Harish Rana Euthanasia Case

মুক্তির অধিকার যখন মৃত্যু! হরীশ রানাকে নিয়ে সিদ্ধান্তে নতুন করে আলোচনায় নিষ্কৃতিমৃত্যু

হরীশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যু ঘিরে অনেকগুলো প্রশ্ন উঠে আসছে। ঠিক কোন পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে জীবন থেকে নিষ্কৃতির অধিকার চাওয়া যায়, এই বিষয়ে কী বলছেন চিকিৎসক, সমাজতত্ত্ববিদ ও আইনজীবীরা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১২ মার্চ ২০২৬ ১০:০১
হরীশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যু এবং কিছু প্রশ্ন।

হরীশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যু এবং কিছু প্রশ্ন। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

‘অ্যাসিস্টেড সুইসাইড’-এর মাধ্যমে নিজের জীবনে ইতি টেনেছিলেন ফরাসি-সুইস চিত্রপরিচালক জঁ লুক গোদার। সেটা ২০২২ সাল। জীবন-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসকের সহায়তায় ইচ্ছামৃত্যুর পথ বেছে নেন। নিজের ইচ্ছায় মৃত্যুর অধিকার বা স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার আদায়ের লড়াইটা আজকের নয়। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, আইনি ও সামাজিক লড়াইয়ে জর্জরিত। বিষয়টি বহুবারই আলোচনায় উঠে এসেছে নানা ঘটনার অভিঘাতে। তা নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে মতামতও আছে। তবে সম্প্রতি বছর বত্রিশের হরীশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় আরও একবার বিষয়টি নিয়ে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। ১৩ বছর ধরে শয্যাশায়ী পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছেলেকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে বৃদ্ধ বাবা-মা ছুটেছিলেন আদালতের দরবারে। দীর্ঘ আইনি পথ পেরিয়ে তাঁদের সে অনুরোধে মান্যতা দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর পরেই প্রশ্ন উঠেছে, জীবন থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার বা চাওয়ার অধিকার কতটা গ্রহণযোগ্য? চিকিৎসাবিজ্ঞান যে কথা বলে, তাতে কি সায় আছে সকলের?

Advertisement

অনেকগুলো প্রশ্ন উঠে আসে। ঠিক কোন পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে জীবন থেকে নিষ্কৃতির অধিকার চাওয়া হচ্ছে? হঠাৎ একদিন মনে হল, মানসিক অবসাদের ধাক্কা আর সামলানো যাচ্ছে না, অতএব ‘নিষ্কৃতি’ পেলেই ভাল! আর চাওয়া মাত্রই তা আইনি পথে মঞ্জুর হল, বিষয়টা এমন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের প্রশ্ন।

নিষ্কৃতিমৃত্যু নতুন করে আলোচনায়।

নিষ্কৃতিমৃত্যু নতুন করে আলোচনায়। ছবি: ফ্রিপিক।

এই বিষয়ে মনোরোগ চিকিৎসক কেদাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত, ‘‘ নিরাময়-অসাধ্য অসুখ যেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানও রোগীর প্রাণ ফেরাতে অপারগ, একমাত্র সে ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করা যেতে পারে। চিকিৎসা ব্যবস্থা যখন মর্যাদার সঙ্গে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা ও তাঁকে উন্নত জীবন দিতে পারে না, তখন সম্মানজনক মৃত্যুটুকু চাওয়ার অধিকার রাখতে পারে। তবে শুধুমাত্র শারীরিক অক্ষমতার ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য, মানসিক রোগের ক্ষেত্রে নয়।’’

নিষ্কৃতি অনেক ভাবে হতে পারে। এক, ‘ভলান্টারি ইউথানাসিয়া’ যেখানে রোগীর অনুরোধ বিচার্য হয়। দুই, ‘নন-ভলান্টারি’ যখন রোগী কিছু বলার মতো অবস্থায় থাকেন না। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও পরিবার-পরিজনের মত নেওয়া হয়। চিকিৎসক বোঝালেন, ‘‘ধরা থাক কোনও রোগীর কোলন ক্যানসার হয়েছে, একই সঙ্গে ডিমেনসিয়া বা স্মৃতিনাশে ভুগছেন, তিনি সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ। তেমন রোগীকে নিষ্কৃতি দেওয়ার আবেদনও করেন পরিবারের লোকজনেরা। আরও দু’রকম পথ রয়েছে। একটি হল ‘অ্যাক্টিভ’ অর্থাৎ চিকিৎসকের সহায়তায় ওষুধের মাধ্যমে মৃত্যু। অন্যটি হল, ‘প্যাসিভ’ বা পরোক্ষ, যেখানে কোনও ওষুধ বা ইঞ্জেকশন দেওয়া হয় না, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় রোগীর শারীরিক অবস্থা দেখে ধীরে ধীরে কৃত্রিম জীবনদায়ী ব্যবস্থাটিকে সরিয়ে ফেলা হয়। সহজ করে বললে, চিকিৎসা প্রত্যাহার করে মৃত্যুর পথ প্রশস্ত করা হয়।’’

