আমির খানের কন্যা আইরা খানের একান্ত সাক্ষাৎকার। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
কোঁচকানো কুর্তা। ইস্তিরি না করা ঢোলা প্যান্ট। খোলা চুল। হাতে মেহন্দি। পায়ে সাদা স্নিকার্স। কপালে ছোট্ট টিপ। কানে লম্বা দুল। এক ঘর লোকের মাঝে বসে মন দিয়ে খাতায় নোট নিচ্ছেন এক তরুণী। বয়স ৩০ ছুঁই ছুঁই।
পাশে বসা পেশাদার সাংবাদিকের চোখও ধোকা খেতে পারে তাঁকে চিনে নিতে। আর যা-ই হোক, একঘর মনো-সমাজকর্মী, প্রতিষ্ঠিত মনোবিদ, খ্যাত মনোরোগ চিকিৎসকের মাঝে যে নম্রতা থাকার কথা সদ্য সে জগতে কাজ শুরু করা এক নবাগতার, তরুণীর ব্যক্তিত্ব ঠিক তেমন। ফারাক এটুকুই যে, তিনি অভিনেতা-পরিচালক আমির খানের একমাত্র কন্যা আইরা খান।
মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কাজে যুক্ত সংস্থার কয়েক জন কর্মীকে নিয়ে দিন তিনেকের কলকাতা সফরে এসেছেন আমির-কন্যা।
প্রথম বার কলকাতায় এসেছেন। তবে ঐতিহাসিক শহর দেখতে নয়। বরং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনাচক্রে যোগ দিতে। মানসিক হাসপাতাল দেখবেন। মনোরোগীদের সঙ্গে কথা বলবেন। তাঁদের মূলস্রোতের সঙ্গে মেলাতে আর কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবনাচক্রে নিজের মতামত দেবেন। মঙ্গলবার, মধ্য কলকাতার এক হোটেলে কয়েক ঘণ্টা কাটল সেই কন্যার সঙ্গে আলোচনাসভায় বসে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কর্মে নিযুক্ত ‘অঞ্জলি’ আয়োজিত সভার মাঝে সময় বার করে নিজের ‘অগৎসু ফাউন্ডেশন’ তৈরির গল্পও বললেন আইরা।
তাঁর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কাজে যুক্ত সংস্থার কয়েক জন কর্মীকে নিয়ে দিন তিনেকের কলকাতা সফরে এসেছেন আমির-কন্যা। তরুণীদের সেই দলের সঙ্গে মিলে জোট বেঁধে মন দিয়ে কাজ করেন, গল্প করেন আর মাঝেমাঝে চারপাশটা দেখে নেন। তিনি বলেন, ‘‘পরে কখনও ছুটি কাটাতে আসব। তখন ভাল করে কলকাতা দেখব। এ বার তো সে সব কিছু করার সময় নেই। কাজটাই করছি মন দিয়ে।’’
নিজের ‘অগৎসু ফাউন্ডেশন’ তৈরির গল্পও বললেন আইরা।
২৩ বছর বয়সে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন নিজের পরিবারের কাছে। আইরা বলছিলেন, ‘‘একেবারে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজ়েন্টেশন দিয়েছিলাম বাড়ির সকলকে বসিয়ে। বাবা-মা বসে বসে দেখলেন। তার পরে ঠিক করলেন, আমাকে এ কাজে সাহায্য করা যায় কি না।’’
মুম্বইয়ে আইরার ‘অগৎসু ফউন্ডেশন’ জনসাধারণের মন ভাল রাখার কাজে নিযুক্ত। আইরা বলেন, ‘‘আমাদের এখানে আসার জন্য বিশেষ কোনও ব্যাধি থাকতে হবে, এমন নয়। অনেকে এমনিই আসেন। হয়তো বুঝতে চান, তাঁর কেন মন ভাল নেই। তেমন মানুষকেও সাহায্য করি আমরা। কেউ হয়তো শুধু নিজের কথা বলতে চান, সে অবকাশও সৃষ্টি করি আমাদের সংস্থায়। মূল উদ্দেশ্য হল, ভাল থাকার পরিবেশ তৈরি করা।’’ গত পাঁচ বছর ধরে তেমন কাজেই মন দিয়েছেন আইরা।
অভিনেতার কন্যা হঠাৎ মনোরোগ নিয়ে চিন্তিত হয়ে এ জগতে কাজ করতে এলেন কেন? নিজের কাজ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে যেতে পারেন তরুণী। তবে প্রশ্ন শুনে একটু থামেন আইরা। তার পর বলেন, ‘‘আসলে আমিও তো অবসাদে ভুগতাম। তাই মনে হল এই কাজটাই করি।’’
