Poila Boishakh 1433

হালখাতার হাল কী? ডিজিটাল হিসাব আর ইএমআইয়ের ফাঁদে কি হারাল শৈশবের নিমকি-শরবতের স্বাদ?

কম্পিউটারের যুগে হিসেব এখন ‘ডিজিটাল’। ধারবাকি আটকে পড়েছে ইএমআইয়ের জালে। নগদ দিয়ে কেনাকাটার বহর কমেছে। অনলাইনেই পাওনাগন্ডা মিটে যাচ্ছে। এক সময়ে হালখাতায় সিঁদুর মাখানো টাকার ছাপ পড়া মানেই বাঙালির নতুন বছর শুরু। আর এখন পয়লা বৈশাখ থিমভিত্তিক।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৯
From Hal Khata to digital records, the evolution of Bengali Poila Baisakh rituals

হালখাতার এ কাল, সে কাল। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

লাল শালু মোড়া লম্বাটে এক খাতা। খাতার শেষে যোগ-বিয়োগের হিসেব। কয়েক দশক আগেও গোটা বাংলায় খুচরো বিকিকিনির পাইপয়সার হিসেব সাদা সুতো দিয়ে বাঁধা থাকত তাতেই। পেল্লায় চেহারা নিয়ে গেঞ্জি অথবা ফতুয়া পরে ঢাউস টেবিলের সামনে খাতাটি সম্বল করে বসতেন দোকানমালিক। প্রতিটি খরিদ্দারের সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান। মাসকাবারির ফর্দ না-পেলেও বলে দিতে পারতেন কোন খরিদ্দারের কী চাহিদা। খরিদ্দার সর্ষের তেলের সঙ্গে আটা-ময়দার হিসেব গুলিয়ে ফেলতেন, কিন্তু দোকানির ভুল হত না। নববর্ষে সেই খাতারই দিন বদলে যেত। নতুন পাঞ্জাবি আর ধুতিতে চেনাই যেত না দোকানিকে। খরিদ্দারের আমন্ত্রণ থাকত সপরিবার। চারিদিকে পাটভাঙা নতুন কাপড়ের গন্ধ, দোকানে থাক থাক মিষ্টির প্যাকেট, শরবত আর বাংলা ক্যালেন্ডার— বছরশেষে ওই ক্যালেন্ডারই ঘরে ঝুলত সময়ের প্রলেপে ধুলোময়লা মেখে। আর থাকত লাল শালু মোড়া সেই খেরোর খাতা। কেনাবেচার টুকিটাকি, ধারবাকির হিসেবে সারা বছরের ‘হাল’ ধরা থাকত সে খাতাতেই। কবে যে তার লাল রঙে ধূসর ছোপ ধরল, তা এখন আর বলা যাবে না সে ভাবে। কম্পিউটারের যুগে হিসেব এখন ‘ডিজিটাল’। ধারবাকি আটকে পড়েছে ইএমআইয়ের জালে। নগদ দিয়ে কেনাকাটার বহর কমেছে। অনলাইনেই পাওনাগন্ডা মিটে যাচ্ছে। এক সময়ে হালখাতায় সিঁদুর মাখানো টাকার ছাপ পড়া মানেই বাঙালির নতুন বছর শুরু। আর এখন পয়লা বৈশাখ মানে নামী বাঙালি রেস্তরাঁয় খাওয়াদাওয়া। আর রাতে কোনও নামজাদা ক্লাবে বাংলা গানের অনুষ্ঠান সহযোগে আড্ডা, পানভোজন।

Advertisement

হিসেব না নাড়ির টান!

‘হাল’ ধরবে যে খাতা। শুধুই কি ব্যবসার হাল, তা তো নয়। সম্পর্কেরও। যৌথ উদ্‌যাপনেরও। তাই সে কালের হালখাতার যে রমরমা ছিল, এ কালে তার জৌলুস কমেছে। বলা ভাল, হালখাতার শুধু এ কাল বা সে কাল নয়, একেবারে তিন কাল— সূচনা সেই আকবর শাহের ফসলি সাল থেকে, মাঝেরটা মধ্যবিত্ত বাঙালি দোকানদার ও খরিদ্দারের মধ্যেকার বোঝাপড়া ও আবেগের হিসেব, আর এখন সবটাই ধূসর। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙেছে, সমাজের কাঠামো বদলেছে, তাই বদলেছে হালখাতার হালও। হালখাতার বিবর্তনটা শুরু হয়েছে সেই যৌথ পরিবার ভাঙার সময় থেকেই। তা কেমন?

