Eco Print Fashion

প্রকৃতির দানেই সেজে ওঠা যায়, গাঁদা থেকে ভেরেন্ডা, পোশাকে বনের রঙে রূপকথা আঁকতে পারে ইকো-প্রিন্ট

ভাবতেই তো ভাল লাগে, গাঁদা, জবা, গোলাপ, অপরাজিতারা আমাদের পোশাক আলো করবে! আমার মনে তো অজান্তেই গুনগুনিয়ে উঠবে “আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে’’।

Advertisement
শর্মিলা বসুঠাকুর
শর্মিলা বসুঠাকুর
শেষ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ ১০:৫৫
Eco-Print is a new trend in the eco-friendly fashion

বনের রং যখন পোশাকে। —নিজস্ব চিত্র।

বিগত কয়েক বছরে আমাদের জীবনযাত্রায় নানা পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। খাওয়া-পরা, বাজার-হাট, সাজ-পোশাক, পেশার ধরন-ধারণ, কাজের সময় এবং পরিকাঠামো, যাতায়াতের বিধি-ব্যবস্থা সব কিছুই অনেকটা আলাদা। কোভিড জন্ম দিয়েছে ওয়ার্ক ফ্রম হোমের ধারণা। জন্ম নিয়েছে ছকে বাঁধা কাজের মধ্যেও বৈচিত্র। এককথায়, আমাদের সামগ্রিক জীবনধারায় একটা আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের দুটো দিক চোখে পড়ে। এক, সারা দিন, ২৪ ঘন্টা কাজের ব্যস্ততায় আক্ষরিক অর্থে যাকে বলে নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। কম্পিউটারের সামনে বসে কাজে বুঁদ, হঠাৎ ঘড়ির দিকে নজর। রেঁধে বেড়ে খাওয়া অসম্ভব! অর্ডার করো আর খাও। হরেক রকম অ্যাপ মজুত। শরীর-স্বাস্থ্যের চিন্তা করার অবকাশ নেই। দুরন্ত গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখা। জীবনের এই উতল হাওয়া ধীরে বইতে জানে না। পাশাপাশি এর বিপরীত ছবিও চোখে পড়ে, সংখ্যালঘু হলেও।

Advertisement
Eco-Print is a new trend in the eco-friendly fashion

ফ্যাশন তো আর জীবনকে বাদ দিয়ে নয়। —নিজস্ব চিত্র।

এই হন্তদন্ত জীবনই আমাদের এই উল্টোটাও ভাবতে শিখিয়েছে। এই দামাল উতল হাওয়াই চুপি চুপি কানে বলছে, একটু স্থির হও, প্রকৃতির কোলে ফেরত যাও। সহজ স্বাভাবিক জীবনের কোলে বড় আরাম। তাই বিষ মুক্ত হাট, অরগ্যানিক চাষাবাদ, পরিবেশবান্ধব উপাদান, উপকরণে জীবনকে সজীব করে তোলর আশ্বাসে কিছু মানুষ ব্রতী হয়েছেন। এর চেয়ে ভাল আর কী-ই বা হতে পারে! ফ্যাশন তো আর জীবনকে বাদ দিয়ে নয়! তাই এই মঙ্গলবার্তা তার আঙিনাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের এই ধরিত্রীর দেখভাল করার দায়িত্ব তো আমাদেরই। প্রকৃতির কোনও ক্ষতি না করে, প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় না করে পণ্য ও যাপনকে সমৃদ্ধ করে তোলার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে পারলে নির্বিষ, নির্মল, নির্ভার, এক জীবনের ঠিকানায় পৌঁছে যাওয়া যাবে।

তড়িৎ গতির ফ্যাশনে জন্ম নিল ঢিমে লয়, মন্দগতি। আমার মতে, এটি ফ্যাশনের নৈতিক দিক। পোশাক-আশাকের প্রতি , কাপড়ের প্রতি, তাঁতিদের প্রতি সম্মান জানিয়ে উচ্চমানের, টেকসই, প্রাকৃতিক উপাদানে নির্ভরশীলতা দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দেয়।

