Election Campaign Attire of Woman Politicians

দল-রং নির্বিশেষে ভোটের প্রচারে তারকা-সঙ্গী হচ্ছে বাংলার তাঁতের শাড়ি!

প্রার্থী বা নেত্রী যে দলেরই হোন— সিপিএম, তৃণমূল কিংবা বিজেপি। ঝাঁঝা রোদের সকালে দুপুরে বিকেলে তাঁরা ভরসা রেখেছেন নরম নেতিয়ে যাওয়া হালকা তাঁতের শাড়িতে। ভোট মরসুমের শেষ বেলায় তেমনই তিন দলের তিন নেত্রীর প্রচারে পরা তাঁতের শাড়ির সাজ বেছে নিল আনন্দবাজার ডট কম।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০৯

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

যে যা-ই বলুন, প্রবাদ বলছে ‘পহলে দর্শনধারী, পিছে গুণ বিচারী।’ অর্থাৎ দেখে ভাল লাগলে তার পরেই গুণ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা। প্রার্থীরাও সে কথা মাথায় রেখেই গত এক মাস ধরে চালালেন ভোটের প্রচার। কাজে তো বটেই, সাজেও প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করেছেন। জনসংযোগ করতে বেরোনোর আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখে নিয়েছেন, দেখতে ভাল লাগছে কি না।

Advertisement

এ দিকে বাইরে ঠা ঠা রোদ। মার্চ-এপ্রিলের তীব্র গরম। তার মধ্যেই সারা দিন পথে-ঘাটে, পাড়ায় ঘুরে ঘুরে ভোটের দরবার করতে করতে ঘেমে একশা। ফলে প্রার্থীদের নিজেদের সাজাতে হয়েছে নিজের আরামের কথা মাথায় রেখেও। সাজ এমন হতে হবে, যাতে দেখতে ভাল লাগে, আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটাচলা করতে অসুবিধা না হয়। গরমে কষ্ট না হয়। আর সেই সব শর্ত মেনে স্বাচ্ছন্দ্যের পোশাক হিসাবে রাজ্যের মহিলা প্রার্থীদের ভোটে জয়ী হয়েছে বাংলার তাঁতের শাড়ি।

প্রার্থী বা নেত্রী যে দলেরই হোন— সিপিএম, তৃণমূল কিংবা বিজেপি, ঝাঁঝা রোদে সকালে-দুপুরে-বিকেলে তাঁরা ভরসা রেখেছেন নরম নেতিয়ে যাওয়া হালকা তাঁতের শাড়িতে। যে শাড়ি পরে গরমে কষ্ট হবে না, যে শাড়ির নরম আঁচল তপ্ত বেলার সিক্ত কপাল মুছিয়ে দেবে মায়ের মতো আদরে। বাংলার তাঁতিদের হাতে বোনা তেমন শাড়িতেই স্বস্তি পেয়েছেন নেত্রীরা।

ভোট মরসুমের শেষ বেলায় তেমনই তিন দলের তিন নেত্রীর প্রচারে পরা তাঁতের শাড়ির সাজ বেছে নিল আনন্দবাজার ডট কম।

দীপ্সিতা ধর, সিপিএম

কেন্দ্র: উত্তর দমদম

সিপিএমের দীপ্সিতার কথাই ধরা যাক। প্রচারে তিনি ভরসা রেখেছেন মূলত ধনেখালি তাঁতে। ধনেখালি শাড়ির খ্যাতি তার মজবুত জমির জন্য। অকারণ নকশার বাড়বাড়ন্ত নেই এই শাড়িতে। মাঠা পাড় বা রেশম পাড় নানা ধরনের ডুরে বা চেক নকশার জমি। হুগলির ধনেখালির তাঁতিদের বোনা সেই সব শাড়ি শৌখিনীদের মধ্যে খ্যাত তাদের স্মার্টনেসের জন্য। আরামের জন্যও। দীপ্সিতাও তাই প্রচারে বেছে নিয়েছেন নানা রঙের ধনেখালি। তার মধ্যে তিনটি শাড়ি নজর কেড়েছে। একটি মেরুন রঙের উপর সাদা রুলি গামছা চেক আর মেরুন মাঠা পাড়। অন্য দুই শাড়ির একটি সাদার উপর ধূসর ডুরে অন্যটি মিশ কালো। বাম নেত্রী বলেছেন, তিনি ওই দুটি শাড়ি পরেছেন ‘আজরাখ ব্লাউজ দিয়ে।’ সাদার সঙ্গে নীল। কালোর সঙ্গে লালচে মেরুন।

