সাবেক বাঙালি রান্না হোক কিংবা মোগলাই, তাই, চাইনিজ়, কন্টিনেন্টাল— রান্নায় ঠিক মশলা ব্যবহার করলে স্বাদ, ঘ্রাণ হয় অতুলনীয়। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ে দেখা যায়, রান্নার সময়ে হাতের কাছে প্রয়োজনের মশলাটাই নেই! কখনও দারুচিনি আছে তো এলাচ নেই। কখনও আবার লবঙ্গ মেলে তো মেলে না গরমমশলা গুঁড়ো। তবে যদি বাগানেই থাকে এমন মশলার গাছ?
হেঁশেল বাগানে লঙ্কা, কারিপাতা, ধনেপাতা জনপ্রিয় হলেও গোলমরিচ, অলস্পাইস, তেজপাতার ফলনও ভালই হয়। দরকারের সময়ে ব্যবহার করে নেওয়া যায় চট করে। রইল এমন কিছু মশলাগাছের হদিস।
তেজপাতা
পোলাও থেকে নিরামিষ আলুর দম— প্রায় সব ধরনের রান্নাতেই ফোড়ন হিসেবে তেজপাতা ব্যবহার করা যায়। গাছটিও একেবারে নির্ঝঞ্ঝাটে বেড়ে উঠতে পারে বাড়ির কোনও কোণে বা বাগানে। উদ্যানবিদ পলাশ সাঁতরা জানাচ্ছেন, তেজপাতা গাছ করতে বড় টব বা অন্তত ৫ গ্যালন বা তার চেয়ে বড় ড্রামের মধ্যে চারা রোপণ করতে হবে। রোদ-বৃষ্টিতে ভাল ভাবেই এ গাছ বেড়ে উঠতে পারে। তবে সরাসরি কড়া রোদের মধ্যে না রেখে যদি একটু ছায়ায় রাখা হয়, তা হলেও দিব্যি বেড়ে ওঠে এই গাছ। কাজেই কিচেন গার্ডেনের জন্য আদর্শ এটি। তেজপাতা গাছের পরিচর্যায় গুরুত্বপূর্ণ হল নিয়মিত ‘টপিং’ করা। অর্থাৎ গাছটি উচ্চতায় বেশি বেড়ে গেলেই (৫ ফুট বা তার বেশি) মাথার দিক থেকে কেটে ফেলা। বছরে অন্তত এক বার যদি এই পদ্ধতি ব্যবহার করে গাছের উচ্চতা কমিয়ে আনা যায়, তা হলে গাছটি বাড়বে ভাল ভাবে। রোগ-জীবাণুও হবে কম।
অলস্পাইস
বাজারে যে প্যাকেটজাত গরমমশলা মেলে, ঠিক তেমনই ঘ্রাণ-স্বাদ যদি মিলত কোনও গাছের পাতা থেকে? অলস্পাইস গাছ বাড়িতে থাকলে ঠিক এটাই সম্ভব! অনেকেই মনে করেন, এই গাছের পাতা রান্নায় ব্যবহার করলে প্যাকেটজাত মশলার চেয়ে বহু গুণ ভাল স্বাদ-গন্ধ আসে। এক-দু’টি কাঁচা পাতা রান্নায় দিলেই কাজে দেয় বেশ। টবে বা খোলা জায়গায় এই মশলা গাছের চারা লাগিয়ে ফেলা যায়। পরিচর্যায় গোবর সার, পর্যাপ্ত জল, রোদ পেলেই ভাল ভাবে বাড়ে গাছটি। তবে যদি কোনও কারণে পাতা হলুদ হয়ে আসে, তখন পটাশ বা ফসফেট জাতীয় সার দেওয়া যেতে পারে। ১০-২৬-২৬-সারও বেশ কার্যকর। ঠিক মতো যত্ন পেলে ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত বাঁচে অলস্পাইস গাছ।
গোলমরিচ
গ্রিন পেপার অর্থাৎ কাঁচা অবস্থায় হোক বা ব্ল্যাক পেপার, এই মশলা প্রদাহনাশক হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। অ্যান্টি অক্সিড্যান্টসও থাকে প্রচুর পরিমাণে। ফোড়নে ব্যবহার করলে খাবারের স্বাদ বাড়ে কয়েকগুণ। গোলমরিচ গাছ লাগাতে প্রথমে ৬-৭ ফুট লম্বা কাঠি কিংবা পাইপ পুঁতে নিতে হবে টবে। গোলমরিচের চারাটি এই পাইপের সাহায্যেই বেড়ে ওঠে। খুব বেশি রোদ না পেলেও ফলনের ক্ষতি হয় না। তবে নিয়মিত জল দেওয়া ও সেটির নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আবশ্যিক। না হলে ফলন ভাল হবে না। চারা রোপণের সময়ের এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই ফল দেখা দিতে পারে।
এলাচ
ঘন দুধ-চায়ে অল্প থেঁতো করা এলাচ মেশালে তার স্বাদ-গন্ধ হয় অতুলনীয়। ফল ছাড়াও এলাচ গাছের পাতাতেও সুবাস হয়। এলাচের চারা টবে বসানোর আগে কোকোপিট ও ভার্মিকম্পোস্ট মিশিয়ে মাটি তৈরি করে নিলে গাছের স্বাস্থ্য হবে ভাল। এই গাছের পর্যাপ্ত পরিমাণে রোদ লাগে, কাজেই খোলা আকাশের নীচে টবটি রাখতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়। সঙ্গে প্রচুর জলও দরকার হয়। তবে মাটি বেশি ভিজে না থাকাই শ্রেয়।
লবঙ্গ
গোটা গরমমশলার আর এক জরুরি উপাদান হল লবঙ্গ। অনেকই মনে করেন, শুকনো কাশি বিব্রত করলে একটি লবঙ্গ মুখে রাখলে কাশি কম হয়। আমাদের রাজ্যে যেমন জলবায়ু, সেখানে এই গাছ করলে তা ২৫-৩০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। টবেও ছোট করে করা যায়, কিন্তু সে ক্ষেত্রে টব বাছাই সাবধানে করতে হবে। বড় মাপের টব হলে গাছের স্বাস্থ্য ভাল হবে। গাছটি বসানোর অন্তত ১০-১৫ দিন আগে যদি মাটিতে পচানো গোবর সার মিশিয়ে তা তৈরি করে নেওয়া যায়, তা হলে গাছ ভাল হয়। একবার ভাল ভাবে বাড়তে শুরু করলে ৮০ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত বাঁচতে পারে এই গাছ। রাসায়নিক সার না দিলেই ভাল।
এই গাছগুলির গোড়া পচে যাওয়া, ছত্রাকজনিত রোগ কিংবা পাতা হলুদ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হয় না। তবু উদ্যানবিদ পলাশের পরামর্শ, পাতা হলুদ হয়ে এলে পটাশ বা ফসফেট জাতীয় সার ব্যবহার করা যায়।জল নিষ্কাশন ব্যবস্থাও ভাল হওয়া উচিত। না হলে গাছের স্বাস্থ্য ভাল থাকবে না।