Eco-Print is a new trend in the eco-friendly fashion

গাঢ় রঙের কসমসও পাল্লা দিতে পারে এই রং-রেখার দৌড়ে। —নিজস্ব চিত্র।

এই দায়িত্ববোধ থেকেই পারমিতা ভট্টাচার্য ইকো প্রিন্ট নিয়ে পরীক্ষ নিরীক্ষা শুরু করেন। নিয়মিত চাকরি ছেড়ে শান্তিনিকেতনের বুকে গড়ে তোলেন 'ডোরি', তাঁর ছোট্ট প্রয়াস। লকডাউনে ভাল থাকার অনন্য এক উপায়ও বটে। শান্তিনিকেতনেই পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠা। চাকরি সূত্রে কলকাতা বাস। তারপর আবার ফিরে যাওয়া। “কেমিক্যাল ডাই আগেই জানতাম। ইন্ডিগো ও আরও নানা ডাই শিখলাম। শান্তিনিকেতন প্রকৃতির প্রাচুর্যে ভরপুর। ফুল, পাতার রং এবং আকার ধার করে সাজিয়ে তুললাম আমার জামাকাপড়।’’ ভাবতেই তো ভাল লাগে, গাঁদা, জবা, গোলাপ, অপরাজিতারা আমাদের পোশাক আলো করবে! আমার মনে তো অজান্তেই গুনগুনিয়ে উঠবে “আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে“। কিন্তু কেন এলেম, তা আমার জানা। প্রকৃতির দান মাথা পেতে নেওয়া, তাকে সসম্মানে জায়গা দেওয়া।

Eco-Print is a new trend in the eco-friendly fashion

ভাল এবং বিশুদ্ধ মানের হ্যান্ডলুম কাপড় দরকার। —নিজস্ব চিত্র।

গাঁদাফুল এ ব্যাপারে একেবারে প্রথম, পারমিতার মতে। গাঢ় রঙের কসমসও পাল্লা দিতে পারে এই রং-রেখার দৌড়ে। শুধু কি ফুল! ইউক্যালিপটাস, হরিতকি, জামপাতারা আছে না! ভেরেন্ডার কপালে তো চিরকালই হেলাছেদ্দা। কিন্তু রং ছড়াতে এই ছুপা রুস্তম ওস্তাদ। সাদা কাপড়ে বড় ভেরেন্ডা, ছোট ভেরেন্ডা, দু'জনেই তুখোড়। সুতি, সিল্ক, দুই কাপড়েই সুন্দর হয় ইকো প্রিন্ট। প্রকৃতির আদরের দানকে যেমন তেমন ভাবে তো আর স্থান দেওয়া যাবে না! ভাল এবং বিশুদ্ধ মানের হ্যান্ডলুম কাপড় দরকার। নানা ট্রিটমেন্টে তাকে বিশুদ্ধ করে তোলা হয়। আরও টেকনিক্যাল পথ পেরিয়ে নিজের পছন্দ মতো ফুল বা পাতা সাজিয়ে, টাইট করে রোল করে স্টিম করা হয়। ফুল, পাতার থেকে ধার করা রঙেই সেজে উঠবে আপনার কাপড়। এ বার শাড়ি, কাফতান, কামিজ, টপ, শার্ট— চয়েস ইজ় ইওরস।

একেই বলে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো। যে মাটিতে জন্ম, যে মাটির বুকে বেড়ে ওঠা, তারই দানে জীবনকে সাজিয়ে তোলা, তাকে কৃতজ্ঞতা জানানো।

এটাই তো ‘এথিকস অফ ফ্যাশন’।

(মডেল: অমৃতা সেনগুপ্ত, আবীর মুখোপাধ্যায়)

Advertisement
আরও পড়ুন