Basant Panchami Rituals

সরস্বতীপুজোর দিন কুল খাওয়ার রেওয়াজ এখন কতটা ‘কুল’?

অনেকের কাছেই কুল হল ইমোশন, কখনও বা স্মৃতিতাড়িত হয়ে পড়া। এখনকার তো ছোটরা জানেই না, চুরি করে ঢিল ছুড়ে দেশি কুল পেড়ে শিলনোড়ায় থেঁতো করে নুন-লঙ্কা মাখিয়ে খাওয়ার স্বাদ কেমন। এখনকার প্রজন্ম কি আদৌ কুলপ্রেমী? সরস্বতীপুজো উপলক্ষে কুল খাওয়ার রেওয়াজ কতটা ‘কুল’ তাঁদের কাছে?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১২
Tradition, Beliefs, Significance of Eating Ber AKA Indian Jujubes on Saraswati Puja

সরস্বতীপুজো উপলক্ষে কুল খাওয়ার রেওয়াজ কতটা ‘কুল’ এখনকার প্রজন্মের কাছে? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

কোনওটার সবুজ আপেলের মতো গড়ন, কোনওটা আবার চেরির মতো। বেশ কয়েক দিন ধরেই বাজারে ছেয়ে গিয়েছে নানা ধরনের হাইব্রিড কুলে। আর তার দাপটে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে টক মিষ্টি, দাঁত শিরশির করা দেশি টোপাকুল। দেশি নারকেল কুলও বাজারে খুব একটা চোখে পড়ছে না। খুঁজে পেতে যা-ও বা পাওয়া যাচ্ছে, তার আর সে জাত নেই, দামও হাইব্রিডের কুলের দ্বিগুণ। দেশি টোপাকুলের যে স্বাদ, তা খুবই 'আনপ্রেডিক্টেব্‌ল'। কোনওটার টক স্বাদে ব্রহ্মতালু ঝিকিয়ে ওঠে, তো কোনওটার মধ্যে মিষ্টি সুতার। হাইব্রিডে সেই মজা নেই। তা দিয়ে চাটনি বা আচারও বানানো যায় না।

Advertisement

বাজারে যতই কুল বিক্রি হোক না কেন, কুল খাওয়ার ছাড়পত্র তো সরস্বতীপুজোর পরেই পাওয়া যাবে। তার আগে কুল মুখে তুললেই নাকি পরীক্ষায় নির্ঘাৎ ফেল! স্কুলগেটের বাইরে কুল লাল-হলুদ সস আর কাসুন্দি মাখিয়ে দেদার বিকোচ্ছে। তবে যতই লোভ লাগুক, খাওয়া তো যাবে না। খেতে গেলেই মা-ঠাকুরমাদের মুখ মনে পড়ে যায়। মনে মনে ভয় কাজ করে, খেলেই যদি পরীক্ষায় ফেল করে যাই! সরস্বতীপুজো মানেই যেমন প্রেম প্রেম ভাব, তেমনই এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কুল খাওয়ার গল্প। কুলের এ কূল- ও কূল মিলিয়ে সে কাহিনিও কম মজাদার নয়। দুর্দান্ত সাহসীরা সরস্বতী পূজোর আগেই দেখিয়ে দেখিয়ে কুল খেয়েছে। আর ভিতুর ডিমেরা ফ্যালফ্যাল করে দেখেছে।

কেউ বলেন, এ সব নিছক কথার কথা। তবে এ নিয়ে জনশ্রুতিও রয়েছে। লোকমুখে প্রচলিত এক কাহিনি জানায়, দেবী সরস্বতীকে তুষ্ট করতে মহামুনি ব্যাসদেব নাকি তপস্যা করতে বসেছিলেন। তপস্যা শুরু করার আগে একটি কুলের বীজ রেখে মা সরস্বতী বলেছিলেন, যত দিন না এই বীজ অঙ্কুরিত হয়ে সেখান থেকে গাছ বড় হচ্ছে, তত দিন তপস্যা চালিয়ে যেতে হবে। সেই গাছ থেকে একটি পাকা কুল যে দিন ব্যাসদেবের মাথায় এসে পড়বে, সে দিনই তপস্যা ভঙ্গ করা যাবে। সেই নিয়ম মেনেই এক দিন তপস্যারত ব্যাসদেবের মাথায় হঠাৎ করে সেই গাছ থেকে পাকা কুল এসে পড়ে। ঘটনাচক্রে সেই দিনটি ছিল বসন্ত পঞ্চমী। তার পরেই কি মহাভারত-টহাভারত? লোককথা কিন্তু সে বিষয়ে নীরব।

লোককথা যা-ই বলুক, অনেকের কাছেই কুল হল ইমোশন, কখনও বা স্মৃতিতাড়িত হয়ে পড়া। এখনকার তো ছোটরা জানেই না, চুরি করে ঢিল ছুড়ে দেশি কুল পেড়ে শিলনোড়ায় থেঁতো করে নুন-লঙ্কা মাখিয়ে খাওয়ার স্বাদ কেমন। এখনকার প্রজন্ম কি আদৌ কুলপ্রেমী? সরস্বতীপুজো উপলক্ষে কুল খাওয়ার রেওয়াজ কতটা ‘কুল’ তাঁদের কাছে?

স্কুলে সরস্বতীর পুজোর প্রস্তুতি তুঙ্গে, তারই মাঝে আননন্দবাজার অনলাইনকে একাদশ শ্রেণির ছাত্রী সোহিনী রায় জানাল, কুলে তেমন আগ্রহ নেই তার। কুলের স্বাদ ও গন্ধ কোনওটিই নাকি সে পছন্দ করে না। তাই সরস্বতীপুজোয় কুল খাওয়া নিয়ে সোহিনীর তেমন মাথাব্যথা নেই। দশম শ্রেণীর ছাত্রী ঈশিকা সরকার। ঈশিকা বলল, ‘‘স্কুলের বাইরে কুলের আচার বিক্রি হতে দেখলে বেশ লোভ লাগে। তবে খেতে পারি না। মায়ের কড়া বারণ, সরস্বতীপুজোর আগে কুল খাওয়া যাবে না।’’

স্কুলশিক্ষিকা নীহারিকা ঘোষ। কুল খাওয়া নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে, জবাবে তিনি বলেন, ‘‘যখন ছোট ছিলাম তখন মা, দিদিমারা পুজোর আগে কুল খেলেই চোখ রাঙাতেন। বকুনি খেতে হত। বিয়ের আগে পর্যন্ত বাধ্য হয়ে নিয়ম মেনেছি। তবে এখন কুল খেতে ইচ্ছে করলেই কিনে খেয়ে নিই, নিয়মের তোয়াক্কা করি না!’’

নীহারিকার সঙ্গে একমত হলেন না দীপিকা চৌধুরী। কৃষ্ণনগরের মেয়ে দীপিকা আইটি সংস্থায় কর্মরত। কুলের প্রসঙ্গ উঠলেই তাঁর মনে পড়ে যায় মায়ের হাতে বানানো আচারের কথা। দীপিকা বলেন, ‘‘পাকা কুলে নুন-হলুদ মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে গুড় দিয়ে মা তৈরি করত জিভে জল এনে দেওয়া আচার। সেই আচার ভরে রাখা হত চিনেমাটির আর কাঁচের বয়ামে, মাঝে-মাঝে বয়ামের মুখে সাদা কাপড় বেঁধে রোদে দেওয়া হতো। সেই আচার শুকোনোর হ্যাপাও কম ছিল না। আমরা বাড়ির ছোটরা তো হামলে পড়তামই, তার উপর আবার হনুমানের উৎপাত ঠেকাতে একজনকে ঠায় বসে থাকতে হত পাহারা দিতে। তবে সরস্বতীপুজো হয়ে গেলে তবেই আচার খেতে পারতাম। এখন সে কুলও নেই, সে আচারও নেই। তবে মায়ের কাছে শুনে আসা নিয়মটা এখনও মেনে চলি।’’

সরস্বতীপুজোর আগে কুল না খাওয়ার নিয়ম ছিল অভিনেতা রণজয় বিষ্ণুর বাড়িতেও। অভিনেতা বললেন, ‘‘আমি যে কুলের বড় ভক্ত, তা নয়। তবে ছেলেবেলা থেকেই নিয়ম ভাঙতে আমার ভীষণ ভাল লাগত। আমার এক বন্ধুর বাড়িতে কুলগাছ ছিল। বাড়ির লোকের কাছে লুকিয়ে কত বার যে কুল খেয়েছি, তা মনেও নেই। সরস্বতীপুজোর দিন বাড়ির লোক ধরেবেঁধে কুল খাওয়াত। তাঁদের তো আর বলতে পারতাম না, কত কুলই খাওয়া হয়ে গিয়েছে পুজোর আগেই! গাছ থেকে কুল পাড়তাম, তা ধুয়েই মুখে পুরে দিতাম। কোনও কোনও কুল এতটাই টক হত যে, মুখ একেবারে টকে যেত। তবে সেই স্বাদের আনন্দটাই ছিল আলাদা। কুল খাওয়ার থেকে কে কার পকেটে কত কুল জমা করতে পারল, সেটাই ছিল আমাদের কাছে বড় বিষয়।’’ তবে এখন আর কাঁচা কুল খাওয়া হয় না রণজয়ের। অভিনেতার মতে, ‘‘কোনও কোনও নিমন্ত্রণ বাড়িতে কুলের টাটনি দেওয়া হয়, সেটা খুব একটা খাই না। তবে কুলের আচার পেলে খাই। ওটা ভীষণ ভাল লাগে।’’

দুই সন্তানের মা অভিনেতা, সঞ্চালক ও পরিচালক সুদীপা চট্টোপাধ্যায়। বাড়িতে ছোট করেই সরস্বতীপুজো করেন তিনি। তিনি কি তাঁর দুই ছেলেকে সরস্বতীপুজোর আগে কুল খেতে বাধা দেন? সুদীপা বলেন, ‘‘সরস্বতী পুজোর আগে কুল খাওয়াটা ছিল আমার কাছে বিভীষিকার মতো। এক বার আমার দাদা পুজোর আগেই আমাকে কুল খাইয়ে দিয়েছিল। আমি বুঝতেও পারিনি নুন, লঙ্কা দিয়ে মাখানো টক-মিষ্টি ফলটা যে আদতে কুল। পরে যখন জানতে পারি, তখন প্রায়শ্চিত্তও করেছি। দাদার তখন পৈতে হয়ে গিয়েছিল, ও আমায় বলেছিল, আমি যদি সরস্বতী ঠাকুরের সামনে ‘ওঁ সরস্বতৈ নমঃ’ পাঁচ বার করে লিখে রাখি তা হলে, আমি আর পরীক্ষায় ফেল করব না। নিজের নামে তো লিখেছিই, উপরন্তু দাদার তরফেও লিখতে হয়েছিল আমায়। পাশ করার জন্য সবই করেছি। তবে এখনকার দিনের শিশুরা কুল অতটাও চেনে না। আমার বড় ছেলে আকাশ বিদেশেই কাটিয়েছে অনেকটা সময়, তাই কুলের বিষয় ওর তেমন ধারণা নেই। আদি সবই খেতে খুব ভালবাসে। তবে এখনও কুল খাওয়া নিয়ে ওর তেমন আগ্রহ তৈরি হয়নি। ভুলটা আমাদেরই হয়তো। সেভাবে ওকে কুলের সঙ্গে পরিচয় করানো হয়নি।’’ ছোট ছেলে আদিদেব যদি একটু বড় হয়ে সরস্বতীপুজোর আগেই কুল খেতে চায়, তা হলে কী করবেন সুদীপা? জবাবে তিনি সটান বললেন, ‘‘না না, পুজোর আগে মোটেই কুল খাওয়া যাবে না। সে বিষয় আমি ভীষণ কড়া।’’

কুল খাওয়া নিয়ে নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে অভিনেত্রী বিবৃতি চট্টোপাধ্যায়েরও। অভিনেত্রী বলেন, ‘‘স্কুলে পড়ার সময় সরস্বতীপুজো না করে কুল খেতাম না। পড়াশুনায় খুব ভাল ছিলাম তো! পুজোর আগে সরস্বতী ঠাকুরকে রাগিয়ে দিলে পাশ নম্বরটুকুও উঠবে না ভাবতাম। তবে এখন তো পড়াশোনার পালা শেষ। তাই অত নিয়ম মানি না। যখন পাই, খেয়ে নিই। নারকেল কুল ততটা পছন্দ করি না। স্কুলের বাইরে টোপা কুলে মশলা মাখিয়ে বিক্রি হত। ওটা তখন ভীষণ প্রিয় ছিল। এখনও ওই কুলই বেশি ভাল লাগে।

কুল খাওয়া এখনকার দিনে তরুণ প্রজন্মের কাছে ততটাও ‘কুল’ বিষয় নয়। তাঁদের কাছে কুলের চাইতে অ্যাভোকাডো, কিউয়ি, ড্রাগনফ্রুটের কদর অনেকটাই বেশি। কুল এখন কেবল সরস্বতীপুজোর অনুষঙ্গ হয়েই দাঁড়িয়েছে, এ কথা বলা যেতেই পারে। কুল নিয়ে আগ্রহ কি আর ফিরবে তরুণ প্রজন্মের বাঙালির? ব্লুবেরি, স্ট্রবেরির ভিড়ে কি নিজের জায়গা আবারও ফিরে পাবে বাঙালির একান্ত নিজস্ব 'কুল-বেরি', প্রশ্ন কিন্তু থেকে যাচ্ছে।

Advertisement
আরও পড়ুন