(বাঁ দিক থেকে) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই। — ফাইল চিত্র।
ইরানের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে গিয়েছে। সোমবার রাতে এই ঘোষণা করেই জয়ের দামামা বাজিয়ে দিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইজ়রায়েল অবশ্য এখনও বেসুরো। কিন্তু ট্রাম্প দাবি করে বসে রয়েছেন, হরমুজ় প্রণালীতে অবাধে যাতায়াত করতে পারবে সব দেশের জাহাজ। সোমবার তাঁর দাবি, হরমুজ় ইতিমধ্যে আংশিক ভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে। জাহাজ চলছে। শুক্রবার সম্পূর্ণ চালু হয়ে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, এ বার পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফিরবে। কিন্তু তিন মাস আগে যে লক্ষ্যে ইরানে হামলা শুরু করেছিল আমেরিকা-ইজ়রায়েল, তা কি পূরণ হল? ইরান কি বন্ধ করে দেবে তাদের পরমাণু প্রকল্প? ট্রাম্প মুখে যা-ই বলুন, আমেরিকা-ইরানের শান্তিচুক্তি কিন্তু তাঁকে খুব একটা স্বস্তি দিতে পারেনি। উল্টে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা। তার আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের সামরিক শক্তি নির্মূল করে দেবেন তাঁরা। পরমাণু প্রকল্প বন্ধ করে দেবেন। সে দেশের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলা হবে। সেখাকার মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পাবেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন, চুক্তি করার জন্য ইরানের সামনে একটাই পথ— ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’।
কেউ কেউ বলেন, ট্রাম্প আসলে সে সময় হরমুজ়ের জল মাপতে ভুল করেছিলেন। সেখানে গিয়ে যে এমন করে ‘হাবুডুবু’ খেতে হবে, বোঝেননি সফল শিল্পপতি ট্রাম্প। নিজের জন্মদিনে সমাজমাধ্যমে চুক্তির কথা ঘোষণা করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তিনি লেখেন, “ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। সকলকে অভিনন্দন। হরমুজ় প্রণালীর শুল্কমুক্ত ব্যবহারে আমি অনুমোদন দিচ্ছি। পাশাপাশি সেখান থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি। এ বার সারা পৃথিবীর জাহাজ তাদের ইঞ্জিন চালু করে দিক। তেল পরিবাহিত হোক।”
কিন্তু ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরে ২৪ ঘণ্টাও কাটেনি। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র সোমবার দাবি করেছেন, হরমুজ়ে শুল্ক আদায় করা হবে। ইসমাইল বাঘেই বলেন, ‘‘আমরা সব সময় বলে এসেছি, যে শুল্ক নেব না। কিন্তু জাহাজ পরিষেবা, পরিবেশ রক্ষা, জাহাজের বিমা এবং অন্য জরুরি পরিষেবার জন্য মূল্য আদায় করা হবে।’’ এ-ও স্পষ্ট করে দেন, আমেরিকার উপরে ‘গভীর অবিশ্বাস’ রয়েছে তাঁদের।
শুধু হরমুজ় খোলা নয়, ট্রাম্পের অস্বস্তি বৃদ্ধি করেছে ইরানের পরমাণু প্রকল্প। গত কয়েক মাসে তিনি বার বার বলেছেন, ‘‘আমেরিকার এটা বরাবরের নীতি, বিশেষত আমার প্রশাসনের যে, ওই সন্ত্রাবাদী শাসকের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না। আমি আবার বলব একই কথা।’’ এমনকি, গত শনিবার, যখন তিনি ঘোষণা করেন যে, পরের দিন, রবিবার, দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হবে, তখনও দাবি করেন, ইরানের শীর্ষনেতারা জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের আর পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। তারা কিনবেও না, তৈরিও করবে না। কোনও ভাবেই তা রাখবে না।
কিন্তু ইরানের উপবিদেশমন্ত্রী কাজ়েম ঘারিবাবাদির গলায় শোনা গিয়েছে ভিন্ন সুর। কাজ়েমের কথায়, ‘‘চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা হবে। তবে তার আগে চুক্তির অধীনে আমেরিকা তাদের প্রতিশ্রুতিগুলি পালন করছে কি না, তা যাচাই করা হবে। দেখা হবে, আদৌ তারা শত্রুতা ভুলে হরমুজ় প্রণালী থেকে অবরোধ তুলছে কি না, ইরানের আটকে রাখা সম্পদ মুক্ত করছে কি না।’’ ভবিষ্যতের চুক্তি নিয়ে প্রাথমিক স্তরের একটি আলোচনা শুক্রবার জেনেভাতেই সেরে রাখা হবে বলে জানান কাজ়েম। গত শনিবারই ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘‘যুদ্ধ শেষ করা নিয়ে এই আলোচনা হবে দু’টি পর্বে।’’ দ্বিতীয় পর্বে হবে পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা, যাতে সময় লাগতে পারে ৬০ দিন। আরাঘচির দাবি, এখন যা পরিস্থিতি, তাতে তেহরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলতে পারে না।
ট্রাম্প যদিও সেই বিষয়টিতে আর আলোকপাত করতে চাননি। তা নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। উল্টে তিনি বলেছেন, ‘‘এই অসাধারণ চুক্তিটি সমগ্র অঞ্চলে শান্তি এবং সুরক্ষা ফিরিয়ে আনবে। এর আগে অনেক প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা করেছিলেন। আমার আগে সকলেই ব্যর্থ হয়েছেন। পশ্চিম এশিয়ার নেতারা এই প্রথম এক জন প্রেসিডেন্টকে পেলেন, যিনি তাঁদের শান্তিস্থাপনের লক্ষ্যে পৌঁছোতে সাহায্য করতে পারেন।’’ তার পরেই ইরানের পরমাণু প্রকল্প বন্ধ করা নিয়ে কিছু পরস্পর-বিরোধী কথা বলেছেন। আগে বলেছিলেন, প্রকল্প বন্ধ না করলে ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করে দেবেন। পরে সেই তিনিই জানান, তেহরানে ইউরেনিয়ামের ভান্ডার অপসারণ নিয়ে কোনও তাড়াহুড়ো নেই তাঁর।
ইরানে হামলার শুরুর দিকে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ‘চার থেকে পাঁচ সপ্তাহে’ লক্ষ্যপূরণ করবে আমেরিকা। ভেনেজ়ুয়েলায় যেমন অভিযান চালিয়েছিল তাঁর প্রশাসন, এখানেও সে ভাবেই চলবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তিন মাস কেটে গেলেও সংঘাত থামেনি। ইরানে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছেন। মার্কিন সেনার ১৩ জন সদস্যও মারা গিয়েছেন। ইরানে আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পরে নতুন প্রশাসন রুখে দাঁড়িয়েছে, নিজেদের পরমাণু প্রকল্প জারি রাখা নিয়ে সওয়াল করে গিয়েছে। যদিও বারবার তারা দাবি করেছে, অস্ত্র নয়, মানুষের কল্যাণে পরমাণু প্রকল্প চলছে তাদের। ট্রাম্পের জামাই জেয়ার্ড ক্রুশনার, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে আলোচনায় বার বার ইরান জানিয়েছে, পরমাণু প্রকল্প তারা থামাবে না। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ইজ়রায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল বি শাপিরো এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘‘পরমাণু বিষয়ে কোনও চুক্তি হয়নি। ইরান জানে কী ভাবে আলোচনা করতে হয় আর নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হয়।’’
সংঘাতের আবহে বিভিন্ন দেশে ইরানের সম্পদ ব্লক করা হয়েছিল। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আরাঘচির কথায়, ‘‘ইরানের ব্লক হয়ে যাওয়া অনুদানের বিষয় নিয়েও প্রক্রিয়া নির্ধারিত হয়েছে (চুক্তিতে)।’’ যদিও এই বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, ইরান কথা না রাখলে তাদের ‘ফ্রিজ়’ করা সম্পদ মুক্ত করা হবে না। এত কিছু পরে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, চুক্তি তো হল, কিন্তু তা কার্যকরে বাধা আসবে না তো?
রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার রাতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে চুক্তিতে সই করেছেন ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ঘালিবাফ। শুক্রবার সুইৎজ়ারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিক ভাবে চুক্তি সই হবে। তবে দুই পক্ষই চুক্তির বিষয়ে বিশদ কিছু জানায়নি।
আমেরিকা-ইরান যখন চুক্তি সই করছে, তখন তা নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়াই দেখিয়েছে ইজ়রায়েল। দু’জনে একজোটে ইরানে হামলা শুরু করলেও এখন তারা ভিন্ন মেরুতে। তেল আভিভ জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুক্তিকে মান্যতা দেওয়া ইজ়রায়েলের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে ইজ়রায়েল স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছে তারা। সে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক কোনও সমঝোতার জন্য ইজ়রায়েল কখনও নিজের নিরাপত্তাকে অবহেলা করবে না। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, “ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। ইজ়রায়েল আমেরিকার অন্তর্গত নয়। আমরা একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র।” হিজ়বুল্লা বা ইরানের মদতপুষ্ট অন্য কোনও গোষ্ঠীর আক্রমণ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে ইজ়রায়েলের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত বলে মনে করছেন তিনি। “আমরা আমেরিকাকে ভালবাসি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু ইজ়রায়েল কোনও দুর্বল রাষ্ট্র (ব্যানানা রিপাবলিক) নয়।”
ইরানের শর্ত ছিল তাদের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে হবে। সেই সঙ্গে লেবাননেও হামলা থামাতে হবে। যদিও ইজ়রায়েল কিন্তু তা মানেনি। গত শনিবারও তারা হামলা চালিয়েছে দক্ষিণ লেবাননে। সেই নিয়ে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন, তাতে কি থামানো যাবে ইজ়রায়েলকে? চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে গেলেও কি স্বস্তি মিলবে আমেরিকার?