ছবি: ফ্রিপিক।

ছবি: ফ্রিপিক। ছবি: ফ্রিপিক।

কিন্তু বিষয়টি কি এতই সহজ? জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকেও তো ফিরে আসা যায়। এমন অত্যাশ্চর্য ঘটনা আগেও অনেক ঘটেছে পৃথিবীতে। তা হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপায় কী? যন্ত্রণার পথ থেকে প্রিয়জন একদিন ঠিক ফিরে আসবেন, সে ভাবনাও তো থাকে অনেকেরই। স্নায়ুরোগ চিকিৎসক অনিমেষ কর এমন ভাবনায় বিশ্বাসী। গভীর কোমা থেকে ফিরে এসেছেন, এমন রোগীও দেখেছেন অনিমেষবাবু। হয়তো ফিরে আসার সময়টা অনেক দীর্ঘ। তাই আপনজন সাড়া দিচ্ছেন না মানে তাঁর জীবনটাই শেষ করে দিতে হবে, এমনটা ভাবতে বিশ্বাসী নন তিনি। যেমন ভাবে আছেন তেমন ভাবেই না হয় থাকুন আরও ক’টা দিন। কাছে তো আছেন!

ভাবনার পরিসরে ভিন্নতার কারণেই নিষ্কৃতিমৃত্যুর পথটা জটিল। সেখানে চিকিৎসকদের মতামতও ভিন্ন। ক্যানসার চিকিৎসক গৌতম মুখোপাধ্যায় একটু অন্য ভাবেই ভাবেন। তাঁর মত, ‘‘ক্যানসারের অন্তিম পর্বে রয়েছেন যে মানুষটা, চিকিৎসায় যাঁকে ফিরিয়ে আনা আর সম্ভবই নয়, সেখানে নিদারুণ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে মর্যাদার সঙ্গে নিষ্কৃতি দেওয়াই শ্রেয়।’’ টার্মিনাল ক্যানসার দীর্ঘমেয়াদে ভেন্টিলেশনে থাকতে হয়। সেরে ওঠার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। রোগী বলতেও পারেন না, কী পরিমাণ যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে তিনি যাচ্ছেন। সেখানে চিকিৎসক ও পরিজনকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

ছবি: ফ্রিপিক।

ছবি: ফ্রিপিক।

মারণ ওষুধ প্রয়োগে প্রত্যক্ষ নিষ্কৃতি অথবা কৃত্রিম শ্বাসের ব্যবস্থা সরিয়ে পরোক্ষ নিষ্কৃতি— পদ্ধতি যা-ই হোক, তার জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য চিকিৎসক। চিকিৎসকদেরই নির্ধারণ করতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থা যথার্থই নিরাময়-অসাধ্য কি না। এর পরেও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন থেকে যায়। ‘মৃত্যুর নিদানপত্র’ লেখার একক দায় কোনও চিকিৎসকই নিতে রাজি হন না। কারণটাও বোধগম্য। নিষ্কৃতি-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পিছনে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সায়ই যথেষ্ট নয়। যাচাই করে দেখতে হয়, এ মৃত্যুতে কেউ অনৈতিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন কি না। বা পরিবার অথবা আপনজনেদের কোনও অভিসন্ধি রয়েছে কি না। তাই নিষ্কৃতি ঠিক কার? রোগযন্ত্রণায় জর্জরিত রোগীর না কি প্রিয়জনের নিত্যযন্ত্রণা দেখে বিধ্বস্ত স্বজনদের? এখানেই তৈরি হয় বিভ্রান্তি।

ভারতীয় সংবিধানে ‘নিষ্কৃতিমৃত্যু’ শব্দটির উল্লেখ নেই। তবে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার)-এ বলা হয়েছে, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার যেমন আছে, তেমন মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। এমনটাই জানিয়েছেন, কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী কল্লোল বসু। আইনের অপব্যবহার করে কোনও রোগীর উত্তরসূরি যদি শঠতা করতে চায়, তাকে অবশ্যই আটকাতে হবে। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রিয়জনের সুস্থতা অসম্ভব জেনেও হাসপাতালগুলির মুনাফা গোনা, আইনের জাঁতাকলে পড়ে আর্থিক ভাবে নিঃস্ব হতে চলা পরিবারকে নিষ্কৃতি দেওয়াও জরুরি। সুপ্রিম কোর্ট যে পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যুকে মান্যতা দিয়েছে, সেখানে অ্যাডভান্স মেডিক্যাল ডিরেক্টিভ বা লিভিং উইল বলে আরও একটি বিষয়বস্ত আছে। সেটি হল পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যুর ইচ্ছাপত্র। অর্থাৎ, এমন এক অনুমতি পত্র যেখানে রোগী নিজেই তাঁকে কৃত্রিম জীবনদায়ী প্রক্রিয়ায় না রাখার অনুমতি দিয়ে যান। সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় এই উইল তিনি আগে থেকেই করে যেতে পারেন। রোগীর প্রতিনিধি যেন নিজের ধারণা বা উদ্দেশ্যের দ্বারা প্রভাবিত না হন, তাই এই ব্যবস্থা। এর আগে দু’জন সাক্ষীর সইয়ের পাশাপাশি, একজন প্রথমস্তরীয় বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট (জেএমএফসি) এর সই প্রয়োজন হত এই ইচ্ছাপত্রের জন্য। তবে এখন কোনও নোটারি বা গেজেটেড অফিসার সই হলেই চলে।

