উঠে পড়তে পারেন। তবে চিনাদের কাছে আরশোলার টেম্পুরা বড় প্রিয়।
এই পদ বানানোর জন্য প্রথমে মৃত আরশোলাগুলিকে সেদ্ধ করা হয়। তার পর পাখা আর ডানাগুলি ছেঁটে ফেলে টেম্পুরার ব্যাটারে ডোবানো হয়। তার পর ডুবো তেলে ভেজে তুলে নেওয়া হয়।
জুগো দে রানা: ‘ব্যাঙ খায় ফরাসিরা (খেতে নয় মন্দ), বার্মার ‘ঙাপ্পি’তে বাপ্ রে কি গন্ধ!’ সুকুমার রায়ের ‘খাইখাই’ ছড়ায় এমন উল্লেখও আছে। তবে শুধু ফরাসিরা নয়, পেরুর লোকেরাও ব্যাঙ দিয়ে স্মুদি বানিয়ে খেয়ে থাকেন। অনেক রকম স্মুদি খেয়ে থাকবেন, তবে ব্যাঙ দিয়েও যে স্মুদি বানানো যায়, সে কথা ভেবেছেন কখনও! পেরুতে এই পানীয়টি বেশ জনপ্রিয়। সেদ্ধ করা চামড়া ছাড়ানো ব্যাঙের সঙ্গে, অ্যালো ভেরা, মধু, আর রকমারি হার্বস মিশিয়ে পানীয়টি তৈরি করা হয়।
পেরুর আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে আগে পথ্য হিসাবে এই পানীয়টি খাওয়ার চল ছিল। অ্যানিমিয়া বা হাঁপানির রোগীদের এই পানীয় দাওয়াই হিসাবে খাওয়ানো হত। যদিও এর কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
সাপের হৃদ্যন্ত্র: সাপের হৃৎপিণ্ড সাধারণত রান্না করা হয় না, বরং এটি কাঁচা ও স্পন্দমান অবস্থায় খাওয়া হয়। ভাবছেন তো কোথায় এমন খাবার মেলে। ভিয়েতনামের বিভিন্ন আঞ্চলিক বাজারগুলিতে এই খাবারটি পাওয়া যেতে পারে।
সাধারণত রাইস ওয়াইনে ডুবিয়ে সাপের হৃৎপিন্ড খাওয়ার চল আছে। হৃদপিণ্ডটি সতর্কতার সঙ্গে বার করে নেওয়া হয় এবং সেটিকে সরাসরি একটি খালি ‘শট গ্লাস’-এ রাখা হয় অথবা স্থানীয় চালের তৈরি মদ কিংবা ভিয়েতনামি ভদকা ভর্তি ছোট একটি পাত্রে ফেলা হয়।
সব ছবি: সংগৃহীত।