হালখাতার রেওয়াজ ফিরে হচ্ছে ধীরে ধীরে।

হালখাতার রেওয়াজ ফিরে হচ্ছে ধীরে ধীরে। ছবি: সংগৃহীত।

সাহিত্যিক সৌরভ মুখোপাধ্যায় মনে করেন, বাঙালিরা একসময়ে একসঙ্গে বাঁচতে জানত। বাঙালিবাড়িতে এক বেলায় দশ-কুড়িটা করে পাত পড়লেও অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। রান্নার ঠাকুর, ঠিকে বা স্থায়ী কাজের লোক, গাড়ির চালক, দারোয়ান, হুট করে এসে পড়া কোনও আত্মীয়, এক-আধ জন প্রতিবেশীও বিনা নেমন্তন্নেই পাত পেড়ে বসে যেতেন। কেউ কিছু মনে করত না। সে সময়ে শুধু নিজের পরিবারে নয়, অনাত্মীয়দের সঙ্গেও আত্মীয়তার বন্ধন ছিল। এক হাঁড়িতে রান্না, এক ছাদের নীচে ঘুম। আপদে-বিপদে কাউকে না কাউকে পাশে পাওয়া যাবেই যাবে। পাড়ার মুদির দোকান বা ছোটখাটো দোকানপাটের মালিক ও খরিদ্দারের মধ্যে কেবল কেনাবেচা নয়, আবেগের টানও ছিল। গৃহস্বামী থলে ঝুলিয়ে মুদির দোকানে যেতেন ও সেখানে সুখ-দুঃখের কথা বলে ঘণ্টাখানেক সময় কাটিয়ে হয়তো তিনটে বা চারটে সওদা নিয়ে ফিরতেন। ওই সময়ে যে বাঁধন তৈরি হত মালিক ও খরিদ্দারের মধ্যে, তারই ফল ছিল বছর শুরুর হালখাতা। অর্থাৎ, শুধু এক-আধটা দিনের জন্য নয়, গোটা বছরের জন্য খরিদ্দারকে বেঁধে ফেলা। দোকানিও জানতেন এই ‘বাবু’ প্রায় রোজই আসবেন, গল্পগাছা করবেন, ধার রাখবেন, আবার শোধও দেবেন।

এখন সে ছবিটা বদলেছে। ভাঙতে ভাঙতে সেই যৌথ পরিবার এখন ধ্বংসস্তূপ। বাঙালি গুঁড়ি মেরে ফ্ল্যাটে ঢুকেছে। সেখানে শুধু স্বামী-‌স্ত্রী, দু’টি বা একটি সন্তান। ছেলেমেয়েরা ফ্ল্যাট খালি করে পাড়ি দিয়েছে বিদেশে। উচ্চশিক্ষা, চাকরি বা বৈবাহিক কারণে গৃহত্যাগ। পাড়ার দোকানের উপর নির্ভরতা কমেছে, সে জায়গা নিয়েছে শপিং মলের কিছু ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। অথবা চটজলদি বাড়ির দরজায় মাসকাবারি পৌঁছে দেবে এমন কিছু অনলাইন সাইটের সঙ্গে বন্ধুত্ব। না সেই দোকানি আছেন, না তাঁর খরিদ্দার। শুধু এক দিন বা দু’দিনের আসা-যাওয়া, কেনা-বেচা। সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ বা সময়, কোনওটাই নেই। তার অভিপ্রায়ও নেই। অতএব মনের টান কমেছে, তাই হিসেবের ধরনেও বদল এসেছে। হালখাতা শুধু ঠাকুরের পায়ে ছুঁইয়ে আনা রেওয়াজ হয়ে উঠেছে। সে একত্রযাপন হারিয়ে গিয়েছে।

কখনও অগ্রহায়ন, কখনও শরৎ, বার বার বদলেছে ‘সাল’

‘হাল’ শব্দটি সংস্কৃত ও ফরাসি, দুই ভাষাতেই পাওয়া যায়। সংস্কৃত ‘হল’ শব্দের অর্থ লাঙল। তার থেকে বাংলায় এসেছে হাল। আর ফরাসিতে ‘হাল’ মানে নতুন। এখনকার হালখাতা বোঝায় ব্যবসায়ীদের নতুন হিসেবের খাতা খোলার দিন। আর একটা সময়ে তা ছিল রাজা, মহারাজা বা জমিদারদের প্রজাদের কাছ থেকে কৃষিজমির খাজনা আদায়ের দিন। বাংলা সালের সূচনা ঠিক কবে থেকে হয়েছে, এ নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। বাংলা মহাকাব্য ও পুরাণবিদ নৃসিংপ্রসাদ ভাদুড়ী মনে করেন, এর সূচনা হয়েছিল আকবর শাহের আমলে। ভারতে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটেরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। হিজরি সন গণনা করা হত চান্দ্রমাসের হিসেবে। আর চাষবাস নির্ভর করত সৌরবছরের উপর। সে জন্যে সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ‘ফসলি সন’, পরে তা বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খান জমিদারদের উপর নবাবি কর্তৃত্ব রাখার জন্যে বৈশাখে ‘পুণ্যাহ’ প্রথা চালু করেন। সে সময়ে জমিদারেরা নবাবের দরবারে এসে খাজনা জমা করতেন। মুর্শিদকুলি খান পুণ্যাহ নাম দিলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল হালখাতারই আর এক রূপ।

একটা সময়ে থরে থরে হালখাতার অর্ডার যেত, এখন কিছুটা হলেও কমেছে।

একটা সময়ে থরে থরে হালখাতার অর্ডার যেত, এখন কিছুটা হলেও কমেছে। ছবি: সংগৃহীত।

তবে সে সময়ে বাংলা নববর্ষের ধারণা একটু অন্য রকম ছিল। বৈশাখের সময়ে থেকেই যে নতুন বছরের সূচনা হবে, তেমনটা ছিল না আগে। প্রবীণ ইতিহাসবিদের মতে, শীতকাল থেকে নতুন বছরের গণনা আরম্ভ হত। ধীরে ধীরে নববর্ষের এই ভাবনা থেকে সরে গিয়ে তা হয়ে ওঠে শারদোৎসবের অনুষ্ঠান। আবার যাঁরা চন্দ্র-সূর্যের গতি লক্ষ করে বছর গণনা করতে জানতেন না, তাঁরা অগ্রহায়ণ (অগ্র অর্থাৎ প্রথম, হায়ন অর্থ বছর) মাসকেই প্রথম মাস হিসেবে বিবেচনা করতেন। সেই সময়ে মাঠে নতুন ফসল আসত। তাই কৃষিজীবীদের কাছে অগ্রহায়ণই ছিল নতুন বছর শুরুর মাস। এর সঙ্গে রাজস্ব আদায়, বাংলার অর্থনীতির গভীর যোগসূত্র ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নববর্ষ শুধু ব্যবসায়ী বা জমিদার-প্রজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের যাপনেও। পয়লা বৈশাখকে যিনি বাঙালির প্রাণের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন, তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যা এত কাল ছিল বাণিজ্যিক, তা চিরকালের জন্যে ধরা পড়ল চিন্তা-চেতনায়, নতুন সংস্কার, নতুন সংস্কৃতিতে। বৈশাখের প্রথম দিনটিই হয়ে উঠল পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলে নতুনকে আহ্বান করার দিন।

উৎসবের মোড়ক আছে, জৌলুসটা কম

উৎসব এখনও হয়, তবে সেটা নিতান্তই নিয়মরক্ষা— বলছিলেন সাহিত্যিক ও রাশিবিজ্ঞানী শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য। নয়ের দশকে বেড়ে ওঠায়, এ কাল ও সে কালের হালখাতার বিবর্তনটা অতটা ধরা পড়ে না। তবে উৎসব তখনও ছিল, উৎসব এখনও হয়। শুধু জৌলুসটা খানিক কমেছে। এখনকার পয়লা বৈশাখ থিমভিত্তিক। আড্ডা-গান-ভূরিভোজে জমজমাট। দোকানে গিয়ে হালখাতা করার সময় অনেকেরই নেই। কিছু পুরনো দোকান এখনও নিমন্ত্রণ পাঠায়, তা-ও ওই নিয়মরক্ষার তাগিদেই। তবে সময় বদলেছে, বদলেছে মানসিকতা ও যাপন পদ্ধতিও। পরিবর্তন তো সব সময়েই কাম্য, তা হলে ক্ষতি কী! যুগোচিত ভাবে বদলে নেওয়াই তো টিকে থাকার চাবিকাঠি।

এখন বেশির ভাগ কেনাবেচাই হয় ডিজিটাল পেমেন্টে।

এখন বেশির ভাগ কেনাবেচাই হয় ডিজিটাল পেমেন্টে। ছবি:সংগৃহীত।

এ বিষয়ে অবশ্য একমত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও। বললেন, ‘‘মুর্শিদাবাদে আমাদের একটা কাপড়ের দোকান ছিল। পয়লা বৈশাখে সেখানে হালখাতা করা হত বড় করে। চেনা-অচেনা খরিদ্দারদের ভিড়, গায়ে গোলাপজল ছিটিয়ে আপ্যায়ন, সবই হত। এখন অবশ্য হাতেগোনা কিছু মুদির দোকান বা সোনার দোকানে হালখাতা হয়। কারণ সে সময়ে মানুষের হাতে নগদ টাকা কম থাকত, তাই ধারেই কেনাকাটা চলত। মাসের শেষে বেতন পেলে তা শোধ দেওয়া হত। এখন সকলের হাতেই নগদ টাকা। ধারবাকি রেখে কেনাকাটা কমই হয়। ধার মানে এখন ইএমআই। তাতে শোধ দেওয়ার প্রক্রিয়াও ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর। তবে পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াই শ্রেয় বলে মনে করি। বাঙালি নস্ট্যালজিক, পুরনোকে মনে রাখবে, নতুনকেও লালন করবে সযত্নে।’’

লেমোনেড কি হারিয়ে গেল কম্পিউটারের খটখট শব্দে?

শুধু শহর কলকাতায় নয়, অন্য শহর, শহরতলি এবং সংলগ্ন প্রতিটি এলাকায়, পাড়ায় পাড়ায় বাংলা বছরের প্রথম দিনটিকে বলা হত ‘নতুন খাতা’র উৎসব। হাটবাজার থেকে শুরু করে পাড়ার মুদির দোকান, মনিহারি দোকান, কাপড়ের দোকান, সোনার গয়নার দোকান, এমন সব দোকানের ব্যবসায়ীরা হালখাতার এই অনুষ্ঠান একই ভাবে, একই নিয়মে পালন করতেন। দোকান লাগোয়া রাস্তার দু’ধারে সার দিয়ে দু’ভাঁজ করা কাঠের চেয়ার পাতা থাকত অতিথি-খরিদ্দারদের জন্য। স্মৃতির পথে হাঁটতে হাঁটতে সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী মনে করালেন, ‘‘সে সময়ে কোল্ড ড্রিঙ্ক খাওয়ার এত চল ছিল না। বাবা বা পিসেমশাইয়ের হাত ধরে যখন দোকানে যেতাম তখন ছোটদের হাতে লেমোনেড ধরিয়ে দেওয়া হত। কোনও দোকানে আবার নিমকি-শরবত। আর দিত মিষ্টির প্যাকেট। আপ্যায়নের বহরও ছিল দেখার মতো। বইপাড়ায় হালখাতা হত না, যেটা হত তাকে বলা হত নতুন বছরের উদ্‌যাপন। নামী প্রকাশনা সংস্থাগুলি ডাব খাওয়াত। গলা ভিজিয়ে দু’দণ্ড জিরিয়ে নিয়ে চলত গল্পগাছা। এখন সবটাই বড় যান্ত্রিক। আপ্যায়নে ত্রুটি থাকবে না ঠিকই, তবে মিষ্টির জায়গায় হাতে আসবে স্ন্যাক্স, ডাবের জায়গায় কোল্ড ড্রিঙ্ক আর কাগজ-কলমের বদলে শুনতে পাব কম্পিউটারে খটাখট শব্দ।’’

পয়লা বৈশাখে গণেশ পুজোর পর প্রথম টাকা নেওয়া এখন ই-ওয়ালেটে হয়।

পয়লা বৈশাখে গণেশ পুজোর পর প্রথম টাকা নেওয়া এখন ই-ওয়ালেটে হয়। ছবি:সংগৃহীত।

মিষ্টির বাক্সেও যে বদলটা এসেছে, তা-ও কিন্তু দেখার মতোই। লবঙ্গলতিকা, দরবেশ, ঝুরিভাজার প্যাকেট বা সন্দেশ-লেডিকেনির সমারোহ তেমন একটা দেখা যায় না। লবঙ্গলতিকা কবেই নিরুদ্দেশ হয়েছে, লালচে বড় দরবেশের জায়গা নিয়েছে ঘি মাখানো লাড্ডু, ঝুরিভাজার ছোট প্যাকেটের বদলে বাক্সে আঁটসাঁট হয়ে বসেছে বার্গার বা হটডগ। দোকানি ভাঙা-ভাঙা বাংলায় হাতে স্ন্যাক্সের প্যাকেট ধরিয়ে কম্পিউটার খুলে বসবেন। তাতে নাম-ধাম লিখে ডেটাবেসে নামটি বন্দি করে নেবেন। ওইটুকুই।

ডিজিটাল হালখাতায় কি কুপোকাত নস্ট্যালজিয়া?

এক সময়ে মাঘ থেকে শুরু হত হালখাতা তৈরির কাজ। মরসুম শেষ হত চৈত্রের প্রথম সপ্তাহে। নাওয়া-খাওয়া ভুলে ডজনখানেক কারিগরকে দিনরাত কাজ করেও ‘অর্ডার’ সামলাতে নাজেহাল হতে হত। এখন সে ছবিটা বদলেছে। হালখাতা তৈরি হয় এখনও, তবে তা হাতে গোনা। কেনার লোক নেই। এমনই জানালেন উত্তর কলকাতার এক দশকর্মার দোকানের মালিক বিজন ভট্টাচার্য। তিনিও একসময়ে কয়েক হাজার অর্ডার দিতেন, কিন্ত এখন তা বন্ধ করেছেন।

সময় যত গড়িয়েছে ব্যবসায় কম্পিউটার অনিবার্য হয়ে উঠেছে। জিএসটি আসার পরে তো আরওই। দোকান সাজিয়ে খরিদ্দারকে আপ্যায়ন করার দিন শেষ। ক্রেডিট কার্ড, অনলাইন শপিং, অনলাইনে পেমেন্ট করার ধাক্কায় হালখাতার পলেস্তারা খসছে দিনকে দিন। পুরনো বছরের বকেয়া শোধ করাতে আর খে্রোর খাতা খোলার দরকার নেই, ধারকর্যের হিসেবটা মনে করাতে এসে গিয়েছে ‘স্মার্ট পেমেন্ট রিমাইন্ডার’। এখনকার সময়ের ডিজিটাল হালখাতা বলা যেতে পারে। এআই অ্যাপ স্বয়ংক্রিয় ভাবে গ্রাহকদের ধার শোধ করার বার্তা পাঠায় হোয়াট্‌সঅ্যাপ বা এসএমএসে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দায়িত্ব নিয়ে বেছে দেয় কোন গ্রাহকের থেকে টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, কাকে কখন মনে করাতে হবে।

প্রেডিক্টিভ অ্যানালিসিস আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে। সেটিও এআই প্রযুক্তি। গত কয়েক বছরের ডেটা বিশ্লেষণ করে ব্যবসায়ীদের বলে দিতে পারে, নতুন বছরের কোন মাসে কেমন বিক্রিবাটার সম্ভাবনা। এটি ব্যবসায়ীদের আগেভাগেই পুঁজি গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করে, যা কাগজ-কলমের হালখাতায় সম্ভবই ছিল না।

পয়লা বৈশাখে গণেশ পুজোর পর প্রথম টাকা নেওয়া এখন ই-ওয়ালেটে হয়। ইউপিআইয়ের মাধ্যমে লেনদেন সরাসরি ব্যাঙ্কে জমা হয় এবং ডিজিটাল লেজ়ারে তার হিসেব সংরক্ষিত হয়ে থাকে। ভুল হওয়ার বা গড়মিলের কোনও জায়গাই নেই।

দোকানির সঙ্গে খরিদ্দারের আবেগ এখন মিষ্টিমুখে নয়, চ্যাটবটে জড়িয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া চিয়া বীজ খেয়ে অভ্যস্ত বাঙালি তো এখন মিষ্টি খেতেই চায় না। দোকানি তাই এআই চ্যাটবটে বৈশাখের যান্ত্রিক শুভেচ্ছা পাঠিয়ে দিয়েই নিশ্চিন্ত। মিষ্টির প্যাকেটের বদলে ঘরে আসে ফুড ডেলিভারি অ্যাপের ডিসকাউন্ট কুপন।

তবে বদল যতই আসুক নস্ট্যালজিয়া আছে, থাকবে। উৎসব আছে, কেবল তার রূপ বদলেছে। পয়লা বৈশাখ নিয়ে বাঙালির আবেগও আছে, শুধু ধরনটা বদলেছে। ‘তাঁরা সবাই অন্য নামে আছেন মর্তলোকে’, কবিগুরু বলেছিলেন। তাই সবই আছে, শুধু যুগের উপযোগী হয়ে উঠেছে।

Advertisement
আরও পড়ুন