সংস্থার পুরো কাজই শুরু হয় বাবা আমিরের থেকে পাওয়া অর্থে। মা রিনা দত্ত আর বাবা, দু’জনেই তাঁর সংস্থার বোর্ডের সদস্য।
নেদারল্যান্ডসে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন আইরা। লিবারাল আর্টস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু কলেজের লেখাপড়া শেষ করার ইচ্ছা পর্যন্ত হয়নি আমির-কন্যার। তিনি বলেন, ‘‘আট বছর টানা অবসাদের ওষুধ খেয়েছি। ঠিক হতে অনেক সময় লাগে। তার মধ্যেই নিজের ফাউন্ডেশনের কাজ শুরু করি।’’
প্রথমে তাঁর সংস্থার পুরো কাজই শুরু হয় বাবা আমিরের থেকে পাওয়া অর্থে। মা রিনা দত্ত আর বাবা, দু’জনেই তাঁর সংস্থার বোর্ডের সদস্য। প্রতি বছর কী কী উন্নতি হচ্ছে সেখানে, তার সব কিছুই জানতে চান তাঁরা। তবে এখন বাইরে থেকেও অর্থসাহায্য পেতে শুরু করেছে সংস্থা।
বলিউডের অন্যেরা কি তাঁর সংস্থায় আসেন? প্রশ্ন শুনে মুচকি হাসি এ বার তাঁর ঠোঁটে। আইরা বলেন, ‘‘বলব কেন? আমার কাছে যাঁরা আসবেন, তাঁদের সকলের ব্যক্তিগত তথ্য একেবারে সুরক্ষিত।’’ কিছু ক্ষণ থামেন আইরা। তার পর ভাবনাচিন্তা করে জানান, বলি-জগতের কোনও তারকা এখনও তাঁর সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সাহায্যের জন্য আসেননি। তবে তাঁদের যদি কোনও অনুষ্ঠান কিংবা কাজে ডাকা হয়, অবশ্য সাহায্য পেয়েছেন।
আইরা বললেন, ‘‘আমাদের সংস্থায় আসতে কারও বাধা নেই। রোগ না থাকলেও দরজা সকলের জন্য খোলা।’’
এখনও বহু ভাবনা আছে আইরার নিজের সংস্থা নিয়ে। আরও বড় করতে চান নিজের কাজের জগৎটাকে। তবে আর পাঁচজনের মতো অর্থচিন্তা ঘোরে আমির-কন্যার মনেও। তবে নিজের জমি পোক্ত করতে মাঠে নেমে যথেষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টায় আছেন আইরা।
কলকাতায় আলোচনাচক্রে যোগ দিতে এসেছিলেন আইরার শিক্ষক অভিজিৎ নদকরনি। গোয়ায় তাঁর সংস্থায় নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কাজের পাঠ নিয়েছেন আইরা। ইচ্ছা প্রকাশ করেন আরও নানা জনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সকলকে নিয়ে চলার। তিনি বলেন, ‘‘আমি এমন কিছু করছি না, যা আগে কেউ করেননি। বরং মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত অন্যেরা যা করেন, তা-ই করি আমরাও। শুধু ভাবি, সকলের মতো যেন আমরাও কয়েক জনকে অন্তত সাহায্য করতে পারি।’’
বাবা আমির তাঁর কাজের সঙ্গে কতটা যুক্ত, জানতে ইচ্ছা করেই। আইরাও জানাতে পিছপা নন। তিনি বলেন, ‘‘বাবা আসেন মাঝে মাঝে অগৎসু-তে। তবে ছবি তোলা বারণ সেখানে। বাবা অনুমতি দিলেও, আমরা দিই না। সেটা বাবার ছবি বার করতে আপত্তি বলে নয়। আমাদের কাছে যাঁরা ভরসা করে আসেন, তাঁদের গোপনীয়তার রক্ষার কথা ভেবে।’’ ফলে আইরার বাবা তাঁর কাজের সঙ্গে কতটা যুক্ত, সে কথা জানেন শুধু আইরার সংস্থায় যাঁদের আসা-যাওয়া, তাঁরাই। যদিও আইরা স্পষ্ট মনে করান, ‘‘আমাদের সংস্থায় আসতে কারও বাধা নেই। রোগ না থাকলেও দরজা সকলের জন্য খোলা।’’