নিষ্কৃতিমৃত্যুর অধিকার নিয়ে এ দেশে টানাপড়েন থাকলেও বিশ্বের আরও অনেক দেশ যেমন, নেদারল্যান্ডস, সুইৎজ়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় তা আইনত সিদ্ধ। আমেরিকার বেশ কিছু প্রদেশে নিষ্কৃতিমৃত্যুকে আইনত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অবশ্য সেখানে মারণ ওষুধের প্রয়োগে সক্রিয় নিষ্কৃতিমৃত্যুকেও মান্যতা দেওয়া হয়, যা এ দেশে বেআইনি।

হরীশ রানার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টে রায়ের পরে এ দেশে ফের একবার নিষ্কৃতিমৃত্যু সংক্রান্ত আইন আনা সম্ভব কি না, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। এমনটাই জানালেন সুপ্রিম কোর্ট ও কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী আশিস চৌধুরী। তাঁর মত, এই নিয়ে কমিটি তৈরি করা প্রয়োজন। যাঁর জীবন-মৃত্যু নিয়ে সংশয়, তাঁর মত যেমন জরুরি তেমনই পরিবার-পরিজন ও মেডিক্যাল বোর্ডের মতামতও দরকার। যা-ই হোক না কেন, প্রয়োগ যেন সঠিক পথেই হয়। আদালতের কাছে এ তথ্য থাকে না যে, যাঁর মৃত্যু চাওয়া হচ্ছে তাঁর কতটা মত রয়েছে বা আদৌ রয়েছে কি না। হয়তো তিনি বাঁচতে চান, কিন্তু তাঁর চারপাশে থাকা মানুষজন তা চান না। নিষ্কৃতি দিতে গিয়ে, বিষয়টি যেন নিরাপরাধ মানুষের প্রাণহানির কারণ না হয়ে ওঠে। মানবাধিকার এত রকম ভাবে লঙ্ঘিত হয়, যে কোনটি ঠিক, আর কোনটি নয়, তা ধার্য করাই মুশকিল হয়ে যায়।

সম্মানজনক মৃত্যু না সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার চেষ্টা, কোনটি বেশি জরুরি সে নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। সম্মানের সঙ্গে যিনি বেঁচেছেন, তাঁর মৃত্যুর স্বাধীনতা থাকা উচিত বলেই মনে করেন সমাজতত্ত্ববিদ প্রশান্ত রায়। স্বেচ্ছামৃত্যুর সিদ্ধান্তে এক ধরনের স্বনির্ধারণের ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন তিনি। সারা জীবন ধরে চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করা বা জীবন শেষ করতে চাওয়া ব্যক্তির অধিকারের মধ্যে পড়ে।

কিন্তু অন্য ভাবেও ভাবা যেতে পারে। প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা রোগীকে যথাযোগ্য সেবা দিতে পারছেন না বলেই তো তাঁর মৃত্যু কামনা। যদি তেমন সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় তবে? এই বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসক গৌতম মুখোপাধ্যায়। তাঁর মত, হাসপাতালে চিকিৎসা ও বাড়িতে সেবাযত্ন নিয়ে যে টানাপড়েন, তার মাঝামাঝি উপায় নিয়ে যদি ভাবা যায়, তা হলে কেমন হয়? সেটি হতে পারে ‘হসপিস’। এমন এক আশ্রয়স্থল যেখানে মৃত্যুপথযাত্রীকে পরম মমতা ও সম্মানের সঙ্গে দেখাশোনা করা হয়। তাঁর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া নয়, বরং শেষের দিনগুলিকে আনন্দময় করে তোলাই লক্ষ্য। কোনও রোগীর রোগ সারিয়ে তোলা যখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাধ্যের বাইরে চলে যায়, তখন তাঁকে সুস্থ করার বদলে তাঁর যন্ত্রণামুক্তি ও মানসিক শান্তির চেষ্টা করে হসপিস। ঠিক যে ভাবে বাড়িতে মা-বাবা বা আত্মীয়-পরিজন সেবা করেন, তেমন ভাবেই হসপিসে রোগীর সেবাযত্ন করবেন অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, নেদারল্যান্ডসে এই ব্যবস্থা আছে। এ দেশের কিছু রাজ্যে থাকলেও সে সংখ্যা হাতে গোনা। নিষ্কৃতি-মৃত্যুর সংজ্ঞাকে এত বিস্তৃত করলে, তার আওতাকে এত প্রসারিত করতে চাইলে, সমাধান আরও দূরপ্রসারী হবে। কিন্তু তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়।

Advertisement
আরও পড়ুন