বাগান পরিচর্যার মাধ্যমে জলের গুরুত্ব, জল সংরক্ষণ করতে সন্তাকে শেখাবেন কী ভাবে? ছবি: সংগৃহীত।
ক্রমশই পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হচ্ছে সবুজ। মাটির নীচের জলস্তরও কমছে। মানুষকে যদি বাঁচতে হয়, প্রকৃতিকে নিয়েই সেই বাঁচতে হবে। পরিবেশ নষ্ট হলে ধ্বংস হবে জীবন। কিন্তু জীবন এবং প্রকৃতির এই পাঠ শিশু বুঝবে কী ভাবে?
মুখে বলে বোঝানো আর হাতে-কলমে শিক্ষার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। পরিবেশের যত্ন নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে দিন জল সংরক্ষণ, প্রকৃতি রক্ষার পাঠ। বাগান পরিচর্যাতেই শিখুক খুদে।
পর্যবেক্ষণ ও ধৈর্য: গাছের বৃদ্ধি হয় উপযুক্ত পরিবেশ পেলে। আবার ঝড়-জলের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তারা নুইয়ে পড়ে। দুই আবহাওয়ায় গাছের বদলগুলি তাদের দেখান। তারা দেখুক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থামলে, গাছ আবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ঠিকমতো মাটি, আলো পেলে গাছ আবার বেড়ে ওঠে। এই পর্যবেক্ষণে শিশু বুঝবে গাছের বেড়ে ওঠার জন্য সঠিক আলো-হাওয়া আর সময়ের প্রয়োজন। তা ছাড়া, চারা থেকে গাছ হওয়ার পথটা সহজ নয়। গাছের মতোই জীবনে ঝড়-ঝাপটা আসে। কঠিন সময়েও হাল ছাড়তে নেই। ধৈর্য আর সাহসের পাঠ পেতে পারে তারা।
সম্পদের সঠিক ব্যবহার:শীতকালে গাছের বৃদ্ধি কমে যায়। তাদের জলের প্রয়োজন কম হয়। গাছেরা যেমন এই সময়ে জল বাঁচিয়ে চলে তা দেখে শিশুরা শিখতে পারে কী ভাবে অপচয় না করে প্রয়োজনের জন্য সম্পদ সঞ্চয় করতে হয়।
প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ:
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গাছেরা কী ভাবে নিজেদের মানিয়ে নেয়, তা দেখে শিশুরা বুঝতে পারে যে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া, জীবনেরই অংশ। এটি তাদের প্রকৃতি সম্পর্কে কৌতূহলী করে তোলে।
দায়িত্ববোধ: গাছের প্রাণ আছে, শিশুকে শেখান। জল না দিলে, গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে প্রত্যক্ষ করলে, সন্তান বুঝবে জল ছাড়া গাছ বাঁচে না। বাগানের যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। তারা বুঝতে শুরু করে যে সাধারণ কাজও ( যেমন জল দেওয়া বা আগাছা পরিষ্কার করা) অন্য একটি প্রাণের ভাল বা মন্দের উপর প্রভাব ফেলে। এটি তাদের সহমর্মী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
জলের সঠিক ব্যবহার শেখানোর পদ্ধতি
জল দেওয়ার কৌশল
সন্তানকে নিয়ম করে গাছে এক মগ জল দিতে বলুন। এর পর তাকে বলতে পারেন যে, তার বাগানের বেশ কয়েকটি গাছকে ওই এক মগ জলই ভাগ করে দিতে হবে। তাকে বোঝাতে পারেন, মাটি শুকিয়ে গেলে গাছের জলের দরকার। হাত দিয়ে সে মাটি পরখ করতে শিখবে।শিশু নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে কোন গাছটির জল বেশি প্রয়োজন আর কোনটির কম। এতে সে শিখবে কী ভাবে অল্প জিনিসেও প্রয়োজন মতো ব্যবহার করতে হয়। সেই জিনিস সকলের মধ্যে ভাগ করে দিতে হয়।
পাতা পরীক্ষা
এক এক গাছের পাতা এক একরকম। সাক্যুলেন্ট যেমন পাতায় জল জমিয়ে রাখে, তাই পাতার ধরন মোটা হয়। সেগুলি খুদেকে বুঝিয়ে দিন। হাত ধরে দেখান। তারা বিভিন্ন গাছের পাতা হাত দিয়ে দেখবে। কোনও পাতায় যেমন ওপর মোমের মতো পিচ্ছিল স্তর থাকে, আবার কিছু পাতা হয় রোমশ। শিশুদের বোঝাতে হবে এই বিশেষ গঠনগুলো আসলে গাছের ‘সুরক্ষা কবচ’, যা জলের দ্রুত বাষ্প হয়ে যাওয়া রোধ করে। এটি তাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতির প্রতিটি জিনিস নির্দিষ্ট প্রয়োজনে তৈরি।
সব গাছের একই রকম জল লাগে না
প্রতিটি গাছের জলের চাহিদা সমান নয়। কোনও গাছ অল্প জলেই সতেজ থাকে, আবার কোনওটির একটু বেশি প্রয়োজন হয়। তা থেকে শিশু বুঝতে পারবে যার যতটা প্রয়োজন তাকে ততটা জল দিতে হবে।
ডায়েরি
কোন গাছ কতটা বাড়ল, কোন গাছ বেশি জল চাইছে, কোন গাছের পাতায় কেমন বদল আসছে, তারা যা দেখছে, শিখছে সেগুলি ডায়েরিতে লিখে রাখতে পারে। এই পর্যবেক্ষণগুলি তাদের মনোজগতে গভীর রেখাপাত করে। গাছ এবং পরিবেশের সঙ্গে থাকতে থাকতে, তাদের আত্মিক যোগও তৈরি হয়। গাছ যেমন প্রয়োজনে পাতায়, কান্ডে জল জমিয়ে রাখে, তেমনই বৃষ্টির জল কী ভাবে ধরে রাখা যায়, কেন তা জরুরি সেগুলি তাদের বুঝিয়ে দিন। জলের অপচয় বন্ধ করার প্রাথমিক পাঠ কিন্তু সে বাড়ির অন্যদের দেখেই শিখবে। কাজের পর কল বন্ধ করা, জল পড়ে গেলে কল বন্ধ করে দেওয়া— এই ছোট ছোট শিক্ষাও খুব জরুরি।