কিন্তু প্রচারে তাঁতের শাড়িই কেন? দীপ্সিতার কথায়, ‘‘শাড়ি ক্যারি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আর হাতে বোনা তাঁত দেখলে পাগল হয়ে যাই।’’ রাজনৈতিক ভাবেও তিনি মনে করেন বয়ন শিল্পীদের সঠিক প্রাপ্য তুলে দেওয়া জরুরি। তাঁদের শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।

সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণমূল

কেন্দ্র : বরানগর

তৃণমূলের সায়ন্তিকার জন্য তাঁর মা এনে দিয়েছেন ফুলিয়ার তাঁতের শাড়ি। ফুলিয়ার তাঁত অভিজাত তাঁত বলে জনপ্রিয়। মিহি নরম জমি, চওড়া নকশাদার পাড়, জমিতে বাহারি বুটি। এই ধরনের শাড়ি চাইলে জমকালো অনুষ্ঠানেও পরা যায়। সায়ন্তিকা যে শাড়ি বেছে নিয়েছেন, তা দেখলে চোখেরও আরাম হয়। দুধ সাদা খোলের শাড়িতে লেবু-হলুদ আর কালচে ধূসর পাড়। জমিতে সুতোয় বোনা একচালা বাড়ির নকশা। ধুলো গোলাপি রঙের ডুরে নকশা শাড়ি, সেটিও গরমের আদর্শ রং। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে তাঁর লালপেড়ে সাদা শাড়ি। রকমরকম শাড়ির সঙ্গে নতুন নতুন ব্লাউজ় বাছা সম্ভব নয় বলে সায়ন্তিকা শাড়ি পরছেন ক্রপ শার্ট বা টপের সঙ্গে।

প্রচারে শাড়ি কেন? প্রশ্ন শুনে সায়ন্তিকা বলেছেন, “শাড়ি পরতে কোন বাঙালি মেয়ে ভালবাসে না!’’ কিন্তু তাঁতের শাড়িই কেন? সায়ন্তিকার জবাব, “এগুলো সবচেয়ে নরম নেতানো শাড়ি, এগুলোই সবচেয়ে আরামের। এগুলো মা ফুলিয়া থেকে আনিয়েছে আমার জন্য। সাদা সালোয়ার না পরলে আমি এগুলোই পরি। দেখতেও ভাল লাগে আবার রোদে ঘামলে আঁচল দিয়ে মুছেও নেওয়া যাবে।”

শতরূপা, বিজেপি

কেন্দ্র: বালিগঞ্জ

বিজেপির শতরূপাও প্রচার করেছেন নানা রকমের তাঁতের শাড়িতেই। তাঁর পছন্দ সাদা অথবা তসর রঙের খোলের তাঁতের শাড়ি। বেশির ভাগেরই চওড়া রঙিন পাড়। ফুলহাতা সুতির রঙিন ব্লাউজ়ের সঙ্গে সেই সব শাড়ি পরেছেন বিজেপি নেত্রী। এর মধ্যেই নজর কেড়েছে তাঁর গেরুয়া সবুজ গঙ্গা-যমুনা ঢালা পাড়ের তাঁতের শাড়ি, ক্রিম রঙের জমিতে জোড়া গেরুয়া পাড়ের শাড়িটিও দেখতে ভাল। আর একটি পাড়হীন সাদা শাড়িও নজর কাড়ে, যার জমি জুড়ে হাতে বোনা সবুজ ফুল-পাতার নকশা। তিনটিই ফুলিয়ার তাঁত। শতরূপা জানিয়েছেন, সেখানে তাঁর কিছু চেনা তাঁতি রয়েছে। তাঁদের থেকেই নিয়মিত শাড়ি কেনেন।

গরমে প্রচারে তাঁতের শাড়ি কেন বেছে নিলেন? শতরূপা বলেছেন, ‘‘তাঁতের শাড়ি এ রাজ্যের গরমের জন্য আদর্শ। তা ছাড়া শুধু গরম বা প্রচার বলে নয়, তাঁতের শাড়ি পরতে আমি ভালবাসি। বেশি ভালবাসি হাতে বোনা তাঁতের শাড়ি পরতে। আমি ছোট তাঁতিদের থেকে শাড়ি কিনি। কারণ মনে করি, এ ভাবেই ওদের পাশে থাকা যায়।”

এ ধরনের শাড়ি পরতে চাইলে কোথায় যাবেন?

ভোটের প্রচারে মহিলা প্রার্থীরা যা পরছেন, চাইলে তেমন শাড়ি কিনে পরতে পারেন আপনিও। তার জন্য ধনেখালি বা ফুলিয়ার তাঁতিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে না। চাইলে শহরে বসেই ধনেখালি এবং ফুলিয়ার তাঁতিদের হাতে বোনা তাঁত পেতে পারেন।

১. শোরুম: বিশ্ববাংলার শোরুম, তন্তুজ, এমনকি কিছু কিছু খাদি এম্পোরিয়ামেও তাঁতের শাড়ি পাওয়া যায়। ফুলিয়া, ধনেখালি, শান্তিপুরী, বেগমপুরী তাঁতের শাড়ি পাবেন ফ্যাব ইন্ডিয়া, দক্ষিণাপণ, উত্তরাপণেও।

২. ছোট-বড় দোকান: এ ছাড়া গড়িয়াহাট, হাতিবাগান মার্কেট, শ্যামবাজার, কলেজস্ট্রিটে তাঁতের শাড়ির বহু দোকান রয়েছে। ইদানীং শহরের বিভিন্ন বুটিকও রাখছে বিভিন্ন ধরনের তাঁতের শাড়ি।

৩. মেলা: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে সারা বছরই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এবং শহরেও তাঁতবস্ত্র মেলা বসে। সেখানে ধনেখালি, ফুলিয়া, শান্তিপুর, বেগমপুর থেকে তাঁতীরা নিয়ে আসেন তাঁদের হাতে বোনা তাঁতের শাড়ির সম্ভার। তাঁতীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের হাতে বোনা জিনিস কেনার অভিজ্ঞতা অন্যরকম।

৪. অনলাইন: অনলাইনেও তাঁতের শাড়ি কিনতে পারেন। এখন সমাজমাধ্যমে লাইভ সেসন করে শাড়ি দেখাচ্ছেন, বিক্রি করছেন বহু ছোট ব্যবসায়ী। তন্তুজ, বিশ্ব বাংলা, ফ্যাব ইন্ডিয়ার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে তাঁতের শাড়ি কেনা যায়। তাঁতের শাড়ি পাওয়া যায়, জনপ্রিয় শপিং অ্যাপগুলিতেও।

দাম কেমন?

এখনও ৪০০ টাকা দামের ধনেখালি শাড়ি পাওয়া যায়। সুতির ওই শাড়ির জমি হয়তো পাতলা, কিন্তু দেখতে খারাপ হবে না। সেখান থেকে শুরু হয়ে ধনেখালি শাড়ির দাম উঠতে পারে ২০০০-৩০০০ টাকা পর্যন্ত। নকশার ভিত্তিতে বদলাবে। ফুলিয়ার তাঁতের শাড়ির দাম সাধারণ দেকানে ৮০০-১০০০টাকা থেকে শুরু। তবে এই তাঁতের শাড়ির দাম উঠতে পারে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ডিজ়াইনার তাঁতের শাড়ি অর্থাৎ একটিই মিলবে এমন তাঁতের শাড়ির দাম লাখ খানেক টাকাও হতে পারে নকশার সূক্ষ্মতার বিচারে।

Advertisement
আরও পড়ুন