Women’s Day Special

ফেরার পথে ভালুকের তাড়া! তবু অরণ্যের অধিকারের স্বপ্ন নিয়ে কলকাতার পথে পুরুলিয়ার শ্রমজীবী নারীরা

নারী দিবসের প্রাক্কালে রামলীলা ময়দান থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত মিছিল আয়োজন করেছিল পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন নারী অধিকার মঞ্চ, সংগঠন ও সংস্থা৷ উপস্থিত ছিলেন উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামের খেটে খাওয়া মহিলারা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৯
পুরুলিয়ার শ্রমজীবী মহিলাদের গানের দল।

পুরুলিয়ার শ্রমজীবী মহিলাদের গানের দল। — নিজস্ব চিত্র।

প্রথম বার কলকাতা শহর দেখবেন নিয়তি মাহাতো, ননীবালা বাউরি, সরলা মাহাতোরা। সেই উত্তেজনায় ট্রেনে রাতে ঘুমও হয়নি ভাল করে। কেমন হয় শহর? কেমন সুবিধা পাওয়া যায় সেখানে? জঙ্গলের বাইরে পা দেওয়া মানে তো ওই পুরুলিয়ার বাজার পর্যন্ত। যেখানে কয়েকটি শালপাতার থালা বিক্রি করতে বসেন তাঁরা। খুব বেশি হলে ২০০ টাকা হাতে আসে। তা দিয়ে পুরো পরিবারের জন্য তেল, নুন, চালের ব্যবস্থা করতে হবে পরের ৪ দিনের জন্য। ৪ দিন কেন? শালপাতা কুড়োতে হবে, তার পর হাতে চেপে থালা বানাতে হবে, তার পর তো বিক্রি করা— সব মিলিয়ে দিন চারেক তো কেটেই যায়। কখনও কখনও বাজার থেকে বাড়ি ফিরতে না পারলে স্টেশনেই রাত কাটাতে হয়। বাড়িতে বাচ্চা কাঁদে। তাও ঘরে ফেরার উপায় নেই। ‘‘পেটের জ্বালা যে কী জ্বালা!’’ বলে উঠলেন নিয়তি মাহাতো। তবু তারই মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন তাঁরা। জঙ্গলে শালপাতা তুলতে তুলতে যখন খাবার শেষ, জলও শেষ, তখন খানিক জিরোতে বসেন তাঁরা। শালপাতার ডাঁটি মুখে চেপে কষটুকু গিলে নিয়ে পিপাসা মেটান। তার পর সদলবল গান শুরু করেন নিজেদের ভাষায়, যার অর্থ করলে দাঁড়ায়—

Advertisement
মঞ্চে শালপাতা কর্মীরা।

মঞ্চে শালপাতা কর্মীরা। — নিজস্ব চিত্র।

‘‘গোছা গোছা পাতা তোলা, দাঁতন ভাঙা হয় মুঠো মুঠো, কাজ করতে করতে রাত হয়ে যায়, তখন বাড়ি ফেরার সময় রাস্তায় ভালুক তাড়া করে’’ অথবা ‘‘পাতা তুলতে যায় শ্রীবিন্দার বনে সেখানে বরহল (ভিমরুল) কাটে, তখন পুরো শরীর জ্বালা করে।’’ রাতের অন্ধকারে, খিদের জ্বালায় এই গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফেরেন মহিলারা।

মনোসমাজ কর্মী রত্নাবলী রায়।

মনোসমাজ কর্মী রত্নাবলী রায়। — নিজস্ব চিত্র।

পিন্দ্রা গ্রাম পঞ্চায়েতের জামবাদ ও পলাশকলা গ্রামের মহিলারা শালপাতা তুলতে জঙ্গলে গেলে বন দফতরের কর্মীরা তাঁদের পাতা পুড়িয়ে দেন, পাতা উড়িয়ে দেন। এই মহিলারা জানেন না, নিয়ম কী, কানুন কী। কারণ, কোনও নিয়মেই এক বেলা পেট ভরে না তাঁদের। মেশিনে কাজ শিখতে চান তাঁরা, যাতে চার দিনের বদলে কম দিনে থালা বানানো হয়ে যায়। ৭০ বছরের সরলা মাহাতো জানালেন, কোনও ভাতাই আজ পর্যন্ত পাননি তিনি। ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে, তার পর থেকে পাতা কুড়িয়ে থালা বানানোর কাজই করে আসছেন তিনি। আগে যা-ও বা লোকে থালা কিনত, এখন শালপাতার থালার কোনও চাহিদাই নেই। ফলে টাকার পরিমাণ আরও কমে এসেছে। এ কাজ কোনও কাজই নয়। মহিলাদের মুখে কেবল একটিই কথা, ‘‘কিছু যদি ব্যবস্থা হয় আমাদের, সরকার যদি আমাদের দুঃখের কথা শোনে, তা হলে আর কিছু চাই না।’’

জমায়েতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন নারী অধিকার মঞ্চ, সংগঠন ও সংস্থা।

জমায়েতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন নারী অধিকার মঞ্চ, সংগঠন ও সংস্থা। — নিজস্ব চিত্র।

নারী দিবসের প্রাক্কালে কলকাতার রামলীলা ময়দান থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত মিছিল আয়োজন করেছিল পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন নারী অধিকার মঞ্চ, সংগঠন ও সংস্থা৷ সেখানে উপস্থিত ছিলেন মনোসমাজ কর্মী রত্নাবলী রায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠনের নারীশ্রমিক নেতৃত্ব, যেমন, দোলন গঙ্গোপাধ্যায়, ইসমত আরা, স্বপ্না ত্রিপাঠী, তহমিনা মণ্ডল, সাজিদা পারভিন, অদিতি বসু, মোসুমী সরকার, দেবায়নী সেন, বিদিশা ঘোষ বিশ্বাস। রত্নাবলীর কথায়, ‘‘সুন্দরবনের গোসাবা থেকে পুরুলিয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে উত্তর ২৪ পরগনা, কোচবিহার থেকে নদিয়া, কে না এসেছেন এই মিছিলে ও জমায়েতে! প্রায় হাজার দুয়েক মানুষের ভিড় হয়েছিল এ দিন। নারী বলতে শুধু জন্মপরিচয়ে নারীরা নয়, নারী, রূপান্তরকামী ও কুইয়্যার মানুষও এই শ্রমের জগতে অন্তর্ভুক্ত।’’ মনোসমাজ কর্মীর মতে, আজকাল সচেতন ভাবেই ‘শ্রমজীবী’ শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু ‘নারী দিবস’ বলা হচ্ছে। এই পরিবর্তন নিরীহ নয়। এতে শ্রমজীবী ও তথাকথিত নিম্নবর্গের নারীদের পেশাগত চাহিদা, কাজের অনিশ্চয়তা এবং ঘরে-বাইরের যুগপৎ শ্রম থেকে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ ও অবসাদের বাস্তবতা আড়ালে চলে যায়। তিনি বলছেন, ‘‘তাই শ্রমের অর্থনীতি নিয়ে কথা বলা জরুরি। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের জায়গা থেকে এই লড়াইকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করছি।’’

সেই জমায়েতেই গানে গল্পে মাতিয়ে রেখেছিল পুরুলিয়ার এই মহিলা গানের দল। এই শ্রমজীবী মহিলারা তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্যের দাবি করছেন। তাঁরা চাইছেন, মেশিনে কাজ শেখার সুযোগ করে দেওয়া হোক। লেখাপড়ার সুযোগও হয়ে ওঠেনি ছোট থেকে। ফলে টাকাপয়সার হিসেবও অত বোঝেন না তাঁরা। রোজ বন দফতরের পুরুষ কর্মীদের মুখ থেকে গালমন্দ শুনতে শুনতে খালি পেটে পাতা কুড়োতে যান। যার অধিকাংশই বিক্রি হয় না। সে পাতার থালা পচে গেলে ফেলেও দিতে হয়। তাঁদের মনে কেবল এক টুকরো আশা, হয়তো জঙ্গল থেকে বেরিয়ে কলকাতা শহরে এলে তাঁদের কথা পৌঁছোবে প্রশাসনের কান পর্যন্ত, আর তাঁরা সুদিন দেখবেন স্বচক্ষে। এখন যাঁদের কাছে এলাহি খানাপিনা মানে কালেভদ্রে ৫০ টাকা দিয়ে পোলট্রির মুরগি কিনে রান্না, তাঁরা হয়তো চেখে দেখতে পারবেন অন্যান্য পছন্দের খাবারও।

Advertisement
আরও